সুমনামি ০২

তাঁর কথা ভাবলে নানান ছবি মনে পড়ে। ১৯৭০।

আকাশবাণীর একটি স্টুডিয়োয় রম্যগীতির গান রেকর্ডিং হচ্ছে। অনেক যন্ত্রী। তাঁদের মধ্যে কাউকে কাউকে মনে আছে। তবলায় শ্যামল বসু। সানাইয়ে ওস্তাদ আলি আহমেদ হুসেন। পিয়ানোয় অলোকনাথ দে। অনেক কালের পুরনো পিয়ানো। কী রাজকীয়। যেমন আওয়াজ, তেমনই চেহারা। আরও কত যন্ত্র। ক্ল্যারিনেট, কয়েকটি বেহালা, মন্দ্রবাহার, সেতার, নানান পারকাশন যন্ত্র। নির্মলা মিশ্র গাইছেন। আজও মনে আছে সেই গানের শুরুটা: ‘বসন্ত কি এমনি করেই জাগে’। মাঁজ খামাজ রাগের আভাস। ছ’মাত্রার তাল। কিন্তু ছন্দটা আমাদের দাদরার মতো নয়, ওয়াল্ট্স-এর মতো। সবার সামনে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে নেচে নেচে সঙ্গীত পরিচালনা করছেন তিনি, যাঁর কথা ভাবলেই নানান ছবি ভেসে ওঠে। আমার বয়স তখন একুশ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনও রকমে বি এ পরীক্ষাটা পাশ করে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার রণে ভঙ্গ দিয়ে তখন আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করছি ইংলিশ টক্স বিভাগে, ক্যাজুয়াল কন্ট্রাক্টে। নির্মলা মিশ্র রেকর্ড করবেন শুনে স্টুডিয়োয় ঢুকে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছি চুপটি করে। মনে আছে, গানের আগে ‘প্রিলিউড’ অংশে পিয়ানো দিয়ে শুরু, সেখান থেকে সানাই। কায়দাবাজ বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা ঈর্ষার মতো একটা খুনে আকুতি সানাইটা জানানোর পরেই নির্মলা মিশ্র গানটি ধরেছেন। গাইছেনও স্বপ্নের মতো। দীর্ঘ কাল যে প্রত্যয় নিয়ে বেঁচে আছি সেটি নিয়েই মরব আর কিছু বছর পরে: এ দুনিয়ায় অনেক বিস্ময়কর ব্যাপারই আবার ঘটতে পারে, কিন্তু আর একজন নির্মলা মিশ্র আর কোনও দিন জন্মাবেন না। বিভোর হয়ে শুনছি আর নৃত্যরত সঙ্গীত পরিচালককে দেখছি। ওই মুহূর্তে তিনি কি স্টুডিয়োয়, না কি অন্য কোথাও, যেখানে আমি অন্তত কোনও দিন পৌঁছতে পারব না।

একুশ থেকে চলে যাচ্ছি আমার বছর ছয়েক বয়সে। এক বিকেল-ঘেঁষা দুপুরে বাড়ির পুরনো রেডিয়োর সামনে হিজ মাস্টার্স ভয়েসের কুকুরটার মতো বসে আছি আর রম্যগীতি শুনছি। কথা: সুকুমার রায়। যাঁর সুর, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে তিনিও গাইছেন। কী আশ্চর্য গান রে বাবা! ‘সিংহাসনে বসল রাজা বাজল কাঁসর ঘণ্টা’।

আট মাত্রার তালে দ্রুত লয়ে। জায়গায় জায়গায় তাল পাল্টাচ্ছে। আট থেকে ছয়। কত রকমের তালযন্ত্রের আওয়াজ! পরে জেনেছি, কোনওটা ঢোলক, কোনওটা খোল, বাংলা ঢোল, কাঁসি, কাঁসর। ক্যাঁওক্যাঁওক্যাঁও ক্যাঁক্যাঁওক্যাঁক্যাঁও করে কী একটা বাজছে তালে তালে, ভারী মজার আওয়াজ, যেন এক পাশ থেকে কেউ ফাজলামি করছে। একদম শেষে ‘বাপ্রে কী তেজ বুড়োর হাড়ে/পায় না সে যে অক্কা’-র পুনরাবৃত্তি কোরাসে এবং একক কণ্ঠেও। শুনেই বোঝা যাচ্ছে পালটে নেওয়া গলা। পুরুষের গলা। যাঁর গলা, তাঁর কথা ভাবলে আজ কত কথাই না মনে পড়ে। যেমন মনে পড়ে শেষ লাইনের সঙ্গে ডবল দাদরায় ক্যাঁওক্যাঁওক্যাঁও ক্যাঁক্যাঁওক্যাঁক্যাঁও। সুকুমার রায়ের আরও দু’টি কবিতায় তাঁর সুর। ‘রোদে রাঙা ইটের পাঁজা’, ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’।

দু’টি গানই একক কণ্ঠ ও কোরাস মিশিয়ে। গ্রামোফোনের চোঙা-ভজা কুকুরটা, যাকে দেখতে আমার মতো, বুড়ো হচ্ছে রোজ আরও, আরও। তা-ও তার মনে আছে, প্রথম গানটিতে আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। কী আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। ‘মন বলছে আজ সন্ধ্যায় কিছু বলতে তুমি আসবে কি’ বা ‘যদি তোমার জীবনে সাথী হয়ে কেউ মোর মতো মালা পরাত’-র মতো রোমান্টিক প্রেমের গানেও যেমন, ‘হাট্টিমাটিমটিম’-এর মতো ছড়ার গানেও তেমন, তেমনই আবার সুকুমার রায়ের পদ্যনির্ভর এক বিচিত্র গানেও। একই গায়িকার কত রকমেরই না গায়কী। বড় অভিনেতারা যেমন বিভিন্ন, বিচিত্র ভূমিকায় একই মানের নৈপুণ্য দেখান, আলপনাও ছিলেন তেমনই গানের ক্ষেত্রে।

সুকুমার রায়ের তিনটি পদ্যে যে সুর-তাল-ছন্দ, তার কথা ভাবলে মনে হয় সুরগুলোও সুকুমার রায়েরই এমনই জুতসই। দীর্ঘ কাল ধরে নানান সুরকারের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আধুনিক বাংলা গান সুরের যে ইডিয়মগুলিতে সমৃদ্ধ হয়েছে, সেগুলি প্রাণবন্ত এই তিনটি গানে। সেই সঙ্গে এক অদ্ভুত খামখেয়ালিপনা। ‘এই দ্যাখো না চাঁদনি রাতের গান এনেছি কেড়ে’-র মতো একটি বাক্যকে যে ভাবে সুরে ধরা হয়েছে, প্রশিক্ষিত মন বুঝে নেবে সুরকার ‘হাল্কা মেঘের পানসে ছায়াও’ চেটে দেখেছেন।

সঙ্গীত, সঙ্গীতের আধুনিকতা নিয়ে আমরা যদি সত্যিই চিন্তিত হতাম তো শুধু এই তিনটি গানের সুর-তাল-ছন্দ ও গায়কী নিয়ে গবেষণা হত। আমার মতো দেখতে চোঙাভজা কুকুরটা ভেবে ভেবে অবাক হয় যে সুরকারের এমন অতুলনীয় সৃষ্টি নিয়ে কোনও দিন একটি কথাও হয়নি। তাঁর কথা ভাবলে বেশির ভাগ মানুষের মনে পড়বে এক দিকে তবলার এক কুলগুরু আর অন্য দিকে ধ্রুপদী কণ্ঠসঙ্গীতের এক নিজস্ব ঘরানার প্রবর্তকের কথা: সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ।

তবলায় তাঁর কাছে তালিম নিয়েছিলেন নিখিল ঘোষ, কানাই দত্ত, শ্যামল বসু, শঙ্কর ঘোষ। কণ্ঠসঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়, এ কানন, অজয় চক্রবর্তী, অরুণ ভাদুড়ি। সবার নাম আমি জানি না। শুনেছি, দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ও গান শিখেছিলেন তাঁর কাছে।

এমন সব নামজাদা শিল্পীর গুরু ভাবলেই যে ছবিটি ভেসে ওঠে চোখের সামনে, আমার মনে কিন্তু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সেই ছবিটি নেই। উপমহাদেশের সঙ্গীতে যদি এক জন জিনিয়াসও জন্মে থাকেন তিনি জ্ঞানপ্রকাশ। অল্প বয়সে নানান খেলা নিয়েই মেতে ছিলেন। ফুটবল খেলতে গিয়ে একটি চোখ যায়। তাই খেলা ছেড়ে সঙ্গীতে। একই সঙ্গে তবলা ও কণ্ঠসঙ্গীতে প্রথামাফিক তালিম। চোস্ত হাওয়াইয়ান গিটারে। আর হারমোনিয়ামে তো কথাই নেই। একাধিকবার ওস্তাদ আমীর খানের খেয়ালের সঙ্গে তাঁর হারমোনিয়াম শুনেছি। তেমনই শুনেছি পিয়ানোয় আচার্য ভি বালসারার সঙ্গে তাঁর হারমোনিয়াম: এক দিকে পুরোদস্তুর রাগসঙ্গীত, অন্য দিকে বাংলার পল্লিসুর। একক হারমোনিয়াম তো অবিশ্বাস্য।

কণ্ঠসঙ্গীতের বিস্ময়-শিল্পী দিলীপকুমার রায়ের ‘সেই বৃন্দাবনের লীলা-অভিরাম’-এর সঙ্গে তিনি তানপুরার তারে তবলা-বাঁধার হাতুড়ি ঘষে ঘষে কতকটা হাওয়াইয়ান গিটার ও কতকটা বীণার মতো একটা আওয়াজ বের করে এনে বাজিয়েছিলেন। ছেলেবেলায় শুনেছিলাম রেকর্ডটা। এক বার তাঁকে স্প্যানিশ গিটার বাজাতেও দেখেছিলাম। ১৯৬৬-তে আমি আকাশবাণী সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভজন ও রাগপ্রধান বাংলা গানে নির্বাচিত হয়েছিলাম দিল্লিতে লড়ার জন্য। দিল্লির জন্য সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ আমায় তাঁরই সুরে গুরু নানকের একটি ভজন শিখিয়ে দেন। প্রথম দিন তিনি আমায় শিখিয়েছিলেন টেলিফোনে এত ব্যস্ত ছিলেন। তার পর তিনি আমায় আকাশবাণী ভবনে যেতে বলেন। সেখানে একটি স্টুডিয়োয় বসে একটু স্প্যানিশ গিটার বাজিয়ে বাজিয়ে গানটি ভাল করে শিখিয়ে দেন।
এই মানুষটিকে আরও ছেলেবেলায় শুনেছিলাম বেতারে পরশুরামের ‘ভূশণ্ডীর মাঠ’-এর কিছু ‘গান’ মুখে বলে বলে তার পর তবলায় বাজাতে। ইনি আধুনিক বাংলা গানে সুর যদি না দিতেন, আমি অন্তত শিখতে ও জানতে পারতাম না সুর কী ভাবে দিতে হয়।

তাঁর জন্মশতবর্ষ কি এই বছরে? বাইরে দু’রকম কথা শুনতে পাচ্ছি, আর মাথার খুব গভীরে শুনছি ‘এই দেখো না চাঁদনি রাতের গান এনেছি কেড়ে/দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম/দেড়ে দেড়ে দেড়ে’ মিশে যাচ্ছে তাঁর বাজানো তবলার বোলে: ‘গিন্নি ঘা দেন কর্তাকে’ সেটা আবার মিশে যাচ্ছে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া তাঁর সুরে তারাশঙ্করের লেখা গানে: ‘আমার প্রাণের রাধার কোন ঠিকানা’
আমার জীবনে দেখা একমাত্র জিনিয়াসের ঠিকানা আমার স্মৃতি।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress