সুমনামি ১৪

ও যে মানে না মানা’ গানটির সুর করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ শুদ্ধ স্বরবিশিষ্ট সপ্তকের শুদ্ধ গান্ধারটিকে ‘সা’ মেনে আগের শুদ্ধ স্বরগুলিকে রক্ষা করেও ভৈরবী রাগের আমেজ এনেছিলেন এই মর্মে ‘সুমনামি’-তে লিখেছিলাম আমি। এক সুধী পাঠক, শ্রী উৎপল চক্রবর্তী, চিঠিতে জানিয়েছেন, ‘নতুন একটা রচনার পদ্ধতি রবীন্দ্রনাথ তৈরি করে নিয়েছিলেন এই ভাবে’ আমার এই কথাটি ‘সত্য নয়’।

তিনি জানিয়েছেন ‘‘এই ধরনের রচনাশৈলীর কথা মতঙ্গ রচিত ‘বৃহদ্দেশী’ বা শার্ঙ্গদেব রচিত ‘সঙ্গীত রত্নাকর’-এ দেখা যায় যা জেনে বা পড়ে রবীন্দ্রনাথ ওই শৈলীকে সম্ভবত তাঁর গানে প্রয়োগ করেছেন।’’
‘সম্ভবত’।

অর্থাৎ মান্যবর নিজের তত্ত্বের বিষয়ে খুব নিশ্চিত নন। তাও তিনি মনে করেন আমার কথা সত্য নয়। তিনি যুক্তিবাদী বই কী। কী ভাবে রবীন্দ্রনাথ সুর করতেন কোনও লেখায় আছে কি? কাউকে কিছু বলে গিয়েছেন কি? তা লিপিবদ্ধ হয়েছে কি কোথাও? কোনও সুর মাথায় এলে তিনি স্বরলিপি করে রাখার জন্য কাউকে ডেকে নিতেন বলে শুনেছি। কী ভাবে সুর করতেন তা কি কেউ জানেন?

আধুনিক বাংলা গানের এক অসামান্য সুরকার রতু মুখোপাধ্যায় আমায় বলেছিলেন, তিনি খালি গলায় সুর করতেন। আমরা যারা মোটের ওপর বাজনা-নির্ভর, সহজে ভাবতে পারব না ‘বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা’, ‘কী দেখি পাই না ভেবে গো’ এই সব সুর কেউ খালি গলায় গেয়ে গেয়ে দিয়েছেন। আমার যুগের এবং সর্বকালের এক আশ্চর্য নিরীক্ষামনস্ক সুরকার প্রতুল মুখোপাধ্যায়ও, শুনেছি, খালি গলায় সুর করে থাকেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর গানের সুরগুলি খালি গলায় দিয়ে থাকতেই পারেন, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় প্রাচীন বা সমকালীন কোনও বই পড়ে, তা থেকে সুরপ্রয়োগের শিক্ষা নেওয়ার ভূমিকা থাকত কি?
পাশ্চাত্যের সংগীত স্বরলিপি-নির্ভর। আমাদের সংগীত তা নয়। উপমহাদেশের মানুষ বরাবর সংগীতশিক্ষা করে এসেছে গুরুদের মুখে শুনে শুনে। ‘শোনা’ কাজটা আমাদের সংগীতশিক্ষার মস্ত বড় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আমায় বলেছিলেন, তিনি যখন আচার্য বড়ে গোলাম আলি খান সাহেবের কাছে, বাংলায় যাকে বলে ‘নাড়া বেঁধে’ তালিম নিতে যান, আচার্য বলেছিলেন সংগীতশিক্ষার বারো আনাই হল শোনা, মাত্র চার আনা হল গুরুর কাছে নেওয়া তালিম। কী ধরনের গানবাজনা আমরা শুনে আসছি, শুনছি ও শুনব তার ওপর নির্ভর করছে আমরা কী কী শিখতে পারছি ও পারব।

রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে গানবাজনার চল ছিল রীতিমত। রাগসংগীত, কালোয়াতি গান যেমন হত, তেমনই বাজত পিয়ানো। বাড়িতে বসেই তিনি পিয়ানোয় রাগভাঙা সুরের নমুনা শুনতেন। দেশি সংগীতের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের গানবাজনাও ছেলেবেলাতেই যথেষ্ট শুনেছিলেন। শ্রুতিধর ছিলেন তিনি। শ্রুতিধর না হলে ভাল সংগীতশিল্পীও হওয়া যায় না, ভাল সুরকারও হওয়া যায় না। বেশ অল্প বয়সে তিনি ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’য় ‘এনেছি মোরা, এনেছি মোরা’র প্রথম লাইনটির সুর ‘হি ইজ আ জলি গুড ফেলো’ গানের সুরে বানিয়ে নিয়েছিলেন। এ জন্য তাঁকে বিলিতি গানের শাস্ত্র বা হ্যান্ডবুক পড়তে হয়েছিল, মনে হয় না। এ সুর শুনে বানানো।
অল্পবয়সের কাজ ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’-তেই বাল্মীকির কণ্ঠে একটি গান আছে: ‘ব্যাকুল হয়ে বনে বনে’।

পাঠকদের কাছে আমার অনুরোধ: এই গানটি শুনুন, তার পর আচার্য আলি আকবর খান ও আচার্য রবিশঙ্করের ‘মাঁজ খামাজ (খাম্বাজ)’ রাগে যুগলবন্দিটি শুনুন। এই ‘ইপি’ (এক্সটেন্ডেড প্লে) রেকর্ডটি এইচ এম ভি বের করেছিলেন বিশ শতকের ষাট দশকের একেবারে গোড়ায় ৪৫ আরপিএম-এর গ্রামোফোন রেকর্ড তখন সবে বেরোচ্ছে ভারতে। ইউ টিউবে খুঁজলে হয়তো আজও পাওয়া যাবে। শ্রোতারা লক্ষ করতে বাধ্য ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’র গানটির স্থায়ীর সঙ্গে সেতার-সরোদে বাজানো গৎ-এ সুরে কতটা মিল। মনে হবে স্বরগুলি যেন রবীন্দ্রনাথের সুরের ছাঁদেই বসানো। গৎ-এর এক মোক্ষম জায়গায় তীব্র মধ্যম স্বরটি ধারালো ছুরির মতো বুকে এসে লাগে যদি শোনার কান থাকে। রবীন্দ্রনাথের সুরেও প্রথমে শুদ্ধ মধ্যম থাকলেও ‘কে পুরাবে মোর কাতর প্রাণ’-এর ‘বে’-তে কী অমোঘ ভাবে রয়েছে তীব্র মধ্যম। সব মিলিয়ে বিবেচনা করলে মনে হতে পারে আলাউদ্দিন খান যে ‘মাঁজ খামাজ’ রাগটি সৃষ্টি করেছিলেন, তার সূত্র ছিল রবীন্দ্রনাথের এই গানে। আবার এমনও হয়ে থাকতে পারে যে, তাঁরা দুজনেই স্বাধীন ভাবে ওই বিশেষ স্বরবিন্যাসটি ভেবে ভেবে তৈরি করে নিয়েছিলেন। সংগীতাচার্য হয়তো জানলেনই না যে-রাগটি তিনি গড়ে নিলেন বলে ভাবলেন তার পূর্বাভাস, এমন কী মোটামুটি গোটা রূপটাই ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’র একটি গানে ধরা আছে। লিখিত প্রমাণ যখন নেই, জোর দিয়ে কিছু বলারও জো নেই।

আচার্য আলি আকবর খান ও আচার্য রবিশঙ্কর তাঁদের গৎ-এর সুরটি বাজিয়ে মোকামে ফিরছেন শুনে মনে হয় ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’-র ওই গানটি তাঁদের শোনা ছিল। ‘ব্যাকুল হয়ে বনে বনে ভ্রমি একেলা শূন্যমনে’।

এই হল ছোট্ট স্থায়ী। পুরোদস্তুর স্থায়ী-অন্তরা-সঞ্চারী-দ্বিতীয় অন্তরার কাঠামো নেই বলে কেউ যদি বলেন যে প্রথম ওই দুই লাইনকে ‘স্থায়ী’ বলা চলবে না, তা হলে ধরুন আমরা বলছি প্রথম অংশ। এর শুধু ‘মনে’-তে ১৬ মাত্রার চমৎকার এক সুরবিহারের পর রবীন্দ্রনাথ যে-ভাবে মোকামে ফিরছেন, তার সঙ্গে সেতার-সরোদ যুগলবন্দির গৎ-এর মোকামে ফেরার মিল রসিক শ্রোতার কান এড়ানোর কথা নয়। এই রে, আবার ‘মোকাম’ লিখে বসলাম। শ্রী উৎপল চক্রবর্তী তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ চিঠিতে জানাচ্ছেন “সুমনবাবু ‘মোকাম’ শব্দটিকে যে অর্থে ব্যবহার করেছেন, তা সঠিক নয় (যদিও অ-শাস্ত্রজ্ঞ কোনও কোনও ব্যক্তি এই শব্দকে এই ভাবেই ব্যবহার করেন)।

আসল শব্দটা ‘মুকাম’, যার অর্থ ‘প্রদেশবাচক’।
ইরানি সংগীতের এই শব্দ ‘অক্টেভ’ বোঝায়।… সুমনবাবু যে ধরনের ‘মোকাম’ দেখিয়েছেন, তাকে শাস্ত্রমতে স্থায় বা গ্রহ বা অংশ স্বর বোঝায়।” আমি শাস্ত্রজ্ঞ নই। ছেলেবেলা থেকে যাঁদের কাছে গান এবং হিন্দুস্তানি রাগসংগীত শেখার চেষ্টা করেছি, তাঁদের সকলকেই ‘মোকাম’ বলতে শুনেছি। মূল স্বর, যেখানে সুর এসে শেষবেশ ভিড়ছে। সুর যেখানে ঘরে ফেরে, গুরুরা সেটাকেই ‘মোকাম’ বলতেন। তাঁরা অ-শাস্ত্রজ্ঞ বই কী। সংস্কৃত, ফারসি, ইরানি সংগীত, এ সব জানতেন না। শাস্ত্র পড়েননি। তবে সংগীত, রাগসংগীত কাকে বলে জানতেন।

উৎপলবাবুর লেখা পড়ে রবীন্দ্রনাথের তৈরি একটি শব্দ খালি মনে পড়ছে: ‘দস্তুরবুড়ো’।
সেই সঙ্গে (শাস্ত্রজ্ঞ উৎপলবাবুর প্রেরণায়) ভাবছি ‘শেষ পারানির কড়ি’ গান নামে এক দস্তুরভাঙা ব্যাপারকে কণ্ঠে-নেওয়া আমার বুড়োটা ‘ব্যাকুল হয়ে বনে বনে’র সুরের আইডিয়াটা কোন শাস্ত্রে বা গ্রন্থে পেয়েছিলেন! কোন দস্তুরশাস্ত্রী এই আধুনিক সুপার-মিউজিশিয়ানের ভাবনায় ঝড়ের হাওয়া লাগিয়ে দিয়েছিলেন! আমাদের ‘দস্তুরবুড়োরা’ ভাবতে শেখেন না যে, শিশু, জাত-বিজ্ঞানী আর জাত-শিল্পী এই তিন জনেরই দুটি ক্ষমতা থাকে, কোনও শাস্ত্রে যার হদিশ মেলে না। একটি হল ‘বিস্ময়’, অন্যটি ‘আন্দাজ’।

বড় বিজ্ঞানী ও শিল্পীরা সেই আন্দাজের জোরেই এমন সৃষ্টি করে বসেন, যা সন্ধানীদের পথ দেখায়।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress