সুকুমার রায় স্মরণে

আজ সুকুমার রায়ের জন্মদিন। আমার প্রফেট সুকুমার রায়। উনি না থাকলে, ওঁর লেখা না পড়লে একটি গানের একটি লাইনও লিখতে পারতাম না, ভাবতেই পারতাম না। “তোর গানে পেঁচি রে/ সব ভুলে গেছি রে” – এমন প্রেমের উক্তি পৃথিবীর কোনও কবি করতে পারেননি। “চট্‌ করে মনে পড়ে মট্‌কার কাছে/ আধখানা মালপোয়া কাল থেকে আছে” – এমন ছুটন্ত, জীবন্ত, অনন্ত বাংলা এই জাতির কোনও কবি লিখতে পারেননি। আমার গানের একটি লাইনও যদি কারুর ভালো লেগে থাকে তো তিনি জানবেন তার মূলে আছেন, থাকবেন সুকুমার রায়। এমনকি আমার সুরেও আছেন তিনি। এটা আমি বোঝাতে পারব না। আমার সুর একটা আলাদা মেজাজ থেকে এসেছে, আসে। সেই মেজাজটা আমায় দিয়েছেন সুকুমার রায়। সেই কোন্‌ ছোট্টবেলা থেকে আমার ‘সুকুমার হয়ে আছে’, হয়ে ব’সে আছে। – আজ, এই মুহূর্তে, আমার মনে পড়ছে সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কথা। আকাশবাণী কলকাতার রম্যগীতি ইউনিটে তিনি সুকুমারের অন্তত তিনটি রচনায় সুর দিয়ে গান বানিয়েছিলেন, তার রেকর্ডিং-এ নিজে কন্ঠও দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আর-এক দিকপাল অজিত চ্যাটার্জি (কী হ্যাণ্ডসাম পুরুষ রে বাবা – পরিমল গোস্বামীর তোলা ছবিতে দেখা যায়) এবং আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়। “অন্তত তিনটি” বললাম কারণ হয়তো আরও রেকর্ডিং হয়েছিল যা আমি শুনিনি, শোনার সুযোগ পাইনি। তবলা ও কন্ঠসঙ্গীতের কুলগুরু হয়েও সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ভাবতে পেরেছিলেন, করতে পেরেছিলেন এই ধরণের একটা কাজ। “গন্ধবিচার”, “ছুটছে মটর ঘটর ঘটর” আর “রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজা”।

তিনটি গানই আমি পাঁচের দশকে, আমার ছোটবেলায় শুনেছিলাম। মাথার ভেতরে গাঁথা হয়ে গিয়েছে। ঐ ধরণের গানের প্রযোজনার আঙ্গিক যে কেমন হতে পারে তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ। আমাদের দেশের সংগীতের অভিভাবকরা ওই গানগুলিকে সকলের সামনে নিয়ে আসার কোনও প্রয়োজন বোধ করেননি। তা নিয়ে আমি ছাড়া কোনোদিন কোনও কথা বলেছেন কি কেউ? কী সংগীত কী সাহিত্য – কোনও ক্ষেত্রের কোনও মহান বা অমহান ব্যক্তিই ঐ সৃষ্টিগুলি সম্পর্কে কিছু বলেননি। ক’জন শুনেছেন? মনে রেখেছেন? – বাংলা ভাষার স্রেষ্ঠ কারিগর ও কবি-নাট্যকার-গল্পকারের জন্মদিন আজ। আমি নিতান্তই ভাগ্যবান তাই তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি। আমি নিতান্তই ভাগ্যবান তাই “আমাকে ভাবায় সুকুমার রায়”-এর মতো গান বাঁধতে পেরেছি। আমি মনে করি এটা আমার শ্রেষ্ঠ গান। কেন বলছি তা বাঙালি জাতিকে বোঝানোর জন্য আর-একটা “কবীর সুমন” দরকার। আর-একটা কবীর সুমন থাকলে সে বলে যেত এই কবীর সুমনটা কী করে গেল। আর-একটা কবীর সুমন থাকলে সে হয়তো বোঝাতে পারত এই কবীর সুমনটা সুকুমার রায়কে কেন “প্রফেট” বলছে।

৩০শে অক্টোবর, ২০১৩

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress