সুমনামি ২১

এক কালের দুই কণ্ঠশিল্পীকে আমি আমার জন্ম থেকে দেখেছি। তাঁদের মধ্যে এক জনের জন্মশতবর্ষ এই ২০১৪। সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। বিশ শতকের তিরিশের দশকের শেষ ভাগ ও চল্লিশের দশকের গায়ক যিনি কাজী নজরুল ইসলামের সুপারিশে আকাশবাণীতে চাকরি পাওয়ার পর বেতারে গান গাওয়া এবং নিয়মিত গানের গ্রামোফোন রেকর্ড করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। অথচ, চল্লিশের দশকে আধুনিক বাংলা গান ও রবীন্দ্রনাথের গানের শিল্পী হিসেবে যাঁর যথেষ্ট কদর ছিল। রবীন্দ্রনাথের নানান গান, যেমন ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’, ‘খেলার ছলে সাজিয়ে আমার গানের বাণী’, ‘সে কি ভাবে গোপন রবে’ ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ (একটি ছবিতে ব্যবহার করা) তাঁরই, যাকে বলে, ‘ফার্স্ট বেসিক রেকর্ড’। অর্থাৎ এই সব গান তাঁর আগে কেউ গ্রামোফোন রেকর্ড করেননি। তেমনি ‘এসো এসো হে তৃষ্ণার জল’ ও ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে’ তাঁর স্ত্রী উমা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে ফার্স্ট বেসিক। রবীন্দ্রনাথের গান তিনি রেকর্ড করতেন বিখ্যাত ট্রেনার শৈলজারঞ্জনের প্রশিক্ষণে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সুধীন্দ্রনাথকে গান শিখিয়ে সংগীতভবনে রাখতে চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে মধ্যস্থ ছিলেন বুলা মহলানবিশ। তাঁরই মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ এই তরুণ গায়কের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। বার বার বুলা মহলানবিশকে বলেছিলেন, ‘দেখো বাপু, ছোকরা আবার কবিতা-টবিতা লেখে না তো? তা হলে কিন্তু গান শেখাব না।’ সে দিনের সেই ‘ছোকরা’ কবিতার ধারেকাছেও ছিলেন না। কিন্তু কবি তাঁকে মাসে ২৫ টাকার স্টাইপেন্ড দিতে চেয়েছিলেন বলে যুবক সুধীন্দ্রনাথ খোদ রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ওই টাকায় সংসার চলত না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ডাকছেন গান শেখাবেন বলে আর তিনি টাকায় পোষাবে না বলে গেলেন না।

ছ’মাস বয়সে মা-হারা সুধীন্দ্রনাথ বড় হন তাঁর খুড়িমার কাছে, কারণ স্ত্রীবিয়োগের পর তাঁর বাবা সংসারে উদাসীন হয়ে এক রকম ভবঘুরে হয়ে যান। সুধীন্দ্রনাথের মেজদা অর্গ্যান বাজিয়ে গান গাইতেন। সেই গান শুনে শুনে ছোট ভাইয়ের শেখা। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে তরুণটি এক দুপুরে তাঁর মামার দেওয়া হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছেন গলা ছেড়ে, এমন সময়ে কে যেন বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লেন। বাড়িতে কেবল খুড়িমা আর দুই বউদি ছিলেন, তাঁরাই দরজা খুলে দিলেন। এক অপরিচিত ভদ্রলোক নমস্কার করে জানালেন তাঁর নাম শৈলেশ দত্তগুপ্ত, গানবাজনার সঙ্গে যুক্ত। সে সময়ে তিনি ছিলেন যথেষ্ট খ্যাতিমান, ফলে বাড়ির সকলের কী-করি-কী-করি ভাব। তিনি জানতে চাইলেন কে গান গাইছে। বাড়ির মেয়েরা ভয়ে ভয়ে জানালেন। গায়কের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন আক্ষরিক অর্থে রবাহূত সেই মানুষটি। কথা বেশি না বাড়িয়ে একটি দুটি গান শুনতে চাইলেন। তরুণটি প্রায় কাঁপতে কাঁপতে গেয়ে শোনালেন। শৈলেশ দত্তগুপ্ত বললেন, ‘ধুতি-শার্ট তো পরেই আছো, চলো, তোমায় নিয়ে যাব এক জায়গায়।’

শৈলেশ দত্তগুপ্তই সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানিতে নিয়ে যান। আজকের দিনে ভাবলে কেমন লাগে! বাংলা গানের প্রথম সুপারস্টার কে মল্লিক (কাশেম মল্লিক) ওই ভাবে যূথিকা রায়কে গ্রামোফোন কোম্পানিতে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।
শৈলেশ দত্তগুপ্ত ছাড়াও দুর্গা সেন, হিমাংশু দত্ত, কমল দাশগুপ্ত, দ্বিজেন চৌধুরি ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে আধুনিক বাংলা গান রেকর্ড করতে থাকেন সুধীন্দ্রনাথ। তাঁর ব্যারিটোন গলা হিমাংশু দত্তর বিশেষ পছন্দ ছিল। একাধিক ছবিতে তাঁকে দিয়ে প্লে-ব্যাক করিয়েছিলেন সুরসাগর। এক বার, শৈলেশ দত্তগুপ্তর সুরে তিনি একটি গান রেকর্ড করছেন, গানটির সুরে রামপ্রসাদি সুরের ধাঁচা, এমন সময়ে রেকর্ডিস্ট এসে জানালেন পান্নালাল ঘোষ তাঁর নিজের কাজে স্টুডিয়োয় এসে গানের মহড়া শুনে ধরে বসেছেন বাঁশিটা তিনিই বাজিয়ে দেবেন। সঙ্গে বাঁশি ছিল না। সেই রেকর্ডিংয়ের বাঁশিশিল্পীর একটি বাঁশি ধার করে নিয়ে বাজিয়ে ছাড়লেন বাঁশির দেবতা।— কেমনধারা মানুষ ছিল সে কালে! মৃত্যুর বছরখানেক আগেও সুধীন্দ্রনাথকে বিড়বিড় করে বলতে শুনেছি, ‘দ্যাখো কাণ্ডটা এক বার, খোদ পান্নালাল ঘোষ আমার মতো আকাটের সঙ্গে বাঁশি বাজিয়ে দিলে!’

পেশাদার গায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সত্য চৌধুরি ও সুধীন্দ্রনাথ কিছু দিন ত্রয়ী হিসেবে অনুষ্ঠান করে বেড়িয়েছেন। পর পর গাইতেন। সমান টাকা নিতেন। সুধীন্দ্রনাথ আমায় বলেছিলেন, ‘মাইক্রোফোন না থাকলে সত্য আর আমি রাজা। মাইক্রোফোন থাকলে হেমন্ত। ও জন্মেছিল মাইক্রোফোনের জন্য, মাইক্রোফোন আবিষ্কার হয়েছিল ওর জন্য।’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে সুধীন্দ্রনাথের গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ প্রিয়’ এবং ‘স্বপনসাগর পার হয়ে’ সমাদর পেয়েছিল। ‘তুমি কি দেখেছ প্রিয়’র সুরের আদলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পঞ্চাশের দশকে সুর করেন ‘আকাশের অস্তরাগে’, রেকর্ডে গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। বন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরের চেয়ে কিন্তু দুর্গা সেনের সুরে সুধীন্দ্রনাথের গানগুলি শ্রোতাদের মনে দাগ কাটতে পেরেছিল বেশি। ‘ফেলে দাও প্রিয় বাসি বাসরের মালা’, ‘যদি রাখিলে না কথা’, ‘ভুলে যেও মোর গান’। শেষের গানটি লিখেছিলেন সরোজ দত্ত, যিনি পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন, ষাটের দশকে নকশালপন্থী তাত্ত্বিক নেতা হয়ে ওঠেন এবং সত্তরের দশকের গোড়ায় রাষ্ট্রের আইনরক্ষীদের হাতে খুন হন।

আকাশবাণীতে চাকরি নেবার পর সুধীন্দ্রনাথ আর নিয়মিত গান করেননি। তবে, গীতিকার-সুরকার গোপাল দাশগুপ্ত দেশভাগের পর কলকাতায় চলে এলে তাঁর পাশে দাঁড়ান সুধীন্দ্রনাথ, তাঁর রচনা করা দুটি গান গ্রামোফোন রেকর্ড করে। সংগীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ পঞ্চাশের দশকে আকাশবাণী কলকাতার রম্যগীতির জন্য সুধীন্দ্রনাথকে বিস্তর বুঝিয়েসুঝিয়ে তাঁর সুরে দুটি গান রেকর্ড করান। তত দিনে সুধীন্দ্রনাথের ব্যারিটোন কণ্ঠ প্রায় ‘বেস’ (bass)-এ নেমে এসেছে। তবু, ‘তোমায় আমি পেয়েছি যতবার’ যে পরিমিতিবোধ ও ধ্যান দিয়ে তিনি গেয়েছিলেন তা বিরল।

সুধীন্দ্রনাথ কটক কেন্দ্রে চাকরি করার সময়ে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া নামে এক তরুণ বাঁশিশিল্পী সেখানে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দেন। তাঁর প্রতিভায় চমৎকৃত হয়ে সুধীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেন, তুমি বোম্বাই চলে যাও। সেখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তোমায় যোগ্য কদর দেবে। সেই তরুণকে দিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য আবেদন লিখিয়ে জোরালো ভাষায় তা সুপারিশ করে তাঁকে বোম্বাই কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিতে পেরেছিলেন এক বঙ্গসন্তান। দুজনের আর কোনও দিন দেখা বা কথা হয়নি।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress