যাদের বসত…

যাদের কাছে সুমন ক্রমাগত ‘বনস্পতির ছায়া’ হয়ে উঠেছেন, তাদের শ্রদ্ধা বা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই এই পাতাটির সংযোজন।

গানওলা ক্ষমা চাই {প্রথম পর্ব}

শ্যামলে শ্যামল তুমি নীলিমায় নীল রবি গানে,
যে নদীর কূল নেই, সে স্রোতে বৈঠা যারা টানে।
আব্বাস উদ্দিন দরিয়ায় ধরেছেন সুর,
শ্বাশ্বত বেহুলার ভালোবাসা সিঁথির সিঁদুর।
ভাষা শহীদের খুনে সে সিঁদুর আরো লাল হলো-
এ যদি আমার দেশ না হয়, কার দেশ বলো???

স্মৃতিতে এখনো শুনি বঙ্গবন্ধুর আহবান,
পূবের আকাশ ছোঁয় শান্তিতে ভোরের আযান।
একুশের হাত ধরে চেতনার হয় হাতে খড়ি,
বাংলা দেখলে আমি এখনো বাংলাদেশ পড়ি,
মুক্তিযুদ্ধ ডাকে আগামীর দিকে হেঁটে চলো,
এ যদি আমার দেশ না হয়, কার দেশ বলো??

কি মনে হয়, বলুন তো? এই গান/ গীতিকবিতার রচয়িতা কে?
নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে বাংলাদেশের কোন নাগরিক-ই হবেন?
পারেননি, বাংলাদেশের কেউ পারেননি এই লাইন গুলো লিখতে।
তারা লিখতে পেরেছেন “তুমি-আমি”-র গান, তাদের দেশপ্রেম রয়ে গিয়েছিলো মুখের বড় বড় বুলির মাঝেই। এদেশের অসংখ্য দেশাত্মবোধক গানের সুরকার/গীতিকার দের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আমার কাছে বাংলাদেশ নিয়ে লেখা গান গুলোর মাঝে মানের তালিকা করতে বলা হলে প্রথম ৩টির মাঝে এটিকে আমি রাখবো।
এই গানের রচয়িতা, সুরকার, গায়ক কবীর সুমন, যিনি পরিচিত ছিলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো পরিচিত আছেন অনেক জায়গায় সুমন চট্টোপাধ্যায় নামে।
এই লোকের নেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব, কারণ নেই এদেশের প্রতি কোন ভালোবাসা থাকার।
এদেশের জন্য তিনি যা করেছেন, তার তুলনায় প্রাপ্ত ভালোবাসার চেয়ে অপমানের অংশটাই বেশি ছিলো বোধ করি।

কবীর সুমন, তৎকালীন সুমন চট্টোপাধ্যায় এর জন্ম ১৯৪৯ এর ১৬ই মার্চ, উড়িয়ায়। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতে সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের তালিম পাওয়া এই সঙ্গীতকারের উত্থান ১৯৯২ সালে, “তোমাকে চাই” নামক একটি এ্যালবাম প্রকাশের পর। এখনো অনেকেই তাকে শুধু এই একটি গান দিয়েই চেনেন।
আমাদের ইতিহাস এবং বদ-ঐতিহ্য বলে যখন একজন শিল্পী নাম করেন, তখন তার তথাকথিত “বাজার দর” হু হু করেই বাড়ে, আবার যখন এই চাহিদা শেষ হয়, তখন তিনি বেঁচে আছেন কি মরে গেছেন, সে খবর নেবার প্রয়োজনও কেউ অনুভব করেন না।
‘৯২ সাল হতে ‘৯৬ সাল, খ্যাতির চূড়ান্ত সীমায় অবস্থান করার কারণেই হোক, বা অন্য কোন কারণে, সুমন ছিলেন প্রতিটি গানের অনুষ্ঠানের এক চরম আরাধ্য শিল্পী। তার পারিশ্রমিক ছিলো সেই সময়ে বাঙালি শিল্পীদের মাঝে সবচে বেশি। ঠিক সেরকম অবস্থায়, তার ডাক পড়ে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠান করার, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে দেবার উদ্দেশ্যে। আয়োজক ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, আক্কু চৌধুরী সহ আরো অনেক সমমনা মানুষ।
তিনি আসেন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৭ দিনে ৫টি অনুষ্ঠান করেন, যার প্রতিটি ছিলো ২ থেকে ৩ ঘন্টা ব্যাপি। যারা তাঁকে চেনেন, তাঁরা জানেন, তিনি উপমহাদেশের একমাত্র শিল্পী যিনি একাই একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। কোন যন্ত্র শিল্পী নেই, কোন উপস্থাপক নেই, কেউ নেই- শুধু তিনি একা একটি গীটার আর সিন্থেসাইজার নিয়ে অনুষ্ঠান করতেন। ৪৭ বছর বয়সে ৭ দিনে টানা ৫টি অনুষ্ঠান করা মুখের কথা নয় বলেই আমার মনে হয়। কনসার্টের রেসপন্স বুঝতে দেখতে পারেন-

আর পারিশ্রমিক??
নিজে তো এক টাকাও নেননি, যা অল্প নিয়েছেন, তা শুধু মাত্র তার সেক্রেটারির পারিশ্রমিক, যা তার মূল পারিশ্রমিকের ভগ্নাংশ মাত্র।
অথচ, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব না, কিন্তু গুজব আছে, ঐ ট্যুর এর পর আয়োজকদের একজন নতুন গাড়ি কিনেছিলেন।
যাই হোক, শুধু ‘৯৬ নয়, ১৯৯৮ সালে আবার সুমনের ডাক পড়ে একই উদ্দেশ্যে। সুমন আরো ৪টি অনুষ্ঠান করেন ঢাকায়, এবারও যথারীতি বিনা পারিশ্রমিকে। এদেশকে ভালোবেসে, দেশের মুক্তিযুদ্ধকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এক ভিনদেশী শিল্পী তার শ্রম দিয়ে গেছেন, তারঁ প্রাপ্তি???
একটু পরে বলছি তাঁর কি প্রাপ্তি, তাঁর আগে আসুন তার আরো কিছু ব্যর্থ অবদান দেখি।

বাংলাদেশের আরেক রত্ন ছিলেন রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। নেশা এবং মাদকের খপ্পরে পড়ে অকালেই প্রাণ হারান এই অসম্ভব প্রতিভাবান কবি। তিনি তার জীবদ্দশায় অল্প কয়েকটি গান লিখে গেছেন,
যার একটি হল-

“ ঢেকে রাখে যেমন কুসুম
পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম।
তেমনি তোমার নিবিড় চলা মরমের মূল পথ ধরে-
আমার ভিতর বাহিরে, অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে”।

এই গানটি এদেশ বা কলকাতায় খুব কম মানুষই তখন শুনেছিলেন। সুমন এই গানটি তাঁর প্রায় সব অনুষ্ঠানেই গাইতেন, এবং অনেকে এ গানটিকে সুমনের গান হিসেবেই জানেন। তাঁর মুখে শুনে শুনে আজ এই গান আমার প্রজন্ম কিংবা আমার পূর্ববর্তী প্রজন্মের সকলের প্রায় মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়। বলা বাহুল্য, সুমন প্রতিবার গাইবার সময় নাম নিতেন রুদ্রর, নাম নিতেন সাথে বাংলাদেশের।

“মেয়েদের স্কুল, ডুমুরের ফুল,
সেই ফুলের টানে বাতাস আকুল,
কাহিনী লেখিকা প্রবন্ধটাও
যুক্তি তর্কে কলম খানাও, আপনি শানিয়েছেন-
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন”।

বেগম রোকেয়া, ১৮৮০ সালে রংপুরে জন্ম নেয়া এক অসামান্য নারী, যার জন্ম না হলে এদেশে হয়ত আজো নারীরা পর্দার আড়ালেই থেকে যেতেন। ক’জন বাংলাদেশি পেরেছেন এই নারী জাগরণের অগ্রদূতকে নিয়ে একটা গান বেঁধে যেতে? কয়জন? একজনও কি পেরেছেন?
একজন পেরেছেন, তিনি কবীর সুমন।

বেগম সুফিয়া কামাল, তাঁর সম্পর্কে ভূমিকা দেয়া এই অধমের শোভা পায় না কখনোই।
বাংলাদেশের হয়ত একমাত্র প্রতিষ্ঠিত মহিলা কবি। শুধু এখানেই তার সীমাবদ্ধতা নয়, এই শতকের সবচে অগ্রগামী নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ বলা চলে তাকেই।
অনেকটা নীরবেই চলে গিয়েছিলেন এই কিংবদন্তী, তাকে নিয়ে এক অসামান্য সৃষ্টি ছিলো সুমনের-
“আপনার ঘর মানেই ঘর আর বাইরের মিল,
ভাষার থালায় ভাত খেতে বসে অপার নিখিল।
কারা ভাত কেড়ে নেয়? সাবধান, সামাল সামাল-
ভাত মানে ভাষা আর খালাম্মা সুফিয়া কামাল”।
৯৬ সালে সুমনকে সুফিয়া কামালের কাছে নিয়ে যান নূর, আক্কু সহ বাকিরা। সুমন বসে ছিলেন এই মহীয়সীর পায়ের কাছে, বেগম সুফিয়া কামাল হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন সুমনের টাক পড়া মাথায়। সুমন এই ঘটনা চিত্রিত করেছেন-

“মাটিতে পায়ের কাছে বসেছি ধূলোর মত আমি,
পৃথিবীকে চুমু খায় গানে গানে আমার বোকামি।
বোকারাই গান বাঁধে, গান লেখে, গান গেয়ে মরে-
এবার মরলে আমি জন্মাবো আপনার ঘরে”।
গত বছর সুফিয়া কামালের শততম জন্মবার্ষিকী গেলো। আমি অন্তত কোন সাড়া শব্দ পাইনি, যেখানে সুমন তাঁর ওয়েবসাইটে স্মরণ করেছেন এই কিংবদন্তীকে প্রাণ ভরে।
আর আমরা???

সুমন সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন মনে হয় এদেশের ভাষা আন্দোলন নিয়ে। তাঁর অসংখ্য অসামান্য সৃষ্টি আছে এই আন্দোলন কেন্দ্রিক। তার কয়েকটি আমি তুলে ধরতে চাই-
“পূবের ঐ উদ্বোধনে পশ্চিমেরও বোধন হোক,
একুশে ফেব্রুয়ারি আমার আলো, আমার চোখ।
যে ভাষার জন্য সালাম বরকতেরা রক্ত দিলো,
বাহান্ন সালের লড়াই,আমার আমি জন্ম নিলো।
সে ভাষা আমার গানে, তোমার পানে আমার অঙ্গীকার-
যে ভাষার জন্য এমন হন্যে এমন আকূল হলাম”।

“৫২ ডেকে যায় শহীদের নাম,
২১শে ফেব্রুয়ারী আমার প্রণাম,
আমার ভাষা আজো রক্তের ডাক,
বিজয়ী বর্ণমালা ভাষার সোহাগ।
আমি আছি পশ্চিমে, তুমি আছো পূবে,
একুশের টানে আছি, একুশেই ডুবে
ভাষায় আমার আমি, তোমার তুমিও,
মাতৃভাষা আমার জন্মভূমিও !!”

“একুশে স্বপ্ন, একুশে বড়াই,
একুশ আমার ভাষার লড়াই।
একুশে মিছিল, একুশে হাঁটা,
একুশ মানে না পথের কাঁটা।
একুশে জীবন লক্ষবার,
একুশ আমার অহঙ্কার”।

“আমার গানের মুখ আমার ভাষার মত একা,
আমার ভাইয়ের মুখ, আমার ভাষার মত একা।
আমার ভাইয়ের মুখ আমি দেখি দেয়ালে দেয়ালে,
আমার ভাইয়ের মত আমার ভাষাও একরোখা”

তবে শুধু ভাষার স্তুতি নয়, হিন্দি ভাষার সাম্রাজ্যবাদের প্রতি সুমন প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রতিনিয়ত। তিনি সবসময় লড়াই করেছেন বাংলা ভাষার পৃথক সম্মানের জন্য। হিন্দির আগ্রাসনের প্রতি তিনি ছিলেন সোচ্চার-
“বন্ধুরা দেখো টিভির চ্যানেল ধরে অষ্ট প্রহর হিন্দির যাওয়া-আসা,
মুৎসুদ্দির ফাটকা পুঁজির জোরে বিপন্ন আজ তোমার বাংলা ভাষা।
প্রতিরোধ করো লালনের নাম নিয়ে, প্রতিরোধ করো তিতুমীর তিতুমীর,
প্রতিরোধ করো ভাষার অস্ত্র দিয়ে, বল বীর বলো উন্নত মম শির।
প্রতিরোধ করো নজরুল শতবর্ষে, প্রতিরোধ করো একুশে ফেব্রুয়ারি,
ভাষার পীড়ন ঘোচাও আমার দেশে, ঘোচাও হিন্দি চাপানোর গা-জোয়ারি”।

আরো বলেছেন-
“আমি নাগরিক কবিয়াল গেয়ে যাই, প্রতিরোধ তোলা আমার বাংলা গান,
বাংলা ভাষার কসম যখন খাই, শহীদরা দেন আমার রক্তে টান।
আমি নাগরিক কবিয়াল গান বাঁধি, আপনাকে ডাকি শামসুর রহমান,
দুঃখিনী বর্ণমালায় আমিও কাঁদি, আমি যে আসলে লালনের সন্তান”।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠানের সময় তিনি “আমাদের জন্য” গানের মাঝে বলেছেন-
“প্রতিরোধ করুন বন্ধুরা যে করেই হোক, বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে। প্রতিরোধ করুন বন্ধুরা হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ,
হিন্দি ভাষীদের উপর আমার কিছু বলার নেই, তাদের সমান অধিকার আছে সবকিছুতে,
কিন্তু হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত প্রতিহত করুন বন্ধুরা, আপনারা দয়া করে প্রতিরোধ করুন বাংলাদেশে,
আপনাদের প্রতিরোধের ঐতিহ্য আছে, উত্তরাধিকার আছে, কিছুতেই মেনে নেবেন না ওদের”।

৯৬ সালে সুমন

ঐ অনুষ্ঠানেই সুমন গেয়েছেন, আমার মতে তাঁর সেরা সৃষ্টি “জাতিস্মর”, প্রথমবারের মত । আমি বিশ্বাস করি, এটা আমার দেশ এবং শ্রোতাদের জন্য বিরাট এক সম্মান যে জাতিস্মরের মত গান এদেশে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছে।

ঢাকা শহর নিয়ে গান করেছেন সুমন।
“ঐ তো রাস্তা ঘাট ধানমন্ডির কাছে,
ঐ তো আমার বিষন্নতা একলা বসে আছে।
ঐ তো নূরের হাসি, ঐ তো জাকির এলো,
ঐ তো একটা ঠাট্টা শুনে আমার হাসি পেলো।
ঐ তো রামেন্দু দা, ঐ তো গুলিস্তান,
হাওয়ায় ভেসে আসছে হঠাৎ আজম খানের গান।
ঐ তো আমার শহর, তোমার গন্ধমাখা,
আমায় নিয়ে নামছে এখন এরোপ্লেনের চাকা”।

সুমন সাবিনা ইয়াসমিনকে নিয়ে গেয়েছেন-
“দেখেছি তোমায় দূর নীলিমায়,
শরতের টানে ভেসে,
ভাবনার মত মেঘে অবিরত, দেখেছি বাংলাদেশে”।

সুমন প্রায় প্রতিনিয়ত গেয়েছেন-
“আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি,
তুমি কি অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী,
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে,
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে”

আনোয়ার পারভেজ, সত্য সাহা সহ অসংখ্য কৃতি সঙ্গীতকারের নাম উঠে এসেছে বারবার সুমনের মুখে। তাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাদের গান সুমন গেয়েছেন অনেকবার স্টেজে। পপ গুরু আজম খানের একটি ইন্টারভিউ করেছেন তিনি, নিজে জানার জন্য, নিজের ব্যক্তিগত কালেকশানের জন্য।

হুমায়ূন আজাদকে স্মরণ করেছেন সুমন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে লিখেছেন সুমন।শেখ মুজিবুর রহমানকে বিভিন্ন গানে এবং লেখায় সবসময় গর্ব এবং শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন কবীর সুমন।

তিনি স্মরণ করেছেন খালেদ মোশাররফকে, বলেছেন বিংশ শতাব্দীর বিদায় অনুষ্ঠানে-
“এই শতাব্দী ছিলো বাঙালি জাতির সার্বভৌমত্বের শতাব্দী,
এই শতাব্দী বাংলাদেশের জন্মের শতাব্দী,
এই শতাব্দী বঙ্গবন্ধুর শতাব্দী,
এই শতাব্দী খালেদ মোশাররফের শতাব্দী,
খালেদ,যিনি ক্যুতে ব্যর্থ হলেন, যিনি ধর্মান্ধ বিশেষ এক সম্প্রদায়ের নেতাকে পেছন ফিরিয়ে বসিয়ে এক হিন্দু সেপাইকে দিয়ে লাথি মারিয়েছিলেন,
আমরা ভারতেও খালেদ মোশাররফ চাই,
যারা ধর্মান্ধতাকে লাথি মারবেন, লাথি”

সমসাময়িক রাজনীতি তার গানে সবসময় এসেছে, তবে বরাবরই তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরের লোক।
রাজনীতি সচেতন হিসেবে তিনি সবসময় প্রতিবাদ করে গেছেন সকল অনিয়মের।
তবে এই জায়গায় তার কাছ থেকে একটা শিক্ষা হয়তো আমাদের নেয়ার আছে-
“কিভাবে যোগ্য মানুষকে তার সম্মান দিতে হয়”।

তিনি যেভাবে সম্মান দিয়েছেন সত্য সাহাকে,
যেভাবে সম্মান দিয়েছেন সমর সেনকে,
যেভাবে সম্মান দিয়েছেন আযম খানকে,
যে ভাবে স্মরণ করেছেন আনোয়ার পারভেজকে,
আমরা ক’জন করেছি সেভাবে? নিজের দেশের এত বড় রত্নদের আমরা কজনই বা চিনি?
সবার কথা বাদ দিলেও, সাবিনা ইয়াসমিনের মত একজন গায়িকার মূল্যায়নই বা আমরা কজন ঠিকভাবে করেছি?
সুমন যেখানে তাঁকে নিয়ে শ’খানেক গান বেঁধেছেন,
আমাদের দেশের ক’জন সুরকার তার যোগ্য সুর করতে পেরেছেন?

বাংলাদেশের দর্শকদের প্রশংসায় সবসময় পঞ্চমুখ ছিলেন সুমন-
এভাবেই বাংলাদেশকে ঋণী করেছেন কবীর সুমন প্রতিনিয়ত দিয়ে,
না, কোন পাবার আশায় নয়, এদেশকে ভালোবেসে, নিজের দেশ ভেবে।

আর আমরা তাকে কি দিয়েছি শুনবেন??
যে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের জন্য তিনি ৯টি শো প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে করে গিয়েছেন, সেই যাদুঘরের নাম ফলকে সুমন চাটুজ্যের নাম অত্যন্ত অবহেলার সাথে একটা কোণায় লিখা হয়েছে। আমি একবার গিয়েছিলাম সেই যাদুঘরে কিছুদিন আগে, তখন সুমনও ঢাকায় ছিলেন। সেই যাদুঘরের ঢুক্তেই হাতের বাম পাশে একটা বিশাল বোর্ড আছে, যাতে কৃতজ্ঞতা নিরূপণ করা হয়েছে যারা এই যাদুঘর প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন তাদের প্রতি।
খুব আশ্চর্যজনক ব্যাপার, যার তুলে দেয়া অর্থে এই যাদুঘর গড়ে উঠেছে, তার নামটা প্রায় শেষের দিকে।
প্রথমে অবাক হলেও, পরে বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম,
যাক বাবা,
অন্তত নাম তো লেখা হয়েছে!!
সুমন এখনো এদেশে এলে ছুটে যান সেই যাদুঘরে।

আলী যাকের ২০০৮ সালে রুটস পত্রিকায় “মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরঃ আত্মত্যাগের নিদর্শন” শীর্ষক একটি লেখা লেখেন, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নির্মাণে যাদের অবদান আছে সবার কথা স্মরণ করা হয়েছে।

তবে তিনি ভুলে গেছেন, কিংবা সযতনে এড়িয়ে গেছেন, অনেক বড় অবদান রাখা কিংবদন্তী সুমনের কথা। কোথাও একটিবারের জন্য তিনি তার নাম উল্লেখ করেননি।
২০০৮ সালেই সুমনের কয়েকজন ভক্ত, যাদের তিনি “ছেলে” বলে সম্বোধন করেন, সুমনকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন ঢাকায়। সেই অনুষ্ঠানের অনুমতির জন্য তারা ঘুরেছেন দ্বারে দ্বারে, কেউ একজন আসেননি তাদের সহায়তা করতে।
তবে মজার ঘটনা আরো বছর দুয়েক পরের, যখন ২০০৯-এ সুমনকে নিয়ে আবার অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়। যথারীতি নানা যুদ্ধ শেষে তারা অনুমতি পান, এবং ভেন্যু ঠিক হয় ঢাকা নাট্যশালার মঞ্চ।
সব ঠিকঠাক, পোস্টার, টিকেট সব ছাপানো হলো, সুমন আসছেন, কনসার্ট হবে ঢাকা নাট্যশালার মঞ্চে।
হঠাৎ বেঁকে বসলেন তথাকথিত কয়েকজন বুদ্ধিজীবি।
তারা বললেন, ভিনদেশী, ভালভাবে খেয়াল করুন পাঠক, “ভিনদেশী” কোন শিল্পীর অনুষ্ঠান এই মঞ্চে হতে পারবে না। ফলে বাধ্য হয়ে প্রোগ্রাম ঠিক আগের দিন শিফট করা হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে, যার অবস্থা এতই বেহাল যে, সুমনের মত শিল্পী কেনো, আমাদের মনির খানের মত কেউও সেখানে শো করতে চাইবেন না। ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হন আয়োজকরা।
কারা সেই বুদ্ধিজীবি শুনতে চাইবেন?
তারা তাদের মধ্যেই আছেন, যারা সেই ‘৯৬ আর ‘৯৮ এর কনসার্টের আয়োজক ছিলেন, যাদের নাম এসেছে সুমনের অনেক গানের লিরিকে। এমনকি যখন ফোন দেয়া হয় সেই কনসার্টের অন্যতম আয়োজক, তখনকার আওয়ামি লীগের প্রখ্যাত নেতা আসাদুজ্জামান নূরকে, তিনি ফোন পর্যন্ত ওঠানোর কষ্ট স্বীকার করেননি। (অথচ সেই নূরই গেলো বছর সুমনকে হাতে পায়ে ধরে রাজি করিয়েছেন, দেশ টিভির প্রোগ্রাম করতে। সুমনকে পাবলিক কনসার্ট-এর মিথ্যে বলে করিয়েছেন গ্রামীন ফোনের কর্পোরেট কনসার্ট। সুমন টূঁ শব্দটি করেন নি তখন। মানুষ এমন ও হয়।)
মামুনুর রশীদ বলেছেন, “সুমন এমন কোন শিল্পী নন,যার গান মানুষ টিকেট কেটে দেখবে”।
তাদের কাছে সুমন আজ “ভিনদেশি” শিল্পী, সেই ভিনদেশি শিল্পী যিনি একটি ভিনদেশের জন্য ভালোবেসে বিকিয়ে গেছেন নিজের সম্মান।


২০০৮ সালে ঢাকায় সুমন

২০০৮ সালে ঢাকায় সুমন সেই প্রোগ্রামের দিন যখন সুমনকে শুরুতে একজন দর্শক জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি কেনো এর বিরুদ্ধে কিছু বললেন না??”

সুমন কিছু বললেন না, দুটি গান গাইলেন, জবাব সকলেই পেয়ে গেলেন-
“এ তেমন গান নয়, যে গানে দুঃখ ভোলা যায়,
এ নয় সুখের গান, বৈঠকি সৌখিনতায়,
সাজানো দুঃখে সুখে এ গানের ঠাঁই নেই কোনো,
পরোয়া করি না যদি এ গান, না শোনে একজনও।
লিখি,সুরে বাঁধি, গাই, যা এখনো ভাবি মনে মনে-
প্রেমিক প্রেমিকা ছাড়া যেন কেউ এ গান না শোনে,
বন্ধুরা ছাড়া যেনো কেউ এ গান না শোনে”।

“স্মৃতিতে এখনো শুনি বঙ্গবন্ধুর আহবান,
পূবের আকাশ ছোঁয় শান্তিতে ভোরের আযান,
মুক্তিযুদ্ধ ডাকে আগামীর দিকে হেঁটে চলো,
এ যদি আমার দেশ না হয়, তো কার দেশ বলো??”

একেই বলে রুচি, একেই বলে বিবেক, একেই বলে ভদ্রতা। কিচ্ছু বলেননি সুমন, কিন্তু সব যেনো বলে ফেলেছেন।
আজকে ক্ষমা চাইছি আমি কবীর সুমনের কাছে, পুরো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে,
সেই সব অকৃতজ্ঞ মানুষের পক্ষ হতে,
মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের পক্ষ থেকে-
গানওলা, আপনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন, সবাই আপনার মত হতে পারে না,
কবীর সুমন পৃথিবীতে একজনই জন্মায়,
কিন্তু আমাদের মত মানুষ প্রতিদিন ঘরে ঘরে জন্মায়।

ক্ষমা চাইছি গানওলা .. ..

গানওলা ক্ষমা চাই {দ্বিতীয় পর্ব}

(আমি কোন এক অজানা কারণে,
নিতান্তই তার মহানুভবতার কারণে কবীর সুমনের খুব কাছাকাছি যাবার একটা সুযোগ পাই। কি কারণে যে তিনি আমার মত একটা বেরসিক, অযোগ্য, চ্যাংড়া ছেলেকে এতটা মাথায় তুলেছেন, তা এক উনিই জানেন। তবে আমিও বাঙালি, সু্যোগ পেয়ে একে একে চেষ্টা করেছি আমার অসংখ্য জিজ্ঞাসার জবাব জানার। তার মধ্যে একটা বিরাট জিজ্ঞাসা শুধু আমাকে নয়,আমার মত অসংখ্য সুমন ভক্তদের সহ্য করতে হয়, যদিও এটি আমাদের জিজ্ঞাসা নয়, তা হলো- “সুমন তার গানে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেন। কিন্তু সেই তিনি কেনো ধর্ম পরিবর্তন করলেন? তার কাছে কি তবে একটা সম্প্রদায় অধিক মূল্য পেলো?”
সুমনের সাথে আমি এবং সকলেরই কথা বলতে বেশ ভয় লাগে, অমন একজন মানুষের সামনে দাঁড়ানো কিছুটা সাহসিকতার বিষয় বটে। তবে সাহস করে তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করেই ফেলেছিলাম কথাটা। জবাবটা তাঁর ভাষাতেই সবার জন্য দিলাম)

I adopted the name Kabir Suman before Sabina and I got married. If the “marriage” had been a reason, then logically (but Bongs have a peculiar sense of ‘logic’) my adopted name should have beenSuman Yasmin!!! Isn’t that so?
I changed my name for entirely different reasons. But too many people love to think that it was because of our marriage that I changed my name. One should do well to remember that, many people convert to another religion for whatever reason but keep their original name intact. No one could have forced me to change my name. There is no law that could force me to do that. Sabina Yasmin didn’t even know on what day I would go to the court to submit the Affidavit. Only my mother knew it.
TO HELL WITH BONGS. SCREW THEM.

আমার নবীন বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ অনেক দিন আগে আমার লেখা একটি লিরিক আজও মনে রেখেছেন। আমি তার কিছু কিছু অংশ ভুলে গিয়েছি- “মাতৃদেবী ‘সংস্কৃতি’, আম্মা তুমি মুসলমান/সংস্কৃতির ধারকরা সব গম্ভীর মুখে হাঁটতে যান/উপনিষদ ‘সংস্কৃতি’ ,কোরাণ হলো মুসলমান/সংস্কৃতির ধারকরা সব শান্তি মিছিলে হাঁটতে যান”।
আরো আছে। আমার আর মনে নেই।

আমার নতুন নামটি কিন্তু ভারতের একটি বিশেষ কনটেক্সটে নেয়া। আমি ভারতের নাগরিক। আমার দেশের বহু বাজে দিক নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু এই দেশই আমায় আমার পুরোনো নাম পালটে নতুন একটি নাম একেবারে আইনত গ্রহণ করার ও ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন। অনেক মানুষ তা মেনে নিয়েছেন। এজন্য আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। ভারতীয় জনতা পার্টি ও আরএসএস এর শত আস্ফালন স্বত্বেও ভারতের জনগণ কিন্তু কোন থিয়োক্র্যাটিক দলের হাতে তাঁর দেশের শাসনভার তুলে দেননি, দেবেনও না। এদেশের অনেক খারাপ দিক স্বত্বেও হিন্দু বা মুসলিম মৌলবাদ এদেশে বেশিদিন হালে পানি পাবে না। আমাদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মত সেকুলার আর্ট ফরম আর দুটি নেই। ধর্মপ্রাণ মুসলিম গায়ক গায়িকারা আজো “শ্রী” রাগে গেয়ে থাকেন বিখ্যাত বন্দিশঃ
‘হরিকে চরণ কমল’।
তেমনি ধর্মপ্রাণ হিন্দু গায়ক গায়িকারা আজো গেয়ে চলেছেন “মিঙ্গা মল্লার” রাগে নন্দিত বন্দিশঃ
‘করিম নাম তেরো’।
বিচিত্র আমরা !
স্নেহের ইশতিয়াক, “মাতৃদেবী ‘সংস্কৃতি’, আম্মা তুমি মুসলমান/ চাটুজ্জ্যেটা সংস্কৃতি, কবীর হলে মুসলমান”— দ্যাখো যদি কবীর সুমন নামক মুসলমান না হতাম, তাহলে কোনদিন জানতেই পেতাম না আমার গানের আসল শ্রোতা কারা। হা হা হা।
তোমার প্রশ্নের সহজ উত্তর- আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই। আমার কাছে ভালো মনে হয়েছে,তাই। আমি তো আর অন্য কাউকে তাঁর কিছু পাল্টাতে বলিনি। কী আশ্চর্য !
এবারে ভেবে দ্যাখো, যারা এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তারা কিন্তু আমার গান এমনিতেই ঐ “তোমাকে চাই”-র পর শোনেনি, শুনতোও না। অন্য কাউকে ছোট করতে পারলে আমরা বাঙ্গালিরা বেঁচে যাই। এবারে আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় ও নাম পাল্টানোয় (দুটোই আমার একান্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার), তারা একটা সুযোগ পেয়ে গেলো একজন বাঙালি সম্পর্কে খারাপ কথা বলার। এ আর রহমান ও(সঙ্গীতকার) ধর্মান্তরিত। তাই বলে কি দক্ষিণ ভারত বা ভারত বাংলাদেশের কেউ প্রশ্ন তোলেন? নাকি কেউ মনে করেন যে, তিনি তাঁর জন্মগত ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম বরণ করে নেয়ায় তাঁর সঙ্গীত খারাপ, তিনি মানুষটা খারাপ? অনেক হিন্দু ও মুসলমান “নামধারী” আমার কঠিনে ও কোমলে আক্রমণ করে বলেছেন, “আমি কিন্তু ধর্ম মানি না, আমার নাম ও পদবি যাইই হোক”।
আমি তাদের বলেছি, বলবো, “সে তো আমিও এখন বলতে পারি- আমি কোন সংগঠিত ধর্ম এখন আর মানি না, ঈশ্বর সম্পর্কেও আমি বিতৃষ্ণ”।
তাহলে? কি করবেন সকলে? আমাকে খুন করবেন? জেলে পুরবেন? যে যা পারেন বা চান করে নিন, তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে যায় রে বাবা!

নানান প্ল্যাটফর্মে যখন দেখি ধর্মান্ধ ফাশিস্টরা, বিশেষ করে স্পষ্টতই যারা মুসলিম বিদ্বেষী, তারা আমার সম্পর্কে কুৎসিততম গাল পাড়ে, তখন বলতে ইচ্ছে করে, “মুসলমান হিসেবে আমি গর্বিত”।
আমার এক পরম শ্রদ্ধেয় লেখক ও ভাবুক হুমায়ূন আজাদ, যাকে অতি ক্ষুদ্রমনা নিষ্ঠুর মানুষরা খুন করেছিলো, তাঁর একটি প্রবচনে বলেছিলেন, “বাঙালির আত্মার কথা ভাবলেই কেন জানি না আজকাল গণশৌচাগারের কথা মনে পড়ে”।

খুব ইন্টারেস্টিং কিন্তু। যেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেই মানুষ “সাম্প্রদায়িক” হয়ে যায়। হো হো হি হি। আমি আমার জীবনে এমন মানুষ ঢের বেশি দেখেছি যারা কোন না কোন ধর্মে বিশ্বাসী, অথচ সম্পূর্ণ “অসাম্প্রদায়িক”।
সেকুলার।
সেকুলার মানে নাস্তিকতা নয়। সেকুলারিজম মানে হলো, রাষ্ট্র পরিচালনায়, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে, ল, সরকারি ব্যাপার-স্যাপারে ধর্মের কোনো ভূমিকা না থাকা। বাড়িতে বা উপসানালয়ে যে যার ধর্ম পালন করুন। কিন্তু স্কুল কলেজে, রাস্তা ঘাটে, আপিস কাচারিতে, কলে কারখানায়, ক্ষেতে খামারে, আদালতে, বিচার বিবেচনায় কোন সংগঠিত ধর্মের ভূমিকা বা ধর্মে-ধর্মে বিভেদ থাকা চলবে না। এ জীবনে আমি এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা ধার্মিক, কিন্তু ১০০% সেকুলার। আবার এমন অনেক (বড্ড বেশি) “প্রগতিশীল” মায় “র্যাডিক্যাল” মানুষ দেখেছি, যারা গোপনে বা গায়ের চামড়ার ঠিক নিচে ধর্মান্ধ, পরধর্মমত-অসহিষ্ণু, অ-সেকুলার।
প্রফেসর নম চমস্কি আমায় বলেছিলেন, “মার্ক্সবাদ” ধর্ম গোছের। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা অনেকটা সেটাই বলে। আমার পদবি ছিলো “চট্টোপাধ্যায়”।
খাঁটি বর্ণহিন্দু ব্রাক্ষণ। ঐ পদবি নিয়ে আমি কিন্তু অনেকের ধারণায় “সেকুলার” ছিলাম। আমার নাম যখন হলো কবীর সুমন, তখন অসংখ্য মানুষের কাছে আমি হয়ে গেলাম অ-সেকুলার। কি চমৎকার না? অথচ আমার এই ভারতীয় রাষ্ট্র অনুমোদিত নামে কিন্তু কোন বিশেষ ধর্মের চিহ্ন নেই। আইনত, একেবারে ১০০% আইনত, ২০০০ সাল থেকে “সুমন”(আমার বাবা মায়ের দেয়া নামটি) আমার SURNAME, পদবি।

ইশতিয়াক,মধ্যযুগে শেখ কবীর নামে একজন বৈষ্ণব পদকর্তা ছিলেন। আমাদের দেশে শেখ কবীর নামে একজন অসামান্য হেঁ হেঁ SONG WRITER ছিলেন। যিনি না মুসলমান,না হিন্দু (টিপিক্যাল অর্থে)।
তাঁর দোঁহা পড়লেই বুঝবে কেমন মন ছিলো তাঁর। ঘাবড়ে যেও না স্নেহের ইশতিয়াক। আমি আমার জীবনে কিছু বাস্তব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে চেষ্টা করলাম কত ধানে কত চাল। এই বাস্তব টেস্ট গুলো না করলে অনেককিছু জানতে পেতাম না আমাদের জাতি সম্পর্কে।

কাজী নজরুল ইসলাম তো “খোদার প্রেমে সরাব পিয়ে, বেঁহুশ হয়ে রই প’ড়ে হায়”-এর মত গানও লিখেছিলেন, সুর করেছিলেন। দারুণ সুরেলা, ছন্দময়, কাব্যময় গান। ঐ গানের ছোট ছোট কাজ আর ফুটিয়ে তুলতে পারবো না। আমার যে ধরনের গলা তাতে একটি বয়েসের পর আরোহণের তান করার ক্ষমতা চলে যায়, যদি না সেই প্রবীণ গায়ক খেয়াল গাওয়ার অভ্যেসটা বজায় রাখেন একটানা। সর্বকালের এক সেরা কণ্ঠশিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর ও একই হাল হয়েছিলো। সূক্ষ্ম কাজগুলো করার ক্ষমতাও হাইয়ে যায়, অসহায় লাগে। গলার এই অবস্থা না হলে আমি কাজী নজরুল ইসলামের ঐ গানটি রেকর্ড করতাম।
আমাএ স্নেহভাজনরা খেয়াল করে দেখো, একবগগা যেকোন মতবাদের কট্টরপন্থীরা কিরকম বেরসিক হন। তাঁদের মাথাগুলি হয় নিরেট। তাঁদের দেখে, তাঁদের মতামত জেনে, তাঁদের কথা শুনে মনে হয় তাঁরা যে যে মতে বিশ্বাস করেন, সেই “মতের” ঈশ্বররা তাঁদের বেরসিক, বধির ও অন্ধ করেই সৃষ্টি করেছেন। আমাদের দেশে সিপিআইএম দল যেমন একসময় তাদের ব্যানারে লিখতেন-“মার্ক্সবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা সত্য”- এই “ইহা”টিতেই আর “সত্য” কথাটিতেই গোলমাল। ঠিক একই ভঙ্গিতে, একই ভাবে, একই উদ্দেশ্যে ধর্মান্ধরা লেখেন বা ভাবেনঃ “অমুক ধর্ম সর্বশক্তিমান, কারণ উহা সত্য”।
স্বাভাবিক রসবোধের বিন্দুমাত্র যদি থাকে তবে এমন কথা কেউ বলতে পারে না। বলতে গেলেই হাসি পাবে। একই লজিকে তো বলা যায়,”খিদে সর্বশক্তিমান, কারণ উহা সত্য”,”ঘুম সর্বশক্তিমান, কারণ উহা সত্য”,”মলমূত্র সর্বশক্তিমান, কারণ উহারা বড়ই সত্য”।
আমাদের দেশগুলিতে অনেক ক্ষেত্রেই ঘুষ সর্বশক্তিমান, কারণ উহা/ইহা সত্য।
কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, “কালো মেঘের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন”।
কবি জসীম উদদীন লিখেছেন, “ঐ শুনি কদম্ব তলে বংশী বাজায় কে”।
এক ভয়ানক খারাপ লোক তার এক গানে লিখেছিল, “রামপ্রসাদের ভিটের কাছে/আমার গীটার স্বপ্নে নাচে/ বল মা তারা দাঁড়াই কোথা’র তালে, অল্প সুরে বাঁধলো লোকটা/আমার ভালোবাসার চোখটা/খেলার ছলেই টানলো বয়েসকালে”। এই লোকটাই(যাচ্ছেতাই খারাপ, চরিত্রহীন) লিখতে পারে, গাইতে পারে, “খোদার কসম জান, আমি ভালোবেসেছি তোমায়”।
বেরসিক, গুন্ডা, অশিক্ষিত, অসংস্কৃতদের দল হল্লা করে যাক আপনমনে, গানের নৌকা রসেবেশে চলবে ঠিক, তোমাদের মত মাঝি মাল্লারা যদি থাকেন, আর তোমাদের মত যাত্রীরাও।

দু’বছর হলো আমাদের বাড়িতে আমার নবীন বন্ধুরা সরস্বতী পূজা করছেন। আমরা সকলেই তাতে অংশ নিয়ে থাকি। আমার বাবা-মা’র জীবদ্দশায়, যাঁরা তাঁদের “চট্টোপাধ্যায়” পদবিটা কখনো ত্যাগ করেননি, কখনো কিন্তু সরস্বতী পূজা হয়নি। আমার নবীন বন্ধুরাই অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছেন। এক ছোট্ট দেবী প্রতিমার কাছেই তারা রাখেন ওস্তাদ আমীর খাঁন, অস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁন এবং এমনকি আমার বাবা-মায়ের ছবিও। পূজয় যাঁরা অংশ নেন, তাঁদের ফুলগুলি কিন্তু শুধু দেবীপ্রতিমায় নয়, ঐ ছবিগুলিতে গিয়েও পড়ে।
এই খবরটি দেয়ার জন্য কি কোন মৌলবাদী (তিনি যে ধর্মেরই হোন), কিংবা সুমন চট্টোপাধ্যায় কেনো মুসলমান হল বলে রেগে যাওয়া বাদী (যারা,আমার মতে ঘোষিত মৌলবাদীর চেয়েও বেশি ভয়ানক) আমার বাড়িটা আক্রমণ করবেন, বা আমায় খুন করবেন? আমার মনে হয় না।

হাসাহাসি করলে কেমন হয়? আমার এখন প্রায় সবকিছুতেই হাসি পায়, তারপর পায় ঘুম। স্নেহের ইশতিয়াক, সবকিছুকে অত সিরিয়াসলি নিয়ো না। আমার এক গুরু, পি.জি.উডহাউস বলে গিয়েছেন,”জীবনটাকে বেশি সিরিয়াসলি নিয়ো না”।
যে যা চাইছে বলে নিক। ভুলে যেও না, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত প্রতিভাবান, সৃজনশীল মানুষ রবীন্দ্রনাথকে ভেঙিয়ে “আনন্দ বিদায়” নামে একটি নাটক রচনা করেছিলেন বলে এক পন্ডিতের কাছে শুনেছিলাম। তাতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষাকে ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে লিখেছিলেন, “মম অঞ্চল দড়ি বন্ধন গরু গোয়ালেতে ফিরে এসো হে”।
আমি নিজে পড়ে দেখিনি, এক সত্যিকার পন্ডিতের কাছে শুনেছিলাম। মনে রেখে দিয়েছি। এই কাজ বাঙালিই পারে। অথবা এইভাবেও বলা যায়- বাঙালি এই কাজটাও পারে।

আমার সুমনঃ গোপনীয়তার নেই মালিকানা

সকালেই তামান্না আপুর ফোন পেলাম। বেচারি একদিনের জন্য ঢাকা থেকে উড়ে এসেছেন সুমনের অনুষ্ঠান দেখার জন্য। কথা ঠিক হলো, ওনার সাথে ৫টার সময় আমার রোটারি সদনের সামনে, ঠিক যেখানে শো, সেখানে দেখা হবে। সারাটাদিনই বেশ উত্তেজনা মধ্যে গেলো, এটা আমার দেখতে যাওয়া সুমনের ৩য় অনুষ্ঠান।
আমি ৩.৫০ এর দিকে গোসল করছিলাম, তামান্না আপুর ফোন। “তুমি বেরোচ্ছো না?”
আমি একটু অবাক হলাম, এত আগে তার ফোন করা দেখে, তবুও ভাবলাম নিশ্চয়ই কোন ঘটনা আছে, তাই তাড়াতড়ি চলে গেলাম। গিয়ে দেখি উনি একাই বসে আছে, কথা বলে জানা গেলো, বেচারি কলকাতায় নেমে ঘড়ির কাঁটা আধা ঘন্টা পিছিয়ে দেবার বদলে এগিয়ে দিয়েছেন। তাই তার ঘড়িতে তখন ঠিকই ৫টা বাজছিলো।
কে জানতো, ওটাই যে শাপে বর হবে !!

১৫ মিনিট মত গল্প করতেই দেখি গেটের সামনে একটা বড় গাড়ি এসে থামল। নামলেন গাড়ি থেকে সুমন কাকু। তাঁকে দেখেই হার্ট বীট প্রতিবারের মত বেড়ে গেলো, সাথে নার্ভাসনেসের কারণে ঘাম দিতে লাগলো। সকলকে প্রণাম জানিয়ে উনি গেটের ভিতরে আসতেই চোখ পড়লো আমাদের দুইজনের দিকে।
– “আরি বাবা, এরা কারা?” বলে আমাদের দুইজনকে জড়িয়ে ধরলেন, তার মুখে সামনাসামনি সেই প্রথম আমার নাম শুনলাম।
“তোমরা এত দূর থেকে এসেছো, কি বলবো? আমার ভাবতেই কেমন লাগছে”।
বলতে বলতেই আমাদের দুজনের কাঁধে হাত দিয়ে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। আমরা তাঁর সাথে আলাদা দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় বললেন, “তামান্নার তো কালকে ফ্লাইট, তোমরা সকাল সাড়ে ৯টায় আমার বাড়িতে আসতে পারবে?”
আমি বেকুবের মত মুখ করে বলে ফেললাম, “আপনি বললে আমি এখনি গিয়ে বসে থাকবো, আপনি ঘুম থেকে উঠলে তারপর ঢুকবো”।
উনি হেসে দিলেন, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তামান্নাকে বললেন, “এ তো আমার সবচে ভালো ছেলে রে”। তারপর আমাদের ঠিকানা বুঝিয়ে দিলেন, বলে দিলেন দুইজন মিলে মনে রাখতে।
উনি ভেতরে চলে গেলেন, আমি ঘোরটা একটু কাটিয়ে ওঠার সময় নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলের পাশেই বসানো স্টল থেকে তাঁর সব বই কিনে নিলাম। অনুষ্ঠানস্থলেই দেখা হলো চেহারায় অপরিচিত, কিন্তু ফেসবুকের সূত্রে আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ অনেকের সঙ্গে- মিঠু দিদি, বিদায় পরিচিতা, মনীষা, সৌরভ, অভিজিৎ দা, দ্রুপদ, সুমন্ত দা অনেকের সাথে। তবে সবচেয়ে আকাঙ্খিত মিলন ঘটে শুভদীপ আর সায়ন্তনি দি’র সাথে।
লাইনে দাঁড়ানোর পর ঢুকলাম অডিটোরিয়ামে। ১৫ মিনিট মত বসার পর সেই ছোট্ট অডিটোরিয়ামের মঞ্ছে আসলেন দ্য লিভিং লিজেন্ড কবীর সুমন। শুরু করলেন “দশ ফুট বাই দশ ফুট” দিয়ে।
তারপর গাইলেন-
“বাংলার ধনুকের ছিলায় ছিলায় যত টান,
তীরের ফলায় তবু বিষ নয় লালনের গান।
সে গানে বিদ্ধ বুক, রক্তে অশ্রু ছলো ছলো,
এ যদি আমার দেশ না হয়, তো কার দেশ বলো?” এরপর গীটার বাজাতে বাজাতেই বললেন, “আমি এতটাই ভাগ্যবান যে এই অনুষ্ঠান শুনতে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৩জন এসেছেন এখানে, আমি প্রাণপণে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চেয়েছিলাম, এখনো চাই”। কবীর সুমন, আপনি বোধহয় জানেন না, এরকম একটা অনুষ্ঠান দেখা আমাদের কাছে কত জনমের ভাগ্যের ব্যাপার।
আরো দু’একটি গান গাইলেন, এর মাঝে ব্যাক স্টেজে কে জানি কথা বলছিলো। সুমনের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে, তিনি মাইকে আয়োজকদের উদ্দেশ্যে বললেন, “Tell those motherfuckers to stop, otherwise I will leave the stage now. আমার কোন দায় পড়েনি”।
ভয় পেয়ে গেলাম, সুমনকে যতটুকু জানি, বুঝতে পারছিলাম, এখন আর আগের নিয়মে অনুষ্ঠান চলবে না। তা-ই হলো, উনি গান বাজনার দিকে আর গেলেন না। পরবর্তী আড়াই ঘন্টা উনি বাংলা গানের আদ্যান্ত বুঝিয়ে দিলেন, সাথী বুঝিয়ে দিলেন “তোমাকে চাই” কোন একক কৃতিত্ব নয়, এটা বাংলা গানের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ধারার নিয়মেই এসেছে।
যদিও অধিকাংশ কথাই আমার মাথার এক হাত উপর দিয়ে যাচ্ছিলো, তবে মানুষটার বিনয় দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম। একটা মানুষের এতটা জ্ঞানগত উৎকর্ষ কিভাবে থাকতে পাররে, তা ভেবে বারবার মুখটা হা হয়ে যাচ্ছিল আপনা-আপনিই।
অতিথিদের মাঝে ছিলেন শ্রীকান্ত আচারয্য, এবং ইদানিং গান গেয়ে নাম করা অনুপম। শ্রীকান্ত গোগ্রাসে গিলছিলেন, কারণ তার সারা জীবনের শিক্ষা হয়ত মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছিলো এই মানুষটার কাছে। আর অনুপম বেচারার জন্য খারাপই লাগছিলো, স্পষ্টত ঐ বেচারারও অন্তত মাথার আধা হাত উপর দিয়ে যাচ্ছিলো সব। সুমন তাকে আর শ্রীকান্তকে উদ্দেশ্য করে অনেক কথা বলেছেন, যা হতে স্পষ্ট হচ্ছিলো আমাদের তথাকথিত গায়কদের দুর্দশা।
উনি বলছিলেন, গানের মাধ্যমে ইনফরমেশান দেয়ার কথা। যেমন,
“জাগরণে যাই বিভাবরী, আঁখি হতে ঘুম নিলো হরি”, এরপর “মরি মরি” অংশটুকু না থাকলে কি হত?
ঐ অংশটুকুই ইনফরমেশান, যা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মানুষ থেকে মানুষে।
হঠাৎ বলে উঠলেন, “যেমন, হতে পারে এই ইনফরমেশান ঐখানে যে তামান্না শুনছে, বা ঐখানে যে ওর পাশে ইশতিয়াক শুনছে ওর জন্য”।
মাঝে মাঝে নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় !

শেষে শ্রীকান্তর অনুরোধে সুমন গাইলেন-“আজি যে রজনী যায়, ফিরাইবো তা কেমনে”।
সাথে গাওয়া ধরলেন এরপর সেই “তোমাকে চাই”।
সে এক অদ্ভুত দৃশ্য, অডিটোরিয়াম ভর্তি মানুষ গাইছেন একসাথে। সকলে গলা ফাটিয়ে গাইছেন “তোমাকে চাই”।

আহারে, অনেকের সাথে আমারো চোখ ভিজে আসছিলো। এই একটা মানুষ যদি চলে যান, তাহলে বাংলা গান নিয়ে এমন মাতাল করে দেয়ার মত তো আর কেউ থাকবেন না। অভিভাবকহীন সমাজ আমাদের আরো এতিম হয়ে যাবে, অনেক বেশি দুর্বল হয়ে যাবে, যা পূরণ করার মত ক্ষমতা আর কারো নেই, স্বয়ং ঈশ্বরেরও না।

আমার সুমনঃ বৈষ্ণবঘাটা বাই লেইন

ভোর ৪টাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল, কোন কারণ ছাড়াই। এপাশ ওপাশ করে অনেক চেষ্টা করলাম ঘুমানোর, আর আসলো নাকোনভাবেই। কোনভাবে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সময় কাটিয়েই রেডি হয়ে দৌড় দিলাম তামান্না আপুর হোটেলের দিকে। নাস্তা করে ট্যাক্সিতে উঠলাম, গন্তব্য ১৯জি, বৈষ্ণবঘাটা বাই লেইন। আমাদের স্বপ্নের ঠিকানা।

গড়িয়া পদ্মশ্রী সিনেমা হলের সামনে পর্যন্ত ট্যাক্সি ঠিক করলাম, পথিমধ্যে কবীর সুমন ফোন করে খোঁজ নিলেন আমরা আসতে পারছি কি না। নেমে একটা রিকশাতে উঠে বললাম, “এমপি সাহাব কা ঘার চালিয়ে”।
যেতে যেতে মনে হচ্ছিলো, এটা যেন কলকাতার ভেতর আরেক শহর। অনেক পরিস্কার, নিরিবিলি, শান্ত। গানওলার জন্যই বোধহয়। মিনিট দশেক পরই সামনে দেখা গেলো সাইনবোর্ড-“১৯/জি, বৈষ্ণবঘাটা বাই লেইন”।
ঢিপ ঢিপ শুরু হলো বুকের ভেতর।
দরজার সামনেই কে যেন হাতে লিখে টেপ দিয়ে সাঁটিয়ে দিয়েছে “কবীর সুমন”।
দরজা খুলে দিলেন এক হাসিমুখী মহিলা, দোতলায় উঠতেই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেই লোকটা- কবীর সুমন।
জড়িয়ে ধরলেন, আমি প্রণাম জানালাম পা ছুঁয়ে। ভেতরে বসতে দিলেন তাঁর লিভিং রুমে, যেখানে রয়েছে তার অসংখ্য বই পত্র, তাঁর সেই বিখ্যাত দুটি গীটার, যার একটি পীট সীগার তাঁকে দিয়েছিলেন, রয়েছে তাঁর পিয়ানো। এই সেই রুম, যা কখনো না দেখেও আমরা সুপরিচিত। মাটিতে বসে পড়লাম।
কাকুর মাটিতে বসা নিষেধ, তারপরও আমাদের বারণ না শুনে বসে পড়লেন। এত যে অসুস্থ মানুষটা বুঝতাম না দূর থেকে। কাঁপা কাঁপা হাতে বসতে, কিংবা বসা থেকে দাঁড়াতে রীতিমত সংগ্রাম করতে হয়। লোকটা এই স্বাস্থ্য নিয়ে প্রোগ্রাম করে যান ভাবতে গা শিউরে ওঠে। কথা বলতেও কেমন কষ্ট হচ্ছিলো তাঁর। আমার চোখে পানি চলে এসেছিলো, পাশে আপুর চোখও দেখি টলটল।
সুমন যদি জানতেন, তাঁর ছেলে মেয়েরা তাঁর জন্য কত ভালবাসা বয়ে নিয়ে বেড়ান!
কত কথা ছিলো তাঁর সাথে। সামনে গিয়ে আর কিছু মাথায় নেই, শুধু হা করে গিলতে হচ্ছিলো। তামান্না আপুর স্কেল শিফটিঙ্গের সমস্যার সমাধানে দেখালেন রেওয়াজ করার পদ্ধতি। আমার মুখ হা হয়ে গেলো তাঁর নিচের স্কেলে গাওয়ার ক্ষমতা দেখে। কোন আদম সন্তানের পক্ষে এত নীচে এত পরিষ্কারভাবে গাওয়া সম্ভব আজ জানলাম। কিছু বলার ছিলো না আমার, শুধু দেখছিলাম এই একটা মানুষের ক্ষমতা। তাঁর তুলনা আমি খুঁজি না কখনো বহু ব্যবহার করা কোন উপমায় !
এ কথা, সে কথার মাঝে তাঁর খাওয়ার সময় হলো। আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, কি খাবো?
আমি বেকুবের মত বলে দিলাম, কিছু খাবো না। তামান্না আপু পরক্ষণে বললেন, “গাধা, কোন জায়গায় খাচ্ছো ভেবে দেখো!”।
আমি জিভ কেটে বললাম,
খাবো।
তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা জানালেন। কার্ডিয়াক মায়োপ্যাথি আর পারকিনসন ডিজিস এর ফাঁদে এতটা ভেঙ্গে পড়েছেন এই কিংবদন্তী। মানসিকভাবে কতটা চাঙা থাকলে এই অবস্থায় একটা মানুষ ওদিনের মত অনুষ্ঠান করতে পারেন, চিন্তার বিষয়।
বলতে খুব খারাপ লাগছিলো, কিন্তু ওঁনাকে বলে ফেললাম আমার, বিপ্লব দা আর আমার স্বপ্নের “সুমনের মেলা”-র কথা, যা আমরা চট্টগ্রামে আয়োজন করতে চাই প্রতি বছর। প্রথম বছর সুমনকে সশরীরে চাওয়ার আকাঙ্খা ব্যক্ত করলাম। কাকু আফসোস করেই বললেন,
“জানো, আমি ৯৬ এ গিয়েছিলাম একবার। কেউ আমাকে একটা বার বলেনি, যে আপনাকে বান্দরবান দেখিয়ে আনি”।
বাঙালিকে মনে মনে খিস্তি করে বললাম, “কাকু, আপনার অনেক ছেলেমেয়ে ওখানে, আসুন একবার, আমরা কক্সবাজার যাবো সবাই মিলে। আপনি তো কোথাও বেড়াতে যান না অনেকদিন, তারপর যদি আপনার ইচ্ছে হয় গান বাজনা করবেন, না হলে করবেন না”।
উনি নিমরাজি হলেন, জানালেন শরীর ভালো হলে খানিকটা, একবার যাবেন। এই কথা সে কথার মাঝে আপুর ফ্লাইটের সময় হয়ে এলো। এর মাঝে ঘটলো সবচে অবাক করা ঘটনা, সুমন গাড়ি বার করতে বললেন, আপুকে এয়ারপোর্ট আর আমাকে মারকুইস স্ট্রীট ছাড়বেন বলে।
মানুষ এমনও হয় আসলে, এই শরীর নিয়ে কোথাকার কার জন্য এতটা কষ্ট স্বীকার করতে সবাই পারেন না, কবীর সুমনই পারেন। কোন নিষেধই শুনলেন না, একটাই কথা-
“কাকু বলেছো, আবার এত কথা কিসের?”

সুমন রেডি হতে হতেই আমরা তার বইতে অটোগ্রাফ নিলাম, ছবি তুললাম। আমার এক পাঞ্জাবিতে লিখে দিলেন “জয় বাংলা”। আহা, মানুষটার বাংলাদেশ প্রেম আরেকবার চোখে জল এনে দিলো।

আমার সাথে ছবি তোলার সময় বলছিলেন, “আয়, বাপ ছেলে একসাথে ছবি তুলি”।
মেঘ না চাইতে বৃষ্টি শুনেছি, এটা যেন মেঘ না চাইতে সুনামি হচ্ছিলো।

গাড়িতে এয়ারপোর্ট লম্বা রাস্তা, যেতে যেতে শুনছিলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা ওঁনার মুখে। একজন সাংবাদিক হিসেবে ওনার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অভিজ্ঞতা আর আগ্রহের ভান্ডার বাংলাদেশের যে কারো চেয়ে অনেক বেশি। বলছিলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সারল্যের কথা। বলছিলেন বঙ্গবন্ধুর কথা, কতটা বড় ব্যক্তিত্ব ছিলো তাঁর। একটি কাহিনী বললেন, যেটা হয়তো অনেকেই জানেন না। আমি সবার জন্য শেয়ার করছি।
একবার স্বাধীনতার পর বুলগেরিয়ার রাষ্ট্রপতি এলেন বাংলাদেশে। তখন মাহমুদুল্লাহ সাহেব প্রেসিডেন্ট, আর বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রটকল মতে আগে প্রেসিডেন্ট গড়িতে উঠবেন, তারপর প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু মাহমুদুল্লাহ কোনভাবেই উঠবেন না আগে, শেখ সাহেবের পরই তিনি উঠবেন। অনেক বোঝানোর পরও উঠলেন না তিনি।
ওদিকে তার জন্য অতিথিরা দাঁড়িয়ে আছেন, সব টাইমিং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যখন শেখ সাহেবের কানে খবর পৌঁছুল, উনি তাড়াতাড়ি এলেন। এসে মাহমুদুল্লাহকে বললেন, আগে উঠতে। প্রেসিডেন্ট সাহেব মিনমিন করে বললেন, “ আপনি ছাড়া কিভাবে উঠি?”

শেখ সাহেব খেঁকিয়ে উঠে বললেন, “মাহমুদউল্লাহ, গাড়িতে ওঠ”।
ভয়ে লাফ দিয়ে উঠে গেলেন মাহমুদউল্লাহ।
আহা, এ কোন ত্রাসের কাহিনী নয়, এ শ্রদ্ধার কাহিনী, শেখ সাহেবের ব্যাক্তিত্বের কাহিনী, বাঙালির মিষ্টি স্বভাবের কাহিনী।
কাকু বললেন পাক হানাদারদের ভয়াবহ অত্যাচারের কাহিনী। বললেন,
এক লক্ষ নার্সের বাংলাদেশের ঐ সময়ে আসার কাহিনী, যারা এসেছিলেন শুধু গর্ভপাত ঘটানোর জন্য। এতটাই ভয়াবহ অত্যাচার ছিলো তাদের।
বললেন খালেদ মোশাররফের কাহিনী, যিনি বায়তুল মোকাররমের সামনে খোন্দকার মোশতাকের মত ধর্মান্ধ নেতার পাছায় একের পর এক হিন্দু সেপাই দিয়ে লাথি মারিয়েছিলেন। শুধু নিচ্ছিলাম আমি, শুধু নিচ্ছিলাম আর বিস্মিত হচ্ছিলাম, বাংলাদেশের প্রতি তাঁর আবেগ দেখে। অনুরোধ করলাম তাঁকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি গান লেখার জন্য।

মারকুইস স্ট্রীটে আসতে আসতে আরো অনেক কাহিনী শোনা হয়ে গেলো। নিজামের কাবাবের কথা বললেন।
আমার হোটেলের নিচে এসে তানিশার জন্য সিম কিনতে উনি এক দোকানে বসলেন। জোর করে বলাতে একটা কোল্ড ড্রিংক খেতে রাজি হলেন। জীবনটা সার্থক হয়ে গেলো নিজের টাকা দিয়ে কবীর সুমনকে কিছু খাওয়াতে পেরে।

বিদায় নেবার সময় বারবার বললেন, ওনার বাসায় থাকার জন্য একদিন। এত সুখ কপালে সইবে না, তাই এড়িয়েই গেলাম, ওনার পারসোনাল মোবাইল নাম্বার দিয়ে বলে দিলেন, কোন বিপদ হলেই ফোন করতে।
আবার বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিলেন গানওলা।

সবচে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমি তাঁর গাড়িতে ওঠার পর থেকে নামা পর্যন্ত একটাবারও আমার মনে হয়নি, আমি “কবীর সুমন”-এর পাশে বসে আছে, তাঁর গাড়িতে করে যাচ্ছি, তাঁর সাথে পাশে বসে গায়ে হাত দিয়ে কথা বলছি,উনি আমাকে কাহিনী শোনাচ্ছেন। কবীর সুমন আমার কাছে কতটা ভগবানের জায়গায়, তা পাঠক মাত্ররই জানেন। সেই মানুষটার সাথে আমি এভাবে সময় কাটানোর সময় আমার মানসিক অবস্থা ছিলো এই যে, আমি আমার বাবার সাথে ঘুরছি, এ তো এমন কেউ নয়, সাধারণ মানুষ। আমার ঘরের মানুষ। প্রতিদিনই থাকবে।
মানুষকে আপন করে নেবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা খোদা এই লোকটাকে দিয়েছেন।

রুপম ইসলাম আমাকে বলেছিলেন, “কবীর সুমনকে আমি ভগবানের জায়গায় রেখে দিয়েছি। তাঁর খুব কাছে যাবার চেষ্টা আমি করিনি, আমার ভয় হয়”।
আপনি ভুল করেছেন মনে হয় দাদা,
ভগবান কিভাবে মর্ত্যে নেমে আসে, তা সেই লোকটার কাছে গেলেই হয়ত বুঝতে পারা যায় !

~ইশতিয়াক ইসলাম খাঁন

কিছু হাত দুই হাত ধরবেই তুমি তোমার মাটিতে দাঁড়ালে…

ভাবতে ভালো লাগে, এই নষ্ট পৃথিবীতে এমন একজন আছেন যিনি গান বাঁধেন আমাদের জন্য, যেন এ যুগের লালন। নাগরিক জীবনের অসামঞ্জস্যতার বিরুদ্ধেই যেন তাঁর সুরের অবিরাম সংগ্রাম। ১৩ বছরের রিক্সাচালক থেকে মাওবাদী গেরিলা, সকল অধিকার বঞ্ছিত মানুষের পাশে আছে সুমনের গান। অথচ এই মানুষটা রাষ্ট্রীয় ভাবে (এপার বাংলা অথবা ওপার বাংলায়) তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকুর কতখানি পেয়েছেন ? সত্যি বলতে তাঁর মেধা, শ্রম বা প্রতিবাদ মূল্যায়ন করার মত যোগ্যতা, মর্যাদাবোধ বা মগজ বাংলা ভাষাভাষী ক’জন মানুষের মধ্যে আছে, আমি সন্দিহান।

বাংলা ভাষা বা বাংলাদেশের জন্যও কি তাঁর অবদান কম আছে ? “একুশে ফেব্রুয়ারী”, “কার দেশ”, “সুফিয়া কামাল”, “বেগম রোকেয়া”, “ঢাকা”, শাহবাগ কেন্দ্রিক গন আন্দোলন নিয়ে কিছু গান, “আলতাফ মাহমুদ”, এমন এ মুহূর্তে মনে না পড়া অজস্র গান গেয়ে গেছেন এই ভূখণ্ডের জন্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নির্মাণের সময় সুমনের অবদানের কথা অনেকেরই জানা। অথচ যাদের অবদানে আজকের এই যাদুঘর, তাদের যখন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়, তখন সেখানেও সুমনের নামটা অজানা কারনে বাদ পরে যায় !!! এ ব্যাপারে সাবিনা ইয়াসমিনকে পাঠানো সুমনের একটি খোলা চিঠি পড়ে মর্মাহত হই। ওপার বাংলাতেও একই অবস্থা। তাঁকে প্রাপ্য মর্যাদা তো দেওয়াই হয় নি, বরং সেখানকার “দিদি তন্ত্রের” নোংরা ভাইয়েরা তাঁকে জড়িয়ে নিয়মিত কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করে।

দেশপ্রেম নিয়ে আমার বিশ্বাসে কিছু ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু সুমনের কিছু গান এই ভেদাভেদ (এপার বাংলা/অপার বাংলা) ভুলে পুরো বঙ্গ ভূখণ্ডকেই ভালবাসতে শিখিয়েছে। ব্যাক্তিগত বিশ্বাস থেকে ঈশ্বরে বিশ্বাসী না হওয়ায় স্বভাবতই জীবনের চরম দুঃসময় গুলোতে প্রার্থনা করার মত কোন ঈশ্বর ছিল না। এমন মুহূর্ত গুলোতে ভাঙ্গে পড়তাম যদি সুমনের কিছু গান মন্ত্রের মত মাথায় না থাকতো। যেমন,

“তুমি দেখবে তুমি দেখবে ঐ দুটো হাত বাড়ালে,
কিছু হাত দুই হাত ধরবেই তুমি তোমার মাটিতে দাঁড়ালে”

অথবা “ ভগবান”, “শোন মৌলবাদের নাতি…”, “পাকস্থলীতে ইসলাম নেই, নেইতো হিন্দুয়ানী…”, এমন অজস্র গান বা গানের লাইন। তাঁর গানগুলো বেঁচে থাকার প্রেরনা, নিজের ভাবনার জগতে লড়ে যাওয়ার প্রেরনা…
সুমনকে শ্রদ্ধা জানাতে জানাতে এ দেশের খুন হওয়া প্রথা বিরোধী সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের কথা মনে পরে গেল। তিনি বলেছিলেন, “যে বুদ্ধিজীবী নিজের সময় ও সমাজ নিয়ে সন্তুষ্ট, সে গৃহপালিত পশু”।
কথাটা ভাবায় দারুন ভাবে। ব্যক্তিগত ভাবে আমি সুমনের গান যতটুকুই বুঝি তা থেকেই বলতে পারি, এমন গাঁদাগাঁদা বুদ্ধিজীবীদের ভিড়ে সুমনই পুরোপুরি মনুষ্যত্বের দিবিদার। চেতনায় তাঁকে লালন করি, তাঁর জন্য গহীনে অসম্ভব আবেগ জমা রাখি… গেয়ে যাই…

“শোন গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইন্স
আমি সংখ্যা লঘুর দলে,
আমি কবীরের সন্তান
যাকে কবীর সুমন বলে…”

~নাহিদ

নাগরিক কবিয়াল: শুভ জন্মদিন

কবীর সুমন। নাম শুনলেই কানে বাজে বাংলা গানের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা কিছু গান। প্রেম, জীবনবোধ কিংবা বাংলার গান— সবখানেই তার অবাধ পদচারণ। ‘তোমাকে চাই’, ‘নন্দীগ্রাম’, ‘গণদাবি’, ‘জাতিস্মর’, ‘বেগম রোকেয়া’, ‘ঘুমাও বাউণ্ডুলে’ গানগুলো শ্রোতাকে উজ্জীবিত করে এখনো। শুধু এ কয়টিই নয়, কালোত্তীর্ণ হয়ে আছে সুমনের প্রায় প্রতিটি মৌলিক গান। নিছক গান বলতে সুমনের অবশ্য কিছু নেই— আছে ইতিহাস, সত্য, ভালোবাসা ও মানুষের কথা। তাই গানের দোহাই দিয়ে সুমনকে কেবল গায়ক বলাটা হবে অন্যায়। দার্শনিক ও প্রকৃত মানুষ বলতে যা বোঝায়, সবই সুমনে গিয়ে একাকার। এ শিল্পী দর্শনের প্রকাশ ঘটান সুর আর গানে। যেমনটা ঘটাতেন লালন কিংবা শেখ কবীর। সুমনের প্রতিটি গানে উঠে এসেছে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, বোধ। তা প্রকাশ করেছেন বলিষ্ঠ কণ্ঠে, স্পষ্ট ভাষায়। এ শিল্পী গানের মাধ্যমে তুলে ধরেন ইতিহাস, স্বীকৃতি দেন সত্যের। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন গান আর সুরের মহাস্ত্র নিয়ে।

ছোটবেলা থেকেই গান শিখতেন। কিন্তু সবার সামনে নিজে গাইবার মতো মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। সময়ের সঙ্গে বুঝতে পারলেন, এ গানই হতে পারে তার প্রতিবাদের ভাষা, ভালোবাসার প্রকাশ। তাই প্রায় চল্লিশের কোটায় এসে হাত দেন গিটারে। সহজেই বহন করা যায় বলে এর প্রতি আকৃষ্ট হোন। উদ্দেশ্য ইচ্ছেমতো মাঠে-ঘাটে গান গাওয়া। খ্যাতি নয়, গণমানুষের কথা জানান দিতেই এ উদ্যোগ। খেটে খাওয়া মানুষকে গানের মায়াজালে মুক্তির আভাস দিতেই বেরিয়ে পড়েন গিটার হাতে; বাউল যেমন বেরিয়ে পড়েন একতারা হাতে। তাই সুমনকে আধুনিক বাউল বললে অত্যুক্তি হবে না।

মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাই তাকে বারবার নিয়ে আসে পথে। গণমানুষের প্রতি ভালোবাসা এত নিখাদ না হলে কেউ অবলীলায় লিখতে পারেন না, ‘রাস্তার ধারে রিক্সাওয়ালার স্নান/ তোমার জন্য লিখছি প্রেমের গান’ কিংবা ‘‘ভালোবাসা কেবল ‘আমি-তুমি’তেই সীমাবদ্ধ নয়, আরো বড়’’। অনবদ্য সব গানের মাধ্যমে সুমন প্রায় চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়েছেন তার প্রমাণ।

‘নাগরিক কবিয়াল’ নামেই নিজেকে পরিচয় দেন। পাশপাশি তিনি একনিষ্ঠ গুণমুগ্ধ বিশ্বের সব কালজয়ী মানুষ ও সঙ্গীতশিল্পীর। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া নির্যাতন, দাবি কিংবা অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া ঘটান কথা আর সুরের বলিষ্ঠতায়। খ্যাতি বা প্রচারণার মোহে নিজের সুরকে বিকিয়ে দেননি কোনো দিন। তার অমূল্য এ সম্পদ মহিমান্বিত করছে গোটা মানবসভ্যতাকে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ শতাব্দী গর্বিত কবীর সুমনের মতো সব্যসাচী এক কবি ও দার্শনিককে পেয়ে।

১৯৪৯ সালে জন্ম নেয়া জীবন্ত এ কিংবদন্তির জন্মদিন আজ। শুভেচ্ছা জানাই তার গানের মাধ্যমেই, ‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই/ নেই কোন দাবী-দাওয়া/ এই নশ্বর জীবনের মানে/ শুধু তোমাকে চাওয়া।’

~ জোহরা ঝুমু, তারিখ: ১৬-০৩-২০১৪

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress