খোলা চিঠি

সাবিনা ইয়াসমিনকে কবীর সুমন এর লেখা একটি চিঠি

(১৯৯৬ সালে কবীর সুমন প্রথম এসেছিলেন। সে সময়ে ওনাকে আমন্ত্রন করা হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নির্মানের তহবিল সংগ্রহের জন্য ফ্রি কনসার্ট করতে। উনি তা করেছিলেন। উনি ১৯৯৮ সালে আবার এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মানের তহবিল সংগ্রহের জন্য। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি মাসিক পত্রিকায় নাট্য ব্যক্তিত্ব য় জনাব আলী জাকের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর/ দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের স্মৃতিচিহ্ন শীর্ষক একটি নিবন্ধ লেখেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই নিবন্ধে কোথাও উল্লেখ নেই কবীর সুমনের নাম। এতে উনি বিস্মিত হয়ে যান এবং একটি চিঠি লেখেন ওনার স্ত্রী শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন কে।
স্মৃতিচারণের প্রতিক্রিয়ায় কবীর সুমনের লেখা সেই চিঠি টি হুবহু তুলে দেওয়া হলো)

সাবিনা,২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে রুটস পত্রিকায় প্রকাশিত জনাব আলী যাকেরের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর/ দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের স্মৃতিচিহ্ন’ শীর্ষক নিবন্ধটি পড়লাম। বাংলাদেশের এক তরুণ নাগরিক মুদ্রিত লেখাটি স্ক্যান করে আমায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমি ভারতের নাগরিক। জন্মসূত্রে বাঙালি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমার মতো এক ভারতীয়র কাছেও ইতিহাসের এক গরিমাময় মাইলস্টোন। লাইটহাউস বললেও অত্যুক্তি হয় না। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তরফে আমায় বাংলাদেশে গিয়ে সঙ্গীত-অনুষ্ঠান করে ওই জাদুঘরের তহবিলে টাকা তোলার উদ্যোগে সহায়তা করার জন্য আহ্বান করা হয়। আমি সানন্দে রাজি হয়ে যাই। আমায় বলা হয় মোট পাঁচটি অনুষ্ঠান করতে হবে। আমার মনে হয়েছিল আমার জন্য এ এক বিরাট সম্মান। বাংলাদেশকে তার জন্মলগ্ন থেকে ভালবেসেছি, কিন্তু বাংলাদেশে যাওয়ার কোনো সুযোগ পাইনি। অনুষ্ঠান করার সুবাদে বাংলাদেশে যাওয়াও হয়ে যাবে।

আমি পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী। গুরুদের আশীর্বাদে আমার কিঞ্চিৎ হলেও নামডাক আছে শিল্পী হিসেবে। তখন আরও বেশি ছিল। কারণ আমার স্বরচিত গানের প্রথম অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। তার মাত্র চার বছরের মাথায় আমি বাংলাদেশে গানের অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছি। তার মধ্যে আমার আরও কয়েকটি অ্যালবাম বেরিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষই উদগ্রীব আমার অনুষ্ঠানে হাজির থাকতে। তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে যে আমার মতো পেশাদার শিল্পীরা নাম করার আগে তেমন টাকা পান না। নাম করার পরে তাঁদের একটা ‘বাজার’ তৈরি হয়, তখন তাঁরা টাকা পান। একদিন তাঁরা পুরোনো হয়ে যান, তখন আর তাঁদের কদর থাকে না।

১৯৯৬ সালে আমার অনুষ্ঠানের পারিশ্রমিক এমনিতে বেশ ভালোই ছিল। আমি কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্য অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছি বলে আক্ষরিক অর্থে তার একটি ভগ্নাংশেই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল বাঙালি হিসেবে আমি আমার কর্তব্য পালন করতে যাচ্ছি। ১৯৯৬ সালের ওই সফরে আমি সাত দিনের মধ্যে পাঁচটি একক অনুষ্ঠান করেছিলাম। অত অল্প সময়ে পাঁচটি অনুষ্ঠান করতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। আমার তখন ৪৭ বছর বয়স। আমি কিন্তু কোনো কষ্টই গায়ে মাখিনি। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানেই আমি কম করে হলেও আড়াই থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা গান গেয়েছিলাম। ১৯৯৮ সালে আমি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্য তহবিল তুলতে বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার সঙ্গীত সফর করি। সেবারে আমি শুধু ঢাকাতেই অনুষ্ঠান করেছিলাম। যতোদূর মনে পড়ে চারটি একক অনুষ্ঠান করেছিলাম আমি। তার মধ্যে শেরাটন হোটেলের উইন্টার গার্ডেনের অনুষ্ঠানে তোমার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। দিনটি ছিল সাতই ফেব্রুয়ারি। প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আমি আড়াই ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা পরিশ্রম করেছিলাম।
আমি সম্ভবত উপমহাদেশের একমাত্র নাগরিক শিল্পী যে সম্পূর্ণ একা অনুষ্ঠান করে থাকে, আজও এই বয়সেও। কোনো যন্ত্রশিল্পী সংগত করেন না। গাওয়া ও বাজানো- দুটি কাজই নিজে করে থাকি বলে পরিশ্রমটাও সেইমতোই হয়। ওই সফরেও আমি ঠিক ১৯৯৬ সালের অংকেই এক ধরনের পারিশ্রমিক নিয়েছিলাম, যা এমনিতে একটি অনুষ্ঠান করতে যে টাকা আমি নিয়ে থাকি তার একটি ভগ্নাংশের বেশি নয়। আবার বলছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তহবিলের জন্য গানের অনুষ্ঠান করে টাকা তুলছে পারছি-এটাই ছিল আমার কাছে আসল কথা। সামান্য কিছু টাকা নিতেই হয়, কারণ সফরের দিনগুলোয় আমি স্বদেশে কোনো অনুষ্ঠান করতে পারছি না, পেশাগত অন্য কোনো কাজও করতে পারছি না। তাছাড়া, আমার সে-সময়কার সেক্রেটারি ও অনুষ্ঠান সহকারীও দুটি সফরেই আমার সঙ্গে ছিলেন। তাঁকে অন্তত পারিশ্রমিক দেওয়ার দায় আমার বিলক্ষণ ছিল।

বাংলাদেশের বন্যা বা তুফান-দুর্গতদের জন্য ত্রাণ-উদ্যোগের টাকা তুলতে আমি যতবার একা বাংলাদেশে বা, এমনকি, অস্ট্রেলিয়ায় গানের অনুষ্ঠান করতে গিয়েছি, কোনো টাকাই নিইনি। সিডর-দুর্গতদের জন্য টাকা তুলতে গান গাইতে গিয়েছিলাম গত বছর বাংলাদেশে। একটি পয়সাও নিইনি। আমি ভারতের মানুষ। তথাপি বাংলাদেশের কোনো কাজে লাগতে পারলে বরাবর ভালো লেগেছে। সে সময়ে আমার নাম ছিল সুমন চট্টোপাধ্যায়। আজ আমার নাম কবীর সুমন। ভারতের আইন মোতাবেকই আমি আমার নাম পরিবর্তন করেছি।

আলী যাকের মহোদয় তাঁর নিবন্ধে একটি বারও আমার অবদানের কথা উল্লেখ করেননি। আমার মতো অতি নগণ্য এক সঙ্গীত শিল্পীর সামান্য অবদানের কথা তাঁর মতো বড় মাপের ও ব্যস্ত মানুষের ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া, আমার চেয়ে আরও কতো বড় মানুষ ও শিল্পী হয়তো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তহবিলের জন্য অনুষ্ঠান করেছেন। আলী যাকের মহোদয় বিরাট মাপের মানুষ। কতো বড় বড় ব্যক্তিত্ব তাঁর চেনা। আমি সেখানে নিতান্তই তুচ্ছ। আমাকে মনে রাখার কোনো দায় তাঁর মতো বড় মানুষের থাকতে যাবে কোন দুঃখে। কিন্তু মুশকিল হলো, বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের বাঙালিরা আছেন, যাঁদের কাউকে কাউকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাঁদেরই একজন জনাব আলী যাকেরের নিবন্ধটি পড়ে বিস্মিত হয়ে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তহবিলের জন্য আমি বাংলাদেশে দুটি সঙ্গীত সফর করেছিলাম বলে লোকমুখে তিনি যা শুনেছেন তা সত্যি কিনা। সে সময়ে এই যুবক নেহাতই শিশু ছিলেন। আমার মনে হলো- তাঁর প্রজন্মের বাঙালিদের অবগতির জন্য অন্তত এই লেখাটি একটি চিঠির আকারে তোমায় পাঠানো দরকার।

বের্টোলট ব্রেশট এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘সত্য বিভিন্ন ভাবে বলা যায় এবং বিভিন্ন ভাবে চেপে দেওয়া যায়।’ এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু আমার মনে হচ্ছে না। জনাব আলী যাকের এক শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা, শিল্পপ্রেমী ও দেশপ্রেমী মানুষ। তিনি দীর্ঘজীবী হোন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাস অক্ষয়, অমর। ভারতের এক প্রৌঢ় নাগরিক হিসেবে আমি চাইবো- বাংলাদেশের সঙ্গে আমার দেশের মৈত্রীও হোক অক্ষয়। আমার এই চিঠিটি ওই পত্রিকায় প্রকাশ করতে পারলে ভালো হয়। তুমি যদি সেই ব্যবস্থা করতে পারো তো আমি কৃতজ্ঞ থাকবো।


তথ্যসূত্রঃ ‘মৌচাকে ঢিল’ পত্রিকা

তৎকালীন সম্পাদকঃ শফিক রেহমান

তোমাকে লিখছি : প্রজাতন্ত্র দিবস পেরিয়ে সংবিধান নিয়ে একটি খোলা চিঠি

পুড়ল আদিকন্দ দলুই
পুড়ছে আমার সংবিধান
পুড়তে পুড়তে হয়তো আগুন
লিখবে নিজেই একটা গান।

বন্ধু,
গান চেয়েছ। ওই চার লাইন দিয়ে শুরু করলাম। এই কথাগুলোই যে গোড়ায় থাকবে তার মানে নেই। লিখতে লিখতে হয়তো দেখব ওগুলো পরে কোথাও চলে যাচ্ছে। কোন খেয়ালে যে তুমি আমায় এমন এক বরাত দিলে তুমিই জানো। আমি কিন্তু জানি না, কোন আক্কেলে আমি রাজি হয়ে গেলাম। সংবিধানবিশারদ বা আইনজ্ঞ নই আমি। এ দেশের নাগরিক, পেশায় সংগীতকার এবং এক ধরনের সাংবাদিক, নিবন্ধকার। আমার পাসপোর্টে অবশ্য অামার নাম কবীর সুমনের তলায় নির্দিষ্ট একটি জায়গায় আমার পেশা ‘সংগীতকার’ই লেখা আছে। এই দেখ, পাসপোর্ট। এক স্বাধীন, সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে আমার পরিচিতি দলিল, যার পাতায় পাতায় অন্যান্য দেশের ভিসার ছাপ পড়ে, যদি সেই ভিসা আমি আবেদন করে পেয়ে যাই।

যে দিন থেকে আমাদের দেশের সংবিধান কার্যকর হয়েছিল (আমার বয়স তখন দশ মাস, আর তুমি তখনও আসোনি) সেই দিনটি যথারীতি পালন করা হল। সারা পৃথিবীতেই তো প্রতি বছর নানান ‘দিবস’ উদযাপন করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও। এ বারে, প্রজাতন্ত্র দিবস, মানে যে দিন ভারত এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল স্বাধীনতা লাভের পর তার প্রথম সংবিধান, সেই দিনটির অল্প কাল আগে তুমি বায়না ধরলে— এত কিছু নিয়ে গান লিখেছ, আজ আমাদের সংবিধান নিয়ে একটা গান লেখো। তুমিও জানো, আমিও জানি সংবিধানের সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা-সমৃদ্ধ কোনও গান লিখতে তুমি আমায় বলোনি। এই সময়ে, এই বয়সে, এই অবস্থায় আমাদের সংবিধান আমায় কী বলছে, তার পটভূমিতে আমি কী দেখছি, কী বুঝছি, তা নিয়েই লিখতে বলেছ তুমি আমায়। পেশাদার গান লিখিয়ে-সুর করিয়ে এই আমি নিজের কথা জানিয়ে দেওয়ার জন্য যেমন গান লিখেছি, আজও লিখি, তেমনই অপরের বরাত অনুসারেও লিখেছি, সুর করেছি কম নয়। ওখানেই পেশাদিরিত্বের জায়গাটা। ছায়াছবির বিশেষ একটি দৃশ্যের জন্য, হয়তো নায়ক বা নায়িকার জন্য গান বাঁধার সময় নিজেকে রেখেছি সেই চরিত্রগুলির জায়গায়। পার্শ্বচরিত্রের বেলাতেও তাই। সিরিয়াল বা টেলিফিল্‌মের টাইটেল সং-এ ধরতে হয়েছে গল্পটার মেজাজ। আবার, ধরো, এক নামজাদা বিস্কুট কোম্পানির জন্যেও দু’লাইনের গান বাঁধতে হয়েছিল। রুশ সঙ্গীতকার চাইকভ্‌স্কি এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘এক জন মুচি যেমন প্রতি দিন নানান পায়ের মাপে জুতো বানান, আমি সেই ভাবে সংগীত রচনা করি।’ সত্যিকার পেশাদার লোক এমনই হয়। আমাদের দেশের অনেক সৌখিন, মেঘলোকবাসী, শুচিবায়ুগ্রস্ত ‘শিল্পী’ অবশ্য ভীষণ দুঃখ পান এমনধারা কথা শুনলে।

স্কুট কোম্পানি ভাল টাকা দিয়েছিল। সেই অায়ের ওপর কর দিতে হয়েছিল। সেটা আমাদের রাষ্ট্রের আয়। এই দেখো, রাষ্ট্র, যার সংবিধান কার্যকর হতে পেরেছিল এখন থেকে ছাপান্ন বছর আগে। সেই সংবিধান নিয়ে আমার যা ভাবনা, বন্ধু, তুমি আমায় তারই ওপর গান বাঁধার বরাত দিয়েছ, যদিও এর মূল্য তুমি দেবে না। সঙ্কোচের কোনও কারণ নেই। গান-কারিগর হিসেবে এ দেশে বেঁচেবর্তে থাকতে গেলে বিনি পয়সায় এমন কাজ করতেই হয়। নতুন বাঁধা গানের ব্যাপারী যাঁরা নন, তাঁদেরও কখনও কখনও বিনা পয়সার পেশাদার হিসেবে কাজ করে দিতে হয়। গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র ও বান্ধবতন্ত্রের এমনই লীলা। না, না, সংবিধানে এ সব লেখা নেই। আছে রংবিধানে। রঙে রং মেলানোর খেলা আছে না? তাসের একটা সহজ-সরল খেলা যেমন? রাজনৈতিক সমাজজীবন বা সামাজিক রাজনৈতিক জীবনেও তেমনই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি গানে লিখতে পেরেছিলেন— ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে।’ সে ছিল বসন্তের সর্বজনীন আনন্দের গান। গণতন্ত্রে কি আর ‘সবার রঙ’ বলে কিছু থাকতে পারে? এক এক পক্ষের, দলের এক এক রং। আমার কবিগুরু সুকুমারের জবান একটু বদলে দিয়ে বলা যায়: রঙের আমি রঙের তুমি রঙ দিয়ে যায় চেনা। রঙে রঙে রঙাক্কার, রঙে রঙে ঠোকাঠুকি, ধাক্কাধাক্কি, রঙের ওপর রঙের টেক্কা, পাঁচ বছর ধরে এ রঙের শাসন বা ‘রংবাজি’ এবং অন্য রংগুলির আপত্তি বা পাল্টা রংবাজি, পাঁচ বছর পর আবার রঙে রঙে লড়াই, গ্রামে গ্রামে মহল্লায় মহল্লায় এ রং ও রঙের প্রচার, চুপচাপ কোনও একটি বিশেষ রঙে ছাপ, পরে ছাপ গোনা, যোগ-বিয়োগ করে জেতা-রং নির্ণয়, আবার পাঁচ বছর। সংসদীয় রাজনীতির বা রংনীতির এই হল মূল গল্প।

যে বিষয়টা নিয়ে তুমি আমায় একটা নতুন গান বাঁধতে বলেছ, সেই সংবিধান কিন্তু এই গল্পের চেয়ে অনেক বড়। তুমি তো জানোই, গান বাঁধার সময় আমি সাধারণত কথা অাগে লিখি। সামনে একটা সাদা পাতা। কলম হাতে ভাবতে বসা, ভাবতে থাকা, মাথার ভেতরে এটা ওটা ঘটতে দেওয়া, ভাবনা আর শব্দর আনাগোনা, হঠাৎ আসা হঠাৎ যাওয়া, তালগোল পাকাতে দেওয়া, বিশৃঙ্খল, কী-হবে-রে-বাবা, কী করে ধরব, কী ভাবে শুরু করব। শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, আয়ান রশিদ খানের সঙ্গে মির্জা গালিবের কবিতার তর্জমা করতে গিয়ে দুই বন্ধু মাছ ধরতে বসতেন। শক্তি প্রার্থনা করতেন— হে গালিব, একটা মাছ দাও। বিলকুল সাদা কাগজটার দিকে (ইদানীং কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে) ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি কোনও কবি বা গীতিকারকে বাদ রাখি না। মাছের জন্য নয়। শব্দের জন্য, বাক্যের জন্য। সকলের কাছে ভিক্ষে চাই: দাও বাবা, একটা শব্দ দাও। তার পর আর একটা। কপাল, বুঝলে বন্ধু, সবই কপাল। ওই বস্তুটি ভাল থাকলে হাত পেতে রেখে পেয়ে যাই কারও দয়া। তার পর লড়াই। এই মুহূর্তে আমি লড়ছি, লড়ছি— আমার দেশের সংবিধান, অন্তত তার ভূমিকাটি সামনে রেখে, সামনে রেখে আমার সময়, আমার চার পাশটাকে, দেশটাকে, গত পরশু, গত কালটাকে, আজকের দিনটাকে।

সামনে তোমার আমার সময়
সামনে দেশের সংবিধান
লিখতে চাইছি তোমার জন্য
একটি গান একটি গান।

এই ‘তুমি’টা কে? তুমি, বন্ধু? নাকি সংবিধান? নীতিমালার সেই কাঠামো যা এক রাজনৈতিক রাষ্ট্রের বনিয়াদ? নাকি ভীমরাও রামজি আম্বেদকর, পশ্চিম ভারতের সেই ‘অস্পৃশ্য’ (বন্ধু, এই দেশে জন্মে তুমি আমি এই ‘শব্দটি’ জেনেছি, আমাদের সংবিধান চেয়েছে তা মুছে দিতে, কিন্তু…) জাতির মানুষটি, যিনি ছেলেবেলায় ‘উঁচু জাতির’ হিন্দু সহপাঠীদের মুখে-হাতে লাঞ্ছিত হতেন, যিনি বরোদার গায়াকওয়াড়ের দেওয়া বৃত্তি পেয়ে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন, যিনি বরোদা পাবলিক সার্ভিসে যোগ দিয়ে আবার সেই ‘উঁচু জাতির’ হিন্দু সহকর্মীদের মুখে-হাতে লাঞ্ছিত হয়ে ওকালতি ও শিক্ষকতায় যান, যিনি দলিতদের নেতা হয়ে ওঠেন, ১৯৪৭-এ হয়ে ওঠেন ভারত সরকারের আইনমন্ত্রী, যিনি ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন (যে সংবিধানে ‘অস্পৃশ্যদের’ বিরুদ্ধে বৈষম্য আইনত নিষিদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু…) যিনি তার পর বিরক্ত হয়ে ইস্তফা দেন, সংবিধানে নিষিদ্ধ হয়ে গেলেও সমাজের প্রাত্যহিকতায় দলিতদের বিরুদ্ধে বৈষম্য যে আগের মতোই চলেছে এটা দেখে যিনি ১৯৫৬ সালে দুই লক্ষ দলিত অনুগামীকে নিয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন? এই দীর্ঘ বাক্যটি পড়ে তুমি কি ক্লান্ত, বন্ধু? আমরা কেউ কেউ, (তুমিও) কি তার চেয়েও ঢের বেশি ক্লান্ত নই সংবিধানে যা যা লেখা আছে, বাস্তবে অনেক সময় তার উল্টোটাই দেখে দেখে?

সবই গেল উলটে পালটে
কোথায় আমার সংবিধান
আম্বেদকর শুনুন এ বার
পালটে দেওয়ার একটি গান।

এ বার তুমি নিশ্চয়ই মুহূর্তের উত্তেজনায় দু’হাত ঘষছ। পেয়েছি লোকটাকে। ‘পালটে দেওয়ার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না’র ফেরে লোকটা এখনও আছে। স্বভাব যায় না ম’লে। বেশ, তুমিই নাহয় বলো— কার স্বভাব যায়? এই শীতের স্বভাবটাই দেখ না! এই শুনছি ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’, এই দেখছি উত্তরাঞ্চলে কী মারাত্মক শীত। সেই সঙ্গে শতকরা ৭ না শতকরা ৯ ইকনমিক গ্রোথের দিকে, এখানে ওখানে কল সেন্টার আর এ টি এম কাউন্টার, সুইমিং পুল, জিম, কমিউনিটি হল, টেনিস কোর্ট সমেত স্বপ্নের আবাসন প্রকল্পের দিকে, ‘টিম ইণ্ডিয়া’র খেলোয়াড়দের এক একটা দেবতা বানিয়ে তোলা, যাঁদের বুকে পিঠে হাতে সর্বত্র একটি বাণিজ্যসংস্থার নাম, আর যাঁদের অজস্র আয় এবং এই খেলাটি কেন্দ্র করে যাঁদের ব্যবসা তাঁদের আয় আরও বাড়ানোর দিকে, আরও আরও বিদেশি লগ্নির গর্বে ক্রমান্বয়ে গর্বিত হয়ে ওঠার দিকে, নতুন নতুন শপিং মলের দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়া তোমার আমার মতো লোকদের স্বভাব? আর, ওই যে শীতের রাতটা নিজের ডেরায় কাটানোর মুরোদ যাদের নেই, কোনও ডেরাই যাদের নেই (ভাবো— কী সাংঘাতিক অপদার্থ!), কিছুতেই যারা ‘ও-পাড়ার নন্দী’র মতো ‘গেঁটেবাত’ সারাবে না, কিছুতেই জলহাওয়া বুঝে অবসর কাটাতে যাবে না মরশুমমাফিক কোনও টুরিস্ট রিসর্টে, অসুস্থ হলে ভর্তি হবে না কোনও নার্সিং হোমে, কিছুতেই ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড পকেটে নিয়ে যারা কোনও হোটেলের লাউঞ্জে গিয়ে দাঁড়াবে না এই বিদঘুটে শীতের রাতে, তাদের স্বভাব? তুমিই বলো?

হাড়কাঁপানো শীতের রাতে
রাস্তায় হোক আত্মদান
কোন রাষ্ট্রের ভোটার ওরা
লেপের তলায় আমার গান।

কাঁচুমাচু মুখে থাকার আছেটা কী, বলো। মানুষ তো মরবেই। আজ হোক, কাল হোক। কেউ স্বাভাবিক নিয়মে জরাগ্রস্ত হয়ে বাড়ির বিছানায়, কেউ কোনও কঠিন অসুখে অকালে, কেউ নার্সিং হোমে, কেউ সরকারি হাসপাতালে, কেউ কলকাতার রাস্তায় একটা গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে, কেউ রেষারেষি করে ছুটতে থাকা বাস বা ট্রাকের তলায়, কেউ কোনও কান-কাটা প্রদীপ বা হুব্বার রিভলভারের গুলিতে, কেউ ভোট দিতে গিয়ে, কেউ ভোট দিচ্ছে না বা দিতে চাইছে না বলে, কেউ কাশ্মীর, মণিপুর বা নাগাল্যাণ্ডে পরিচিত কাউকে টেলিফোন করেছিল তাই, কেউ ওই রকম কোনও রাজ্যে (কী আপদ) জন্মেছে আর বড় হয়েছে বলে, কেউ সাপের কামড়ে, কেউ কোনও বোম্বেটের বোমায়, কেউ বড্ড জোরে মাইক বাজছে বলে প্রতিবাদ করতে গিয়ে, কেউ মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে, কেউ উপদ্রুত কোনও রাজ্যে ছেলে হয়ে জন্মানোর কারণে, কেউ হাসপাতাল বড্ড দূরে তাই ভ্যানরিক্সায় শুয়ে শুয়ে মাঝরাস্তায়, কেউ ডাইনি সাব্যস্ত হওয়ার দরুন, কেউ (কী দুঃসাহস) বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেছে বলে, কেউ আবার সেই দলকে সমর্থন করেনি বলে, কেউ শান্ত নদীটির কোল-ঘেঁষা ছায়া-সুনিবিড় একটি গ্রামের মোড়লের অনুমতি না নিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে বলে, কেউ ডাব চুরির দায়ে (তাও অপ্রমাণিত) এই প্রজাতন্ত্রের অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ভোটার-প্রজার গণপিটুনিতে, কেউ দলিত হয়ে জন্মানোর অমার্জনীয় অপরাধে, কেউ বেশি খেয়ে ফেলে, কেউ ইয়ে, কেউ-জানে-না-কেন আদৌ খেতে পায়নি বলে, কেউ আদিবাসীদের জমি কেড়ে নিয়ে কারখানা তৈরি হচ্ছে তাই আদিবাসী হিসেবে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে এই রাষ্ট্রের পুলিশের গুলিতে, কেউ কোনও কোনও পেট্রল পাম্পে পেট্রলে যে ভেজাল দেওয়া হচ্ছে, তা ধরে ফেলার অযৌক্তিক উদ্যোগে মাফিয়ার গুলিতে, কেউ করদাতাদের টাকায় যে মহাসড়ক বানানো হচ্ছে, তাতে কারচুপি চলছে এই খবরটা এই রাষ্ট্রের এক নেতাকে চিঠি লিখে জানানোর গর্হিত
অপরাধে। মরতে হবেই।—

বাঁচলে কিন্তু মরতে হবে
যেমনই হোক সংবিধান
সেই সুযোগে কবীর সুমন
ফেলছে লিখে একটা গান।

কী রকম মেলাচ্ছি বলো? আমাদের দেশের মতো এত উদার সংবিধান কটা দেশের আছে? এর নীতিমালার একটি ভগ্নাংশও যদি ফলিয়ে দেওয়া যেত, বন্ধু? আহা, জানি, তুমি কী বলতে চাও। সেই নীতিমালার পরিসরেই তো আইন প্রণয়ন হচ্ছে। সব মানুষ সমান। শিক্ষার অধিকার সকলেরই আছে। সব নবজাতকের আছে বাঁচার অধিকার। এ-সংবিধান এ-দেশের সকলের জন্য সুবিচার, স্বাধীনতা, সমতা ও সৌভ্রাতৃত্ব কায়েম করতে চায়।

সন্দেহ কী সবাই সমান
সাম্য চাইছে সংবিধান
সবার জন্য সমান সুযোগ
সেই সুযোগে একটি গান।

দেখো অধিকার খর্ব হলে বা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আদালতে যাওয়াই যায়। আইনজ্ঞরা আছেন। বিচারক আছেন। এ দেশের আইন তার নিজের পথেই চলে। অনেক সাধারণ মানুষ সুবিচার পেয়েছেন আদালতে। শাস্তি পেয়েছেন অনেক দোষী। কিন্তু, মুশকিল শুধু একটি জায়গায়। আইনের সাহায্য নিতে পয়সা লাগে। তুমি-আমি এমন আইনজীবীকেও চিনি, বিপদে পড়া গরিব মক্কেলের মামলা যিনি বিনি পারিশ্রমিকে লড়ে থাকেন। এমন চিকিৎসকও কি নেই এ দেশে, যিনি নিখরচায় গরিব রুগির চিকিৎসা করেন? কিন্তু, বড্ড বেশি লোক যে এখনও সরকার-অনুমোদিত দারিদ্রসীমার নীচে। কিছু আইনজীবী ও চিকিৎসক বিচ্ছিন্ন ভাবে, স্রেফ মানবিকতার জায়গা থেকে কত জনকে সাহায্য করবেন? এ দায়িত্ব আসলে কার? বোধহয় রাষ্ট্রের, তাই না?

বাবুইঘাসের দড়ির দামে
সারা মাসের সংস্থান
শুকনো গ্রামে শুকনো মুখে
কেমন শোনায় আমার গান?

সে দিন শুনলাম, বান্দোয়ানে এ রকম পরিবার আছেন, যাঁদের মাসিক আয় ৯০ টাকা। না, না। ভেবো না র্যাডিকাল কোনও সূত্রে এই খবর পেয়েছি। তিন চার জন মিলে বাবুইঘাসের দড়ি পাকান, তার পর বেচে দেন। ক্ষেপেছ? কোনও দিন যাইনি ওই সব এলাকায়। সরকারের এক কর্মচারী আমায় খবরটা দিলেন, তাই পেলাম। বন্ধু, তোমার কি মনে হয়, দড়ি পাকিয়ে পাকিয়ে দড়ি হয়ে যাওয়া ওই মানুষরা জানেন আমাদের সংবিধান তাঁদেরও জন্য?

ওই তো নীতি, মিষ্টি নীতি
তন্ত্রে প্রজা, মন্ত্রে গান
কাদের খাওয়া আমার পেটে
কাদের জন্য সংবিধান।

ওরা আসছে। দেখছ তো, শুনছ তো, পড়ছ তো! ওরা আসছে। আমাদের দেশটাকে, মানে তোমার আমার দেশটাকে, মানে তোমার আমার মতো শ্রেণি-আনুকূল্য নিয়ে জন্মানো মানুষদের দেশটাকে, মানে সরকার-অনুমোদিত দারিদ্রসীমার তলায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য তলিয়ে যাওয়া মানুষদের দেশটাকে (সকলেই কিন্তু ভোটার), মানে ‘মিড-ডে-মিল’-এ ‘উঁচু জাতের’ ছেলেমেয়েরা যাঁদের হাতের রান্না খেতে চান না তাঁদের দেশটাকে, মানে ‘উঁচুজাতের’ দেশটাকেও, মানে ওই বাবুইঘাসের দড়ি-পাকানো লোকগুলোর দেশটাকে মানে গুরগাঁও-এ যাঁরা পুলিশের হাতে অকথ্য মার খেলেন তাঁদের দেশটাকে, মানে পণ নেওয়া বে-আইনি তবুও যাঁরা একমনে পণ নিয়ে চলেছেন এবং পণ না পেলে যাঁরা সরল মনে বধূ হত্যা করে চলেছেন তাঁদের দেশটাকে, মানে আমার মাতামহ পণ্ডিত রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ টোলের পণ্ডিত ছিলেন, স্যর আশুতোষের মেয়ের বিয়েতে পৌরোহিত্য করেছিলেন, সুতরাং তিনি এক জন ‘হিন্দু মৌলবাদী’ এ কথা গভীর দুঃস্বপ্নেও না ভেবে মাদ্রাসায় যাঁরা পড়েন ও পড়ান, তাঁদের আলবৎ মুসলিম মৌলবাদী সাব্যস্ত করার এই দেশটাকে, মানে জমি হারানোর প্রতিবাদে শামিল হয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত আদিবাসীদের ময়নাতদন্তের নামে হাতের আঙুলগুলো আর যৌনাঙ্গ কেটে দেহগুলিকে সৎকারের জন্য ফেরত পাঠানোর এই দেশটাকে, মানে গুজরাতে একের পর এক গণকবর আবিষ্কার হচ্ছে তা সত্ত্বেও ‘বিশেষ কিছুই হল না’র এই দেশটাকে, মানে পৃথিবীর অভুক্ত শিশুদের বিরাট একটি অংশ যে দেশে জন্মায়, বড় হয়, তার পর ভোটার হয়, সেই দেশটাকে, মানে প্রতিরক্ষা খাতে আরও আরও টাকা, হাজার হাজার কোটি টাকা যে দেশে বরাদ্দ হয়, অথচ যে দেশের অনেক অঞ্চলের অগুনতি মানুষ প্রতি দিন দু’তিন মুঠো চালের বিনিময়ে কয়েক মাস ধরে সারা দিন খেটে গ্রামের সকলের জন্য পুকুর খোঁড়েন কারণ, শুকনো এলাকায় জলের বন্দোবস্ত করার টাকা দিয়ে তোমার-আমার রাষ্ট্র জঙ্গিবিমান কেনে সেই দেশটাকে (মানে বাক্যটা একটু গুলিয়ে গেল, বন্ধু, কারণ তোমার গান বাঁধার বরাতটা পাওয়ার অনেক আগে থেকেই আমার অনেক কিছু গুলিয়ে গিয়েছে, অতএব বেশ করেছি এমন বেসামাল বাক্য লিখেছি), যে দেশে সাধারণ কথাগুলোও খালি গুলিয়ে যেতে চায় সেই দেশটাকে ওরা ওদের টাকা খাটানোর মোক্ষম জায়গা হিসেবে পছন্দ করতে শুরু করেছে। ভালই তো বলো? বাইরের টাকা না হলে চলবে কী করে? আমার আয়ের টিকিটাও কি ওই টাকার আগমনের সঙ্গে বাঁধা নেই?

আসছে টাকা লগ্নি হবে
নিষ্ফলা সব জমির টান
গানের কসম গাইব তোমায়
আমার দেশের সংবিধান।

আচ্ছা, তোমার কি মনে হয়, টমসন-গো-এণ্ড-লিন্‌শ-দেম-নাও ইনকর্পোরেটেডের বড় কর্তা বা সুপার-পিৎজা-ম্যাকফার্লেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের প্রচারসচিব বা ওই ধরনের লগ্নিক্ষ্যাপা সংস্থার প্রতিনিধিদের কারও অন্তত মনে হবে যে তাঁদের অ্যানুয়াল রিপোর্টের ওপর একটা জুতসই গান আমাকে দিয়ে লেখালে মন্দ হয় না? তোমার কি মনে হয় না, বন্ধু, আর কিছু বছরের মধ্যে বিভিন্ন কর্পোরেট হাউসের বার্ষিক রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাদের দেশ চালানো হবে?
লিখব এ বার মুক্ত অর্থ-

নীতির নামে চারশো লাইন
পালটে যাবে অমুক ধারা
পালটে যাবে তমুক আইন।

পালটে যাওয়াই প্রাণের ধর্ম
আসুন সবাই পালটে যান
অন্য রকম পালটে দেওয়ার
স্বপ্ন দেখত আমার গান।

কিংবদন্তী, বন্ধু আমার,
সংবিধানের চোখের জল
হঠাৎ তুমি চেঁচিয়ে ওঠো:
আর এক দফা হামলা বল!

আমার গানের দাফন হবে
আমার সঙ্গে আসছে কাল
আয় রে কুমির সায়েব কুমির
তোরই জন্য কাটছি খাল।

কাদের কলে থেঁতলে যাচ্ছে
প্রজার ফসল প্রজার ফল
গানের দিব্যি চেঁচাও এ বার:
হামলা বল হামলা বল।


সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

১৫ মাঘ ১৪১২ রবিবার ২৯ জানুয়ারি ২০০৬

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress