ভাষা মতিন

১৯৯৬ সাল। জীবনে প্রথম বাংলাদেশে। ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের তহবিলের জন্য টাকা তুলছি গানের অনুষ্ঠান করে। আমার ভাই জাকির আমায় নিয়ে গেছেন শিল্পকলা একডেমিতে। দেখছি সব। বাংলাদেশে গিয়ে আমার মনের অবস্থা যে কেমন ছিল তা জানি একমাত্র আমি। হঠাৎ এক তরুণী এসে আমায় আদাব জানিয়ে বললেন তাঁর আব্বা আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। আমি বললাম, আমার সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে আমার আমন্ত্রণকারীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। স্মিত হেসে তরুণী বললেন, সুমনদা, আমার আব্বা আপনার সঙ্গে দেখা করবেনই। – তাঁর আব্বার নাম জানতে চাওয়ায় তিনি বললেন ‘আবদুল মতিন।’ আমার স্মৃতি আজকাল অসহযোগিতা করছে আমার সঙ্গে। আমি কি ভুল বলে ফেললাম? মনে আছে, চমকে উঠে আমি বলেছিলাম, “কোন্‌ আবদুল মতিন?” সেই তরুণী স্মিত হেসে বলেছিলেন, “সুমনদা, আপনি যাঁর কথা ভাবছেন, ইনি তিনিই।” – এর নাম বাংলাদেশ। – এর পর জাকিরের সঙ্গে তাঁর কিছু কথা হয়েছিল।

জাতীয় যাদুঘরে একক অনুষ্ঠান করলাম। বন্ধুবর আসাদুজ্জামান নূর আমায় জানালেন, “ভাষা মতিন এসেছেন।” – আমি ভাবতেও পারিনি। উত্তেজনায় আবেগে প্রায় কাঁপতে কাঁপতে নূরের সঙ্গে কয়েক পা যেতেই দেখি সামনেই এক ঋজুদেহী মানুষ। একজন পুরুষ। আগে তাঁর পায়ের ধুলো মাথায় নিলাম। তিনি আমার প্রণাম গ্রহণ করে আমার মাথায় তাঁর ডান হাতটি রাখলেন। আমি বললাম, আপনি কষ্ট করে এলেন? – স্থির দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “একজন ভাষাসৈনিক আর-একজন ভাষাসৈনিকের কাছে আসবে – এটাই প্রকৃতির নিয়ম, সুমন।” – ভাষা মতিন, আপনি চলে গেলেন, যেভাবে সবাই যায় একদিন না একদিন। আমার জীবন নানান ব্যর্থতার সমাহার। কিন্তু আপনি জানেন, যেমন জেনে গিয়েছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আমার কোনও গানে আমি ভাষার ব্যাপারে আমার বাংলা ভাষাকে আপসের জায়গায় নামাইনি। কসম বাংলা ভাষার, অমর ভাষাসৈনিক ভাষা-মতিন, আমি আজও ছোট মাপের হলেও ভাষাসৈনিকই থেকে যেতে পেরেছি আপনার আশীর্বাদে। এই পরিচিতি নিয়েই যেন আমার দাফন হয়!

ভাষা মতিনের মৃত্যুর পর সুমনের মন্তব্য

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress