বন্ধু আবদুল্লাহ্‌ আল ফারুক

faruk

আমার বন্ধু আবদুল্লাহ্‌ আল ফারুকের সঙ্গে – কিছু মাস আগে যখন ওঁরা এসেছিলেন আমার বাড়ি। ১৯৭৫/৭৬ সালে সে-যুগের পশ্চিম জার্মানির কোলন শহরে আমাদের পরিচয়। জার্মান বেতার তরঙ্গের বাংলা বিভগে। কত অল্প বয়স তখন আমাদের। ফারুকের মতো বেতার-সাংবাদিক, বেতার-ঘোষক-ও-পাঠক-ও-আলোচক এ-জীবনে কম দেখেছি। একজন সত্যিকার সজাগ মানুষ। তেমনি, ওঁর যা গ্রামোফোন রেকর্ডের সংগ্রহ ছিল! কী বলব। তখনও গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগ। কী-বিপুল ওঁর সঙ্গীত-শোনার পরিধি। বিরল। খুবই বিরল। ওঁরই সংগ্রহে আমি পেয়েছিলাম রঘুনাথ পানিগ্রাহীর গাওয়া “গীতগোবিন্দ”। সেই প্রথম শুনেছিলাম। কান পবিত্র হয়ে গিয়েছিল। ফারুকের সংগ্রহ থেকেই প্রথম শুনেছিলাম এস্‌থার ওফারিমের গান। সম্ভবত পাকিস্তান বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের কিছু গ্রামোফোন রেকর্ডিং শুনেছিলাম আচার্য্য মেহেদি হাসানের। সেইসব রেকর্ডিং আর কোথাও শুনিনি। কী আশ্চর্য সুন্দর। বর্ণনার ভাষা নেই আমার। সুন্দর গান গাইতেন ফারুক। এখনও নিশ্চই গুন্‌গুন্‌ করে গেয়ে ওঠেন কখনও। তাঁর কন্ঠেই শুনেছিলাম আশ্চর্য এক গান: “সোডো সোডো ঢেউ তুলি।” – চট্টগ্রাম বেতারের এক স্টাফ আর্টিস্ট মলয় দস্তিদার/নাকি ঘোষদস্তিদার-এর রচনা। – ফারুক, ভুল হলে শুধরে দিস। অমন haunting সুর জীবনে ক’বার শুনেছি? ফারুকের গলায় শোনা, কখনও ভুলিনি। ওয়াশিংটন ডিসিতে ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগেও আমরা দু’জন কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে কাজ করেছি। আমাদের টেবিলও ছিল পাশাপাশি। কী কর্মী। ঝড়ের গতিতে খবর, সংবাদভাষ্য তর্জমা করে ফেলতেন – নিখুঁত। দুজনেই ছিলাম তখনকার ‘রেগন্‌-প্রশাসনের’ বিরোধী। কিন্তু আমরা পেশাদার লোক। মাইনে নিচ্ছি। দাঁতে দাঁত চেপে কাজ করে গিয়েছি নিখুঁতভাবে। কেউ কেউ বলবেন – মার্কিনী প্রশাসনের দালালি। হুঁ, তা বটে। ঠিক যেমন আমাদের দেশগুলোর সরকারি বেতারে একই ধরণের কাজ করা।

জেনেশুনেও সরকার-অনুমোদিত খবর লেখা, পড়া। সরকার-অনুমোদিত। কঠোর ভাবে। যেগুলো আসল খবর সেগুলো – বেগতিক দেখলেই (মানে সরকারের পক্ষে বেগতিক দেখলেই) চেপে যাওয়া। এও তো দালালিই – মার্কিনী সরকারের দালালির যুক্তিতে। যেদিন ভয়েস অফ আমেরিকার পাকা চাকরি ছেড়ে নিকারাগুয়া চলে গেলাম তার আগের সন্ধেবেলা ফারুকের বাসায় দাওয়াত ছিল। মনে আছে, ফারুক টোস্ট করেছিলেন – “নিকারাগুয়া লিব্রে!” মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জগদ্‌বিখ্যাত “আই হ্যাভ আ ড্রীম” ভাষণের বিশ তম বার্ষিকীতে ফারুক আর আমি ওয়াশিংটন মলের বিশাল জনসমাবেশে সামিল হয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশের আরও দুই নবীন নাগরিক – বিব্বু আর শুভ। আমরা চারজনে ছিলাম উপমহাদেশের প্রতিনিধিদল – সেইভাবে দেখতে গেলে। উপমহাদেশের আর কেউই ছিলেন না সেখানে। অথচ কতো উপমহাদেশীয় আমেরিকায় থাকেন, সে-দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। কিন্তু “জনসমুদ্রে যখন জোয়ার লাগে”, তখন তাঁরা থাকেন কি “ঘোড়সওয়ারের” খোঁজে? সেই বিশাল জন-সংহতিতে অন্তত তাঁরা ছিলেন না। – পীট সীগার গান গেয়েছিলেন। – কোথায় চলে গেল দিনগুলো, ফারুক। – তারপর আমরা দু’জন আবার মিলিত হয়েছিলাম সেই ভয়েস অফ জার্মানির কোলন অফিসেই, ১৯৮৬ সালে। ফারুক তাঁর আগেই আমেরিকা ছেড়ে কোলন চলে গিয়েছেন। – কতো বিচিত্র ঘটনার সাক্ষী যে আমরা। একদিক থেকে দেখতে গেলে আমরা এক সঙ্গে বুড়ো হলাম। আমি যতটা ছটফটে, ফারুক ততোটাই স্থির। আমি যতোটা বাচাল, ফারুক ততোটাই মিতভাষী। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ফারুক জার্মানিতেই থাকেন। আমি থাকি বোষ্টুমঘাটা। কাছেই যাদবপুর। ফারুক যেন একবার বলেছিলেন – তাঁর মায়ের আদি-দেশ ছিল যাদপুরই। আমি কি খোয়াব দেখছি, ফারুক? ভুল বললে শুধরে দিস। ভালো থাকিস। আমি ভালো আছি।

১০-০৭-১৪

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress