সুমনামি ০৪

পল্লিগীতি থেকে শুরু করে সমকালীন আধুনিক বাংলা গান। লিরিকে লিরিকে বাঁশি ছড়ানো। কবে কোন কালে চাঁদ কাজি গান বেঁধেছিলেন— ‘অসময়ে বাজাও বাঁশি’।

আধুনিক যুগে ‘ক্লান্ত বাঁশির শেষ রাগিণী’ থেকে ‘বন্ধু বাঁশি দাও মোর হাতেতে’ হয়ে ‘বাঁশি কেন গায়’ ছুঁয়ে ‘বাঁশুরিয়া বাজাও বাঁশি’ পেরিয়ে আধুনিক বাংলা গান যে চলেছে আগামীর দিকে, সেই চলার পথে বাঁশিও পথিক।
দীর্ঘ কাল বাঁশি আকারে ছিল ছোট। স্থান ছিল প্রধানত পল্লিসংগীতে। এক বঙ্গসন্তান সেটিকে দিলেন নতুন রূপ। নিয়ে গেলেন আবিশ্ব ধ্রুপদী সংগীতের আসরে। পৃথিবীর প্রথম ৩২ ইঞ্চি লম্বা, সাতটি ফুটোওয়ালা বাঁশের বাঁশি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কৈশোরেই জড়িয়ে পড়ে ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য জন্মস্থান বরিশাল থেকে ১৯২৬ সালে কলকাতায় পালিয়ে আসা পান্নালাল ঘোষ বাঁশিকে করে তুলতে পেরেছিলেন ‘কনসার্ট’ যন্ত্র বা সেতার সরোদ সানাই সারেঙ্গির সমান, অর্থাৎ ধ্রুপদী সংগীতের আসরে যা একক গরিমায় বাজতে পারে মূল যন্ত্র হিসেবে। ২০১১ সালের ২৪ জুলাই তাঁর জন্মশতবর্ষ চলে গেল। যে শহরে তিনি তাঁর প্রথম সংগীতগুরু খুশি মহম্মদ খানের কাছে নাড়া বেঁধে রাগসংগীতে তালিম নিয়েছিলেন এবং সেই গুরুর মৃত্যুর পর তালিম নিয়েছিলেন আচার্য গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর কাছে, সেই শহর তাঁকে মনে রাখল না। মনে রাখল কিন্তু বাংলাদেশ। ঢাকায় কয়েক দিন ধরে উদ্যাপিত হল শতবর্ষ।

অনেক কাল ধরে পশ্চিমবঙ্গের প্রভুদের মস্ত এক বৈশিষ্ট্য হল— তাঁদের আর যা-ই থাক, লজ্জা নেই। কী বাম আমলে, কী মমতা আমলে, রাজনৈতিক নেতা ও তাঁবেদাররাই ঠিক করলেন রাজ্য সংগীত অ্যাকাডেমিতে কারা থাকবেন। এই রাজনৈতিক প্রভুরা এবং অ্যাকাডেমির বর্তমান সদস্যরা সম্ভবত জানেনও না, ভারতীয় সংগীতে আচার্য পান্নালাল ঘোষের ভূমিকা কী ছিল। জনা-দুই ব্যক্তির প্রবল চেষ্টায় ভারত সরকারের আইসিসিআর মুম্বই শহরে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, কিন্তু দিল্লিতে কোনও অনুষ্ঠান হয়েছে বলে আমি অন্তত শুনিনি। অথচ পঞ্চাশের দশকের এক অদ্ভুত তথ্য ও বেতারমন্ত্রী বি ভি কেশকারের চেষ্টায় ও অনুরোধে পান্নালাল ঘোষ জাতীয় বাদ্যবৃন্দের কম্পোজার ও পরিচালকের পদ নিয়েছিলেন, হয়েছিলেন আকাশবাণী দিল্লির প্রযোজকও। অত বড় শিল্পী হয়েও মুম্বই ছবি-ইন্ডাস্ট্রির নানান ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেও শুনেছি পান্নালাল ঘোষের তখন আর্থিক অনটন। একটি লেখায় পড়েছিলাম, কেশকার সাহেব যখন পান্নালালের বাড়িতে যান, বাঁশির ঈশ্বর তাঁকে নাকি তখন চা-ও খাওয়াতে পারেননি। এক শিল্পীকে জাতীয় কার্যক্রমে টেনে আনতে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সটান তাঁর বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। এমন দিনও তা হলে ছিল।
কেশকার মহোদয়কে ‘অদ্ভুত’ তথ্য-বেতারমন্ত্রী বললাম, কারণ এই মানুষটির মাথা থেকে বেরিয়েছিল যে, ‘ফিল্মি গানা’র আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য আকাশবাণীর খরচে নানান ভাষায় আধুনিক গানও তৈরি করা দরকার। এই লক্ষ্যে তিনি প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে রাষ্ট্রের খরচে আধুনিক গান তৈরির বিভাগ খোলেন। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে তার নাম দেওয়া হয় রম্যগীতি। যত দূর জানি, কলকাতার রম্যগীতি বিভাগেই আচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ প্রযোজকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

পঞ্চাশের দশকে আকাশবাণী কলকাতার রম্যগীতি বিভাগটি হয়ে ওঠে অসামান্য সুরসমৃদ্ধ বেশ কিছু আধুনিক বাংলা গানের আঁতুড়ঘর। এই রম্যগীতিতেই রেকর্ড করা হয়েছিল পান্নালাল ঘোষের ভাই নিখিল ঘোষের সুরে কিছু চমকপ্রদ আধুনিক বাংলা গান। ঠিক করেছি সত্যিকার বরণীয় শিল্পীদের নামের আগে আর ওস্তাদ বা পণ্ডিত লিখব না। কারণ, কোনও রকমে একটু সাঁইয়ামাইয়াতেরেকেটে করতে পারলেই আজকাল যে-কেউ দেখছি পণ্ডিত বা ওস্তাদ। রফিক আজাদ এক সময়ে একটি কবিতায় লিখেছিলেন: ‘আজকাল সব শালাই কবিতা লেখে’। ৬৩ পেরিয়ে, বিস্তর দেখেশুনেবুঝে আমি বলছি— আজকাল সব ব্রাদার-ইন-ল’ই পণ্ডিত-ওস্তাদ।

নিখিল ঘোষ ছিলেন তবলাশিল্পী। জ্ঞানপ্রকাশের ছাত্র। রম্যগীতি অনুষ্ঠানে নিখিল ঘোষের সুরে ‘গুনগুনগুন অলি গায়’, ‘ছন্দে ছন্দে’, ‘নদী বয়ে যায় রে’ আর ‘কে ভুলালে বারে বারে’ শুনে আমার ছেলেবেলা থেকেই মনে হয়েছিল যে, এই সব গানের সুরকার অন্যান্যদের থেকে আলাদা। বললে অনেকে রেগে যাবেন: মার্গসংগীতের প্রথিতযশা শিল্পীরা যখন আধুনিক গানে সুর করেছেন, তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ফল দাঁড়াল মোটের ওপর মামুলি। নিখিল ঘোষ ব্যতিক্রম। নিজে ধ্রুপদী ঘরানার মানুষ হয়েও আধুনিক গানের সুর করতে গিয়ে তিনি রাগানুগত্য দেখাননি, ঢের বেশি প্রয়োগ করেছিলেন আধুনিক সংগীতের ইডিয়ম।

অনেক পরে একাধিক ফোটোগ্রাফে দেখেছি পান্নালালের সঙ্গে নিখিল তবলা সঙ্গত করছেন। ৩২ ইঞ্চি লম্বা পেল্লায় বাঁশিটা আড়াআড়ি ধরে বাজাচ্ছেন পান্নালাল। সেই কোন কালে বরিশালের এক নদীতে ভেসে যাওয়া ছোট একটি বাঁশি তুলে নিয়ে যে ছেলেটি মকসো করেছিলেন, যাঁর হাতে সেই বাঁশিটি দেখে এক সাধু বলেছিলেন, এই ছেলে এক দিন মস্ত বাঁশিশিল্পী হবে, কলকাতায় পালিয়ে আসার পর সেই ছেলে খিদিরপুরের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে বাঁশি তৈরি করতে শুরু করেন। আগেকার বাঁশিতে দু’একটি স্বর বাজানো ছিল মুশকিল। সপ্তম ছিদ্রটি উদ্ভাবন করে পান্নালাল সেই সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। এই মানুষটিরই উদ্ভাবন-প্রতিভার আরও দুই পরিণাম: ছ’তারের তানপুরা আর সুরপেটি। সুরপেটি হল ছোট একটি যন্ত্র, যা হারমোনিয়মের মতো বেলোর হাওয়ায় সমানে সুর বা ষড়জটি দিয়ে যায়। কতকটা ব্যাগপাইপ ও সানাইয়ের পোঁ ধরার মতো। আমীর খান সাহেবকে আমরা ষাটের দশক থেকেই ছ’তারের তানপুরা ব্যবহার করতে দেখেছি। আর সুরপেটি ব্যবহার করেন সানাই-দলগুলি সবচেয়ে বেশি।
সংগীতাচার্য আলাউদ্দিন খান সাহেবের কাছেও পান্নালাল ঘোষ দীর্ঘ তালিম নেন এবং তাঁরই উৎসাহে সৃষ্টি করেন নানান রাগ, যেমন— নূপুরধ্বনি, চন্দ্রমৌলি, দীপাবলি, কুমারী। ফৈয়াজ খান সাহেব ও ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের মতো কণ্ঠশিল্পীদের অনুরোধে পান্নালাল তাঁদের খেয়ালের সঙ্গে বাঁশিতে সঙ্গত করেছেন, সঙ্গত করেছেন তারাপদ চক্রবর্তীর সঙ্গেও। আমার বাবার কাছে শোনা: চল্লিশের দশকে বাবা রবীন্দ্রনাথের ‘সে কি ভাবে গোপন রবে’ গানটি রেকর্ড করছেন। গায়ক তখন নেহাতই যুবক, এমন কোনও কেউকেটাও নন। হঠাৎ রেকর্ডিস্ট এসে জানালেন, পান্নালাল ঘোষ স্টুডিয়োয় এসেছেন এবং গানের ‘মনিটর’ শুনেছেন। এ বারে তিনি ধরে বসেছেন এই যুবকের গানের সঙ্গে বাঁশি বাজিয়ে দেবেন। খোদ গায়ক ও যন্ত্রীরা কেউ বিশ্বাসই করতে চাননি প্রথমে। বলা নেই কওয়া নেই বাঁশির ঈশ্বর এক উঠতি গায়কের সঙ্গে বাঁশি বাজিয়ে দেবেন গ্রামোফোন রেকর্ডিং-এ? তাও আবার ক্লাসিকাল নয়, পল্লিসুর-ভাঙা একটি আধুনিক গানে? কিন্তু নাছোড়বান্দা পান্নালাল বাঁশি বাজিয়ে তবে ছেড়েছিলেন। ছেলেবেলায় সেই গ্রামোফোন রেকর্ড দেখেছিলাম। তাতে অন্য কোনও যন্ত্রীর নাম ছাপা হয়নি। ছাপা হয়েছিল শুধু: বাঁশিতে পান্নালাল ঘোষ। ব্র্যাকেটে ‘নাছোড়বান্দা’ কথাটা লিখে দিলে বেশ হত।

ইতিহাসবিস্মৃত, কৃতঘ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লি বাঁশের বাঁশির ঈশ্বরকে ভুলে তবে ছাড়ল। আমরাও কম নাছোড়বান্দা নই।— ‘আঃ, বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress