সুমনামি ১৫

ভেবেছিলাম, বলেওছিলাম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সংগীতের দিকটি নিয়ে আরও লিখতে চেষ্টা করব, মানসিক প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। বাধ সাধল বন্ধুবর, সহ-গানখ্যাপা অনুপ মুখোপাধ্যায়ের পাঠানো এসএমএস: কৃষ্ণা দাশগুপ্ত চলে গেলেন। ওঁর গাওয়া, শ্যামল গুপ্তর লেখা আর নিখিল ঘোষের সুর করা ‘কে ভুলালে বারেবারে’ সমানে মাথার মধ্যে ঘুরছে। তার খানিক পরেই আমার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু, আর এক গানপাগল শচীদুলাল দাশ শোক জানিয়ে এসএমএস পাঠালেন।

কী আশ্চর্য, মহালয়ার রাতে, আকাশবাণীর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুরু হওয়ার আগে কলকাতা কেন্দ্রের অধিকর্তা স্বপ্না মণ্ডল, সুপ্রিয় রায় ও আরও দুজন আকাশবাণীর এফ এম চ্যানেলে আমার যে সাক্ষাৎকার নেন, তাতে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে ‘অখিল বিমানে’ গানটির শিল্পী কৃষ্ণা দাশগুপ্তর কথা তুলেছিলাম আমি। আমি আকাশবাণীর সন্তান। ছেলেবেলায়, অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে, আকাশবাণীর এই মহাকাব্যিক অনুষ্ঠানটি আমার কেমন লাগত, কোন গানগুলি প্রথমেই মনে দাগ কেটেছিল, তা নিয়েই কথা বলছিলাম আর কখনও হারমোনিয়াম, কখনও গিটার বাজিয়ে গান ও সুরের দৃষ্টান্ত দিচ্ছিলাম। এই ভাবেই কৃষ্ণা দাশগুপ্তর কথা তুলেছিলাম ‘অখিল বিমানে’ গানটির প্রসঙ্গে। এই গানটি পরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও গেয়েছিলেন। সেই রেকর্ডিংটাও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-তে বাজে। আমার কানে কিন্তু লেগে ছিল, লেগে আছে কৃষ্ণার কণ্ঠ ও গায়কি।

সাক্ষাৎকারে স্বপ্না মণ্ডল আনলেন ‘রম্যগীতি’র প্রসঙ্গ। সাত-আট বছর বয়সে ‘রম্যগীতি’-তে শোনা কৃষ্ণা দাশগুপ্তর গাওয়া ‘কে ভুলালে বারেবারে’ আমায় প্রায়-পঁয়ষট্টি বিয়োগ সাত-আট— এতগুলো বছর সঙ্গ দিয়ে চলেছে। সত্যি বলতে, অনেকের কাছে কৃষ্ণা দাশগুপ্ত মানে ‘অখিল বিমানে’ হতেই পারে। আমার কাছে তিনি ‘কে ভুলালে বারেবারে’।

গানটি ইউটিউবে পাওয়া যায়। ইন্টারনেট ও ইউটিউব আশীর্বাদ। ছেলেবেলায় বেতারে যে সব গান শুনতাম, সব ক’টাই যে সারা জীবন মনে রাখার মতো, তা নয়। কিন্তু এমন কিছু স্মরণীয় গান ছিল, যেগুলি বেতারে মাত্র এক বার কি দু’বার শুনেছি, মেরেকেটে বার তিনেক। তার পর আর শোনার সুযোগ পাইনি। আজ ইন্টারনেটে সে রকম বেশ কিছু গান শুনে নেওয়া সম্ভব। এটা যে কত বড় পাওয়া!

‘কে ভুলালে বারেবারে’ প্রথম শুনেই মরে গিয়েছিলাম। কী সুর, কী মেজাজ, কী বাজনা! একদম ছেলেবেলা থেকেই আমি কোনও দিন শুধু ‘গান’ শুনিনি। গানের সঙ্গে যে বাজনা, সেটি বোধ হয় আরও মন দিয়ে শুনতাম। গানের সুর যত আকর্ষণীয়ই হোক, সঙ্গের বাজনাটা ভাল না লাগলে সেই গানের আবেদন আমার কাছে কমে যেত। প্রথম শুনেই ঠিক করে ফেলেছিলাম এই গানটা আমায় তুলতেই হবে। প্রত্যেক রম্যগীতি অনুষ্ঠানে খাতা-পেনসিল নিয়ে বসে থাকতাম— কবে, কত ক্ষণে এই গান বাজাবে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে খুব বেশি হলে বার চারেক শুনেছি। তারই মধ্যে লিখে ফেলেছি, তুলে নিয়েছি। তার পর থেকে এতগুলো বছর কোনও খাতা লাগেনি, মন থেকেই গেয়েছি গানটি। তাও, সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে দৃষ্টান্ত দেওয়ার মতো করে এই গানটি গাইতে গিয়ে ভুল করে বসলাম এক জায়গায়। বুড়ো হয়েছি, আরও হচ্ছি দিনে দিনে। কথা গুলিয়ে যাচ্ছে। ছেলেবেলায় শোনা প্রিয় গানগুলির স্মৃতি কিন্তু কখনও বুড়ো হয় না। সেই গানগুলি যে সব কণ্ঠে শুনেছিলাম, আমাদের স্মৃতিতে সেই কণ্ঠগুলিরও বয়স বাড়ে না কখনও। মহালয়ার গভীর রাতে আমার স্মৃতিচারণের সূত্রে কৃষ্ণা দাশগুপ্তর কণ্ঠটি যেই শোনা গেল, চমকে উঠলাম। আশ্চর্য, গানটি প্রথম শুনেছিলাম কোন ছেলেবেলায়! এখন আমি সেই বিরাট বাড়িটার একটি স্টুডিয়োয় বসে কথা বলছি, গান গাইছি, যে বাড়িটার একটি স্টুডিয়োয় ১৯৫৮ সালে প্রথম ‘শিশুমহল’-এ গান গেয়েছিলাম। কবেকার কথা! অথচ কৃষ্ণা দাশগুপ্তর কণ্ঠে, তাঁর এই গানে বেজে উঠছে আমার ছেলেবেলার আবিষ্কার, আমার সেই সব-মুছে-দেওয়া ভাল লাগা, আমার প্রথম সর্বনাশ।— এই মুহূর্তটির মাত্র কয়েক দিন পরে তিনি চলে গেলেন।

পঞ্চাশের দশকের কণ্ঠশিল্পী কৃষ্ণা দাশগুপ্ত ছিলেন সে যুগের প্রত্যেক স্বীকৃত শিল্পীর মতোই অনন্য। অদ্ভুত এক যুগ। সুপ্রভা সরকার, সুপ্রীতি ঘোষ, উৎপলা সেন, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, গায়ত্রী বসু, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, ইলা বসু, বাণী ঘোষাল— প্রত্যেকে আধুনিক গানে আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব, কৃষ্ণাও।

ইন্টারনেটেই তাঁর গাওয়া ‘বলেছি তোমারে’ আর ‘রাতের গভীরে কে গো’ রয়েছে। পাঠকরা যদি অনুগ্রহ করে ইউ টিউবে ‘কে ভুলালে বারেবারে’, ‘বলেছি তোমারে’ ও ‘রাতের গভীরে কে গো’ শোনেন, আমার কথাগুলি তা হলে যাচাই করে নিতে পারবেন। হিন্দুস্তানি রাগসংগীতে, খেয়াল ও ঠুংরি আঙ্গিকে দস্তুরমত তালিম পাওয়া এই শিল্পী। গানগুলি শুনে মনে হয়, সুরকাররা কৃষ্ণার জন্য অলংকারসমৃদ্ধ, গলার সূক্ষ্ম কারুকাজ-নির্ভর সুরই করতেন প্রাণ ভরে। সুরের কাঠামোর এককাট্টা নির্দিষ্টতায় রাখা নেই তাঁর গানের সুরগুলি। অথচ গানগুলি আধুনিক বাংলা গান, রাগপ্রধান গান নয়। ‘কে ভুলালে বারেবারে’ বা ‘বলেছি তোমারে’ গান দুটি ঠুংরি-ঘেঁষা হলেও একরত্তিও কালোয়াতি নেই। সুযোগ পেলে গলা খেলিয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়ার লোভ সামলানো কঠিন— বিশেষ করে ওই কাজটি করার ক্ষমতা যদি থাকে। পঞ্চাশের দশকের রম্যগীতির কিছু আধুনিক গান নতুন করে রেকর্ড করতে গিয়ে আমাদের যুগের কোনও কোনও বরেণ্য শিল্পী, যাঁরা রাগসংগীতে তালিম পাওয়া, এমন কণ্ঠ-কসরত দেখিয়ে ফেলেছেন যে মূল গানগুলিকে আর চেনাই যায় না। অলংকারবহুল সুরও যে কণ্ঠে কালোয়াতির আড়ম্বর না রেখে, সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়— কৃষ্ণা দাশগুপ্ত তার এক স্মরণীয় প্রমাণ। মধ্যসপ্তক থেকে তারসপ্তকের পঞ্চম পর্যন্ত তিনি যেন গুনগুন করেই চলে যেতে পারতেন। ‘রাতের গভীরে কে গো’ গানটির স্থায়ীর সুরই মধ্যসপ্তকের শুদ্ধ গান্ধার থেকে এক ঝোঁকে তারসপ্তকের শুদ্ধ গান্ধারে চলে গিয়েছে। অন্তরা শুরুই হচ্ছে তারসপ্তকের শুদ্ধ গান্ধারে। সেখানে ছ’মাত্রা টানা অবস্থান করে সুর এক বার তারের ষড়জের আশেপাশে একটু ঘুরেই চলে যাচ্ছে তারের শুদ্ধ মধ্যম। সেখান থেকে পঞ্চম ছুঁয়ে তারের শুদ্ধ গান্ধার। আয়াসের লেশমাত্র নেই কোথাও। গোটা গানের পরিবেশনা জুড়ে স্নিগ্ধতা।

স্নিগ্ধতা। ‘কে ভুলালে বারেবারে’ ছ’মাত্রায়, মাঁজ খামাজ রাগে বাঁধা একটি গান, যা একই সঙ্গে আধুনিক এবং ঠুংরি চালের বাংলা গান। সুরকার পণ্ডিত নিখিল ঘোষ ছিলেন তবলার শিল্পী, তবলার এক গুরু। রম্যগীতিতে তাঁর সুরে আরও কয়েকটি গান আছে। ‘ছন্দে ছন্দে’, ‘গুনগুনগুন অলি গায়’, ‘নদী বয়ে যায়’— সবই পঞ্চাশের দশকে প্রথম শুনেছিলাম। প্রতিটি পৃথক সৃষ্টি। ‘কে ভুলালে বারেবারে’ ঠুংরি-ঘেঁষা। খেয়াল করা দরকার ‘কে’ কথাটি কী ভাবে গাইছেন কৃষ্ণা। প্রশ্নটি তিনি প্রতি বার গাইছেন নিটোল সুরে প্রশ্ন হিসেবেই। ও দিকে নিখিল ঘোষ সারেঙ্গির সঙ্গে প্রয়োগ করছেন পিয়ানো। জানি না কোন শিল্পীর আঙুলের নরম ছোঁয়ায় কর্ডগুলি স্বপ্নের মতো অন্তরঙ্গ। অমন করে ‘কে’ শুধোলে উত্তরও তো এমনই হবে।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress