সুমনামি ২২

১৯৭১ সালের আগেই হবে। কারণ তখনও আমরা এস আর দাশ রোডে। দিনটি ছিল রবিবার। আমরা খেতে বসেছি দুপুরে। হঠাৎ ফোন। বাবা-ই ধরলেন। নিতান্ত স্বল্পভাষী মানুষ। মুখের ভাব প্রকাশেও পেশাদার পোকার খেলোয়াড়দের মতো। অর্থাৎ ভাবহীন। যিনি ফোন করছিলেন, তাঁর কথা শুনেই বাবার মুখে জীবনে প্রথম যে ভাবটি ফুটে উঠতে দেখলাম, তাকে যন্ত্রণা ছাড়া কিছু বলা যায় না। ফোন রেখে দিয়ে চুপ করে আবার খেতে বসলেন, কিন্তু খেলেন না। গুম হয়ে বসে রইলেন কিছু ক্ষণ। তত ক্ষণে মা, দাদা আর আমি খাওয়া থামিয়ে দিয়েছি। শান্ত, আবেগহীন গলায় মা’কে ধীরে ধীরে বললেন, ‘চিন্ময়। জানাল পান্না চলে গেছে। আত্মহত্যা করেছে পান্না।’ জীবনে প্রথম কাঁদতে দেখলাম বাবাকে। আশ্চর্য নৈর্ব্যক্তিক কান্না। মানুষের চেয়ে এই দুনিয়ায় ঢের বেশি জরুরি ও সংবেদনশীল প্রাণীরা যে ভাবে কাঁদেন— প্রায় নিঃশব্দে।

সেই সন্ধেয় আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে বাজানো হল বেতারে গাওয়া পান্নালাল ভট্টাচার্যের কয়েকটি আধুনিক বাংলা গানের রেকর্ডিং। আজ, অন্তত ৪৪ বছর পরেও ভুলিনি। প্রথম গানটি ছিল ‘তোমার মতো আমিও তো কত সয়েছি’। সুরকার সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। গীতিকারের নাম মনে নেই। লজ্জিত। তাঁর মৃত্যুর দিনে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রথমেই যে পান্নালাল ভট্টাচার্যের গাওয়া কোনও শ্যামাসংগীত নয়, আধুনিক বাংলা গান বাজানো হয়েছিল— এটি তাৎপর্যপূর্ণ। পান্নালাল ভট্টাচার্য বললেই সচরাচর বাঙালি শ্রোতার মনে তাঁর শ্যামাসংগীতশিল্পী পরিচিতিটাই উঁকি দেবে। সন্দেহ নেই, গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তাঁর বড় ভাই ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর পর এবং পাশাপাশি পান্নালালের নামটাই শ্যামাসংগীতশিল্পী হিসেবে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল। আমার মনে হয়, পান্নালাল শ্যামাসংগীতে যে আধুনিক গায়কি প্রয়োগ করেছিলেন, তা ওই মাত্রায় তাঁর আগে কেউ করেননি এবং সেই একই গায়কিতে তিনি আধুনিক গানও গেয়ে গিয়েছেন।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, যাঁর সমতুল্য কণ্ঠশিল্পী সারা পৃথিবীতেই বিরল (অত রকম আঙ্গিকে ও-হেন দক্ষতা ও দাপটের সঙ্গে গান সম্ভবত মান্না দে ছাড়া আর কেউই গাইতে পারেননি), এমনকী তিনিও আধুনিক বাংলা গানে যে আবেগহীন সোজাসাপটা আধুনিক গায়কি আমাদের শুনিয়েছেন, তা শ্যামাসংগীতের বেলা অতি অল্প মাত্রায় হলেও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। শ্যামাসংগীতে তাঁর গায়কিতে এক চিলতে হলেও আবেগ ধরা পড়েছে। অবশ্য, বাংলার এই অসামান্য গানে তাঁর যুগের আগে (জানি অনেকে রাগ করবেন) যে গদগদ ও সাবেকি ভাব বড় শিল্পীরাও এনে ফেলতেন, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য তা আনেননি। জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, ধ্রুপদী গানের শিল্পী, শ্যামাসংগীত গেয়েছেন যথেষ্ট আবেগ দিয়ে। মৃণালকান্তি ঘোষের গাওয়া শ্যামাসংগীতে আবেগের প্রাধান্য।

গত শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে বাংলা গানের যে ধরনের গায়কি ও উচ্চারণ ছিল, পঞ্চাশের দশকে তা অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় পুরোপুরি বর্জন করেন বাংলার কণ্ঠশিল্পীরা। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য গাইতে এলেন একাধিক ধ্রুপদী আঙ্গিকে ও কীর্তনে বিরল দক্ষতা নিয়ে। গায়কি থেকে সাবেকিয়ানা একেবারে বাদ, কিন্তু উচ্চারণটা কোথাও কোথাও অনাধুনিক। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় বা জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী বা মৃণালকান্তি ঘোষ বাংলা ছায়াছবিতে সলিল চৌধুরীর কথায়-সুরে ‘ঝিরঝিরঝির ঝিরঝিরি বরষা’ গাইছেন— এ আমরা বহু চেষ্টা করেও কল্পনা করতে পারব না। এই গান রেকর্ড করেছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। সেই শিল্পীই আবার গেয়েছিলেন ‘গয়াগঙ্গা’ ও ‘মুক্ত কর মা মুক্তকেশী’। তিন সপ্তক-ব্যাপী দুরূহ সুরগুলি এবং ছন্দের মোকাবিলা তিনি করেছিলেন রাজার মতো— ঠিক যে ভাবে তিনি একের পর এক আধুনিক বাংলা গান গেয়ে গেছেন। কিন্তু চুলচেরা বিচারে আমরা মানতে বাধ্য যে, ভক্তিগীতি গাইতে গিয়ে তিনি অল্প মাত্রায় হলেও আবেগ এনে ফেলেছিলেন, যা তিনি আধুনিক গানে করেছিলেন পুরোপুরি পরিহার। ঠিক এই জায়গাতেই পান্নালাল ভট্টাচার্যর ঐতিহাসিক ভূমিকা।

তাঁর গাওয়া যে শ্যামাসংগীত সম্ভবত সবচেয়ে লোকপ্রিয় সেই ‘আমার সাধ না মিটিল’-র মতো ব্যথাতুর গানেও তিনি গায়কিতে টানটান, স্মার্ট, আধুনিক। মাপের বাইরে এক রত্তিও কিছু নেই। গলার একটি কাজেও বাড়তি কোনও স্বরাংশের সামান্য রোঁয়াও লেগে নেই। গায়কির এই আধুনিকতা সত্ত্বেও তাঁর উচ্চারণে কিন্তু সামান্য একটু সাবেকিয়ানা ছিল। ‘মায়ের পায়ের জবা হয়ে’ কথাগুলি তাঁর উচ্চারণের কারণে প্রায় ‘মাইয়ের পাইয়ের জবা হইয়ে’র মতো শোনাচ্ছে। যে ভাবে লিখলাম, সেটা স্পষ্ট করে পড়লে যে আওয়াজ আমরা পাব, তাঁর উচ্চারণের সাবেকিয়ানা অতটা প্রকট না হলেও কাছাকাছি। সত্যি বলতে কী, শ্যামল মিত্রের মতো প্রকৃত আধুনিক গায়কও ‘হয়ে’-কে প্রায় ‘হইয়ে’, ‘চেয়ে’-কে প্রায় ‘চেইয়ে’ বলেছেন। এই দুর্বলতা অত বড় শিল্পীরাও (আর কি কখনও কবে/ অমন ধনঞ্জয় বা শ্যামল হবে) কেন কাটিয়ে উঠতে পারলেন না কে জানে।

পান্নালাল ভট্টাচার্যর ‘য়’ উচ্চারণে এই দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতোই আধুনিক। এক শ্রেণির হিন্দু বাঙালিকে দেখেছি, যাঁরা ‘শ্যামাসংগীত’ কথাটাই পারতপক্ষে বলতেন না। বলতেন ‘মায়ের নাম’। পান্নালালের ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায়’, ‘কোথা ভবদারা’, ‘দোষ কারো নয় গো মা’, ‘আমার চেতনা চৈতন্য করে দে মা চৈতন্যময়ী’র মতো গানগুলিকে কেউ গদগদ মুখ করে নিছক ‘মায়ের নাম’ বলছেন শুনলে অল্প বয়সেই বিরক্ত হতাম। বাংলার শ্যামাসংগীত এক পুরোদস্তুর সংগীতরূপ, যার পিছনে দীর্ঘ সাংগীতিক ঐতিহ্য এবং ঐতিহ্যটি সেকুলার। সাবেক বাংলার এক অন্যতম ‘হিট’ রেকর্ডিং-শিল্পী কাশেম মল্লিক শ্যামাসংগীতও গাইতেন।

পান্নালালের গায়কি ছিল খোলামেলা, সোজাসাপটা, মাপে বাঁধা অথচ স্বতঃস্ফূর্ত, সাবলীল। অতি দুরূহ কাজ, ছুটতান, মুড়কি তিনি কণ্ঠে আনতে পারতেন কুলকুচো করার মতো সহজে। বোঝা যায়, কী দুর্দান্ত পরিশ্রমই না তিনি করেছিলেন গানের জন্য। শ্যামাসংগীতকে যুগোপযোগী করে তুলেছিলেন তিনি, করে তুলেছিলেন সম্পূর্ণ আধুনিক। এই ক্ষমতা যিনি রাখতেন, তিনি খোদ আধুনিক গানেও যে স্বকীয়তা দেখাবেন, তাতে বিস্ময়ের কী! আমি বিস্মিত হই তাঁর গাওয়া আধুনিক গানগুলি সম্পর্কে বেশির ভাগ বাঙালির অজ্ঞতা দেখে। তাঁর গাওয়া ‘রূপালি চাঁদ জাদু জানে’, ‘তীরে তীরে গুঞ্জন’, ‘ও আমার কাজলপাখি’ সেরা গায়কির এক-একটি দৃষ্টান্ত, শিক্ষা।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress