সুমনামি ১২

ছেলেবেলায় বেতারে একটি আধুনিক বাংলা গান শুনে চমকে উঠেছিলাম।
‘কাঠফাটা রোদে
পিচ-ঢালা পথে
ঝড়বাদলেতে
শীতের রাতে
রিকশা চালাই মোরা রিকশাওয়ালা।’

কলকাতা শহরে বসে শুনছি এই গান। ‘রিকশাওয়ালা’র পর আবার প—ম—/গ—/— এই সুরে মিষ্টি করে ‘ঠুং ঠুং ঠুং’ কথাগুলিও ছিল। যেন, কাঠফাটা রোদ, ঝড়বৃষ্টি আর ঠান্ডায় রিকশা চালানোর মতো মধুর কাজ আর দুটি নেই। তার বছর দুই আগে কটক থেকে এসেছি— যেখানে রিকশা বলতে সাইকেল রিকশা। টানা রিকশা প্রথম দেখি কলকাতায়। দারুণ গরমে রাস্তায় পিচ গলছে আর রিকশাওয়ালা খালি পায়ে রিকশা টানছেন।

ছেলেবেলাতেই একাধিক বার চলন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখার সুযোগ হয়েছিল, চাষিরা খেতে চাষ করছেন। সানন্দে ওই কাজ তাঁরা করছেন— দেখে অন্তত মনে হয়নি। তাই বেতারে যখন রবীন্দ্রনাথের ‘আমরা চাষ করি আনন্দে’ গানটি প্রথম শুনলাম, অবাক হলাম। পাঁচ-সাড়ে পাঁচ বছর বয়সেই শোনা, সমবেত কণ্ঠে। ঠিক একই রকম গানের-কথা-যেমনই হোক-না-কেন-মোদের-কিছু-যায়-আসে না-ভঙ্গিতে গাওয়া গানটি শুনে অবাকও লাগছিল, হাসিও পাচ্ছিল। ‘চাষ’-এর জায়গায় ‘গান’ কথাটি থাকলে সুর তাল ছন্দ আর লিরিকের যুক্তি হয়তো বজায় থাকত।

বাবা-মা-দাদার সঙ্গে বসুশ্রী সিনেমা হলে জলসা শুনতে গেলাম এক পয়লা বৈশাখের সকালে। আমার বয়স তখন ছয়-সাতের মধ্যে। পঞ্চাশের দশকের নামী শিল্পীরা একের পর এক গেয়ে যাচ্ছেন। যন্ত্র বলতে হারমোনিয়াম আর তবলা। কেউই দু-তিনটির বেশি গান গাইছেন না। মহিলা শিল্পীদের সাজ-পোশাকের ঘটা নেই। পুরুষরা পরেছেন ধুতি আর পাঞ্জাবি বা বাংলা শার্ট। সতীনাথ মুখোপাধ্যায় পরেছিলেন পাজামা আর বাংলা শার্ট। ব্যতিক্রম। ঘোষণা হল দিলীপ সরকারের নাম। তাঁর মঞ্চে আসাটাই আলাদা। স্মার্ট হাঁটাচলা। শ্যামল দত্ত ও তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া বেশির ভাগ পুরুষশিল্পী হাঁটাচলায় গদাইলশকর। দিলীপবাবুর চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। ধোপদুরস্ত ধুতি, ফিনফিনে পাঞ্জাবি। বাঁ হাতের সোনালি ব্যান্ডওয়ালা সোনালি ঘড়িটা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। সেই হাতে হারমোনিয়ামের বেলোটা দু’বার টেনেই সুরেলা গলায়, মিষ্টি উচ্চারণে তিনি গেয়ে উঠলেন: ‘ঠুং ঠুং ঠুং’।
তুমুল হাততালি।

চমৎকার একটি টুকরো তুলে তবলায় ঠেকা ধরলেন সংগতকারী। সামনে থেকে সেই প্রথম শুনছি দিলীপ সরকারের গান। সুপুরুষ গায়কটি মুখে এক টুকরো হাসি নিয়ে বুক চিতিয়ে গান ধরেছেন: ‘কাঠফাটা রোদে/ পিচঢালা পথে’।
কী সুরেলা গলা! গায়কিতে কী ছন্দ! বাংলা হিসেবে ডবল দাদরা তালে গানটা চলেছে যেন নাচতে নাচতে। আশপাশের সকলেই দুলে উঠছেন। ‘রিকশা চালাই মোরা রিকশাওয়ালা’।— ‘মোরা’? রিকশা যাঁরা সত্যিই চালান, তাঁদের এক জনও তো বাঙালি মধ্যবিত্তের এই পয়লা বৈশাখের জলসায় নেই। বাইরে আছেন কেউ কেউ। অপেক্ষা করছেন— হলের ভেতরে যাঁরা ‘ঠুং ঠুং ঠুং’ করছেন, তাঁরা আরও ঘণ্টা দুই পরে হয়তো ‘ঠুং ঠুং’ ভাঁজতে ভাঁজতেই বেরোবেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিশ্চয়ই আসল ‘ঠুং ঠুং’দের ‘তুমি’ বা ‘তুই’ সম্বোধন করে গন্তব্য জানিয়ে টানা-রিকশায় চড়ে বসবেন।

দিলীপবাবুকে তার পর দেখি আমাদের এস আর দাস রোডের বাড়িতে। আমার বাবা, সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়কে গান শোনাতে আসতেন। আকাশবাণীতে ও লঘু সংগীতের দুনিয়ায় সুধীন্দ্রনাথকে লোকে ডাকত ‘বড়দা’ বলে। সুপ্রভা সরকার ছিলেন ‘বড়দি’। পয়লা বৈশাখের সেই প্রভাতী জলসায় দিলীপবাবুকে যেমন ফিটফাট দেখেছিলাম, নিত্য জীবনেও তেমনই ছিলেন। তাঁর গায়কি ও সুরের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও স্বভাবের মিল পেতাম। খোলা গলায়, নিখুঁত উচ্চারণ ও স্বর প্রক্ষেপে গাইতেন তিনি। আক্ষরিক অর্থেই ‘দশ ফুট বাই দশ ফুট’ দুটি কামরায় ছিল সুধীন্দ্রনাথের সংসার। সস্ত্রীক যে-ঘরে তিনি শুতেন, অতিথিরা এলে বসতেন সেই ঘরেই। হারমোনিয়ামটা থাকত খাটের তলায়। দিলীপবাবুকে দেখতাম যন্ত্রটি তিনিই বের করে আনতেন। প্রতি বারই সুধীন্দ্রনাথ বারণ করতেন, প্রতি বারই অবাধ্য হতেন দিলীপবাবু। ধোপদুরস্ত পোশাক পরা মানুষটি মেঝেতে বসে পড়তেন হারমোনিয়াম নিয়ে। তিনি কিন্তু তখন বাংলার প্রথম সারির এক শিল্পী। গান ধরতেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। তার আগে জানিয়ে দিতেন গানটি কবে বেঁধেছেন। ‘ঠুং ঠুং’-এর বিরক্তিকর স্মৃতি চাপা পড়ে গিয়েছিল তাঁর অন্য গানগুলির আবেদনে।

পঞ্চাশের দশকে আধুনিক বাংলা গানের জগতে এত জন প্রবল সুরকারকে আমরা পেয়েছিলাম— তা নিয়ে ভাবলে আজও এক ধরনের ঘোরে চলে যাই। এমন আশ্চর্য ঘটনা পৃথিবীর আর কোনও দেশের সংগীত ইন্ডাস্ট্রিতেই ঘটেনি। সকলের মধ্যে দিলীপ সরকার নিজের আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন।

ইংরিজি দুনিয়ায় যাকে পপ্ মিউজিক বলা হয়, আমাদের আধুনিক বাংলা গান কিছুটা সেই বিভাগের। শচীন দেব বর্মনের রাগাশ্রয়ী কিছু গানকে (যেমন, মধু বৃন্দাবনে দোলে রাধা, যদি দখিনা পবন) ‘মডার্ন’, অর্থাৎ আধুনিক গানের বিভাগে ফেললে গোত্রের গোলমাল হবে এই ভেবে গ্রামোফোন কোম্পানি ওগুলিকে ‘ক্লাসিকো মডার্ন’ আখ্যা দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য সেই বিভাগটি তুলে দেওয়া হয়। যাই হোক, জার্মানির ‘শ্লাগার’ (Schlager) বা ইংরিজি দুনিয়ার ‘পপ্’-এর সঙ্গে বাংলা আধুনিক গানের একটা গুণগত তফাত হল: আধুনিক বাংলা গান একই সঙ্গে ‘পপ্ সং’ এবং ‘আর্ট সং’।

লিরিক ও সুররচনার মানসিকতাটাই আলাদা। এ নিয়ে পরে কখনও আলোচনা হবে। আপাতত সংক্ষেপে এই ধরতাইটুকু দেওয়ার দরকার: পাশ্চাত্যের পপ্-এ সুর তাল ছন্দের দিক দিয়ে বৈচিত্র থাকলেও তা আধুনিক গানে উপমহাদেশে তিরিশের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত যে বিপুল বৈচিত্র দেখা গিয়েছে, তার ধারেকাছেও আসে না। পঞ্চাশের দশকের অন্য বড় সুরকারদের মতো দিলীপ সরকারের সুরেও পাওয়া যায় পপ্-এর পাশাপাশি আর্ট সং-এর পরিচয়। তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘এক এক দিন মেঘ করে’ বা গায়ত্রী বসুর গাওয়া ‘শুকতারা আকাশের কোণেতে’ যেমন মনোরম সুরে-ছন্দে পপ্-গোত্রীয়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া ‘তন্দ্রা এলো’ বা সুপ্রীতি ঘোষের গাওয়া ‘পদ্মকলি আকাশ খোঁজে’ তেমনই নিঃসন্দেহে আর্ট সং।
দিলীপবাবু গান লিখতেনও। ‘তন্দ্রা এলো’ তাঁরই লেখা। তেমনই গায়ত্রী বসুর গাওয়া ‘কোন দূরের বনের পাখি’।

লেখা সুর দুটোই তাঁর। তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া সুরের ওঠা-নামায় ও পরিমিত কারুমিতিতে ছন্দোময় ও উজ্জ্বল গান ‘মোর মালঞ্চে বসন্ত নাই রে নাই’ তাঁর লেখা-সুর বলেই জানি। বাণী ঘোষালের গাওয়া ‘হায় চাঁদ তুমি শুধু জানো মোর মনের কথা’ আর গায়ত্রী বসুর গাওয়া ‘কোন দূর বনের পাখি’— সুর ও অনুচ্চ ছ’মাত্রার ছন্দে অপূর্ব মায়াময় ও রোম্যান্টিক। সেই ছোটবেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছি ‘শুকতারা আকাশের কোণেতে’ শুনে। বিরহের গানে যে এমন পবিত্র ছেলেমানুষি থাকতে পারে কে জানত। বিষয়টিতে রাতের উল্লেখ। অথচ সুরে কোথায় যেন সকাল-সকাল ভাব। সুরের কী আশ্চর্য রসায়ন যে জানতেন এই সুরকার! পাঁচ বছর বয়সে প্রথম শোনা। ষাট বছর ধরে আমায় ভাবিয়ে আসছে এই গান, যন্ত্রানুষঙ্গসমেত। শুনি আর মরি। কী যে সুখ!

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress