শাহবাগের আন্দোলন

বৃদ্ধতন্ত্র নবীনদের স্বপ্ন ধ্বংস করছে

যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে চলমান বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম ভারতের সংগীতশিল্পী কবীর সুমনও। নিজের লেখা গানের মাধ্যমে এর মধ্যেই গিটারে গণদাবি তুলেছেন তিনি। এবার ‘আনন্দ’-এর মুখোমুখি হয়ে বললেন ‘গণদাবি’ ও ‘শাহবাগে রাতভোর’ গান দুটি লেখার আদ্যোপান্ত…

প্রথমত, আমি একজন সংগীতকার, যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, সংগীতে প্রাণ থাকা চাই, যাতে সমাজের ওপর তার এবং তার ওপর সমাজের প্রভাব পড়ে; যাতে সমাজের বয়সের সঙ্গে তার বয়স বাড়ে। আমার কাছে রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা যদি গোটা উপমহাদেশের দিকে তাকাই, দেখতে পাব, প্রধানত রাজনীতিক—তাঁদের দলসর্বস্বতা এবং বিচক্ষণতার অভাবের দৃষ্টান্ত। তরুণেরা আজ যেন পণ্য। এখন চারপাশে বড় বড় সংস্থা তৈরি হচ্ছে, যারা তরুণসমাজকে একটি মেকি তারুণ্যের আবরণে সস্তা ছায়াছবি, ক্রিকেটের মতো বিশেষ বিশেষ কিছু খেলা (যার মধ্যে বিজ্ঞাপনের জেল্লাই বেশি), পোশাক-আশাকের ডিজাইন—এসব দিয়ে ঢেকে রাখতে চাইছে। শুধু তা-ই নয়, তারা এগুলোকেই ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করছে।
রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি, তরুণ-নবীনদের প্রতি অবহেলা আর মুনাফালোভীদের ভিড়। এই মুহূর্তে কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার একটি চরণ খুব মনে পড়ছে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন এই মুনাফালোভীদের প্রসঙ্গে—‘বৃদ্ধ বোধের অবাধ মুনাফামুক্তি’।
কেউ একবারের জন্যও ভেবে দেখছেন না তরুণেরা কী চান। রাজনৈতিক নেতারা মনে করেন, তাঁদের মুখনিঃসৃত বাণী শুনে শুনে নবীনেরা বুড়ো হবেন। সারা উপমহাদেশে বৃদ্ধতন্ত্র নবীনদের স্বপ্ন ধ্বংস করছে।

বাংলাদেশের তরুণেরা চিরকালই উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোর তুলনায় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক বেশি সংবেদনশীল। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তরুণদের ভূমিকা ছিল খুব জোরালো। আজ বাংলাদেশের তরুণেরা যৌবনের যে স্ফুরণ দেখাচ্ছেন, এ ধরনের ঘটনা এ দেশে আগেও ঘটেছে। কোনো রাজনৈতিক নেতাকে বেশি কাছে আসার এবং বেশি গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ না দিয়ে যে আন্দোলনমুখিতা দেখাচ্ছেন বাংলাদেশের তরুণসমাজ, তা উপমহাদেশের ইতিহাসে বিরল। এ ধরনের আন্দোলন গত শতাব্দীর ষাটের দশকে দেখা গিয়েছিল ইউরোপ ও আমেরিকায়।

তবে আজ এই মুহূর্তে বাংলাদেশের তরুণ-নবীনেরা আমার মতো বুড়োদের দেখিয়ে দিচ্ছেন, কীভাবে বিশৃঙ্খলা না করে কেবল অন্তরের সংহতি এবং একমুখী অঙ্গীকারের ভিত্তিতে উদার এক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। তাঁদের এই আন্দোলন দেখে আমার মনে হচ্ছে, উপমহাদেশে এই সবে গণতন্ত্র আসছে।
ঢাকার শাহবাগের ‘প্রজন্ম চত্বর’-এর আন্দোলন শুরু হওয়ার পরপরই আমার মনে হলো, আমার গানকে বাংলাদেশের তরুণদের কাজে লাগতে হবে। আমি তো গানের মানুষ, তাই সংগীতের মাধ্যমেই আমার দ্রোহ ও প্রতিবাদ। এই মুহূর্তে সংগীতকার হিসেবে আমার একটাই কর্তব্য: বাংলাদেশের নবীনদের এই আন্দোলনে শামিল থাকা। আমার আশা, গোটা উপমহাদেশ এবং সারা পৃথিবী বাংলাদেশের তরুণদের এই আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেবে।


সৌজন্যেঃ-

প্রথম আলো (১৪ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৩)

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress