ফুলমনি ইশরাত

দেখ ফুলমনি হাতে কারবাইন, কাঁধে রাইফেল ঝোলে
এ গান বাঁধছি, এনকাউন্টারে ধরা পরে গেলে বলে
ধরা পরে যায় দেহটাই শুধু ধরা পড়বে না মন
ধরা না পড়ার হাওয়ায় দুলছে সুদূরের শালবন
তোমার মতই ইশরাত জাহান আমার ছোট্ট বোন
তোমার মতই ইশরাত জাহান আমার ছোট্ট বোন।

দেখ ফুলমনি ইশরাত শুয়ে, এনকাউন্টারে মরা
তাঁর হাতে শুধু ছিল এ কে ফরটিসেভেন ধরা
ধরা পরে যায় দেহটাই শুধু ধরা পড়বে না মন
ধরা না পড়ার হাওয়ায় দুলছে সুদূরের শালবন
তোমার মতই ইশরাত জাহান আমার ছোট্ট বোন
তোমার মতই ইশরাত জাহান আমার ছোট্ট বোন।

দেখ ফুলমনি ভোরের কাগজে তোমার ছবিটা ছাপা
শান্ত নরম মুখের গভীরে বিদ্রোহ আছে চাঁপা
ভেতরে আগুন বাইরে আগুন গুজরাট হয়ে জ্বলে
বুকের আগুন বাঁচিয়ে রাখাকে সন্ত্রাসবাদ বলে।

শোন ফুলমনি তোমায় ছবিতে দেখে নীরবে কাঁদি
আমার কান্না আগুন জ্বালালে আমি সন্ত্রাসবাদী
দেখ ফুলমনি বাড়ছে বয়স, কোথায় কতটুকু সুখ
তোমার ছবিতে তুমি আমার মিছিলে সেই মুখ
তুমি কি শুনেছ সুভাষ কবিতা মেয়ে কবে গেলে বনে
চে গুয়েভারার গল্প আমার আবার পড়ছে মনে।
ধরা পরে যায় দেহটাই শুধু ধরা পড়বে না মন
ধরা না পড়ার হাওয়ায় দুলছে সুদূরের শালবন
তোমার মতই ইশরাত জাহান আমার ছোট্ট বোন
তোমার মতই ইশরাত জাহান আমার ছোট্ট বোন।

বল ফুলমনি সামান্য গান কতটুকুইবা পারে
চোর কাঁটাও তো হয়না এ গান তোমার পথের ধাঁরে
বিশ্বায়নের শেয়ার বাজারে বিক্রি হল দেশ
এ গান খানও বিক্রি হবে বাজারে শেষ-মেশ।

দেখ ফুলমনি কাঁদুনি গাওয়াটা আমার কাম্য নয়
ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে জানি আজও প্রতিরোধ হয়
সৌখিন হোক, তবুও এ গান এক ফালি প্রতিরোধ
তোমার লড়াই আমার কণ্ঠে গানের জীবনবোধ।
ধরা পরে যায় দেহটাই শুধু ধরা পড়বে না মন
ধরা না পড়ার হাওয়ায় দুলছে সুদূরের শালবন
তোমার মতই ইশরাত জাহান আমার ছোট্ট বোন
তোমার মতই ইশরাত জাহান আমার ছোট্ট বোন।

যে ঘটনার প্রেক্ষিতে গানটি রচিত…

ishrat-jahan-hottakando

গুজরাতে ২০০৪ সালের ১৫ জুন আহমেদাবাদের কাছে ভোরবেলায় চার জঙ্গীর সাথে গুলি বিনিময় হয়েছে এবং তার ফলে ওই চার লস্কর-ই-তৈবা জঙ্গীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় গুজরাত পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। ওই চারজন ‘জঙ্গী’ হল ইশরাত জাহান (১৯), জাভেদ গুলাম শেখ, আমজাদ আলি, জিশান জোহর আবদুল গনি। পুলিশের তত্ত্ব ছিল, তারা একটা নীল টাটা ইন্ডিকাতে করে গুজরাতের ২০০২ সালের মুসলিম নিধন যজ্ঞের অন্যতম স্থপতি নরেন্দ্র মোদীকে হত্যা করতে এসেছিল। এই ‘এনকাউন্টার’এর কোনও প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না, ‘জঙ্গী’রা প্রায় ৩৭ রাউন্ড নাকি গুলি ছুঁড়েছিল বলে ক্রাইম ব্রাঞ্চের দাবি, কিন্তু কোনও পুলিশের গায়ে গুলি লাগেনি, পুলিশের জিপের গায়েও গুলি লাগে নি।

ঘটনার পাঁচ বছর পর এবছরের ৭ সেপ্টেম্বর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এস পি তামাং-এর তদন্তে প্রকাশ পায়, গোটা ঘটনাটাই গুজরাত পুলিশের সাজানো। মুম্বইয়ের থানে জেলার মুম্ব্রা থেকে ঘটনার দুদিন আগে, ১২ জুন গুজরাট পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ ওই চারজনকে অপহরণ করে আহমেদাবাদে নিয়ে আসে। ১৪ জুন রাতে তাদের ঠান্ডা মাথায় কাস্টডিতে হত্যা করে পুলিশ। ১৪ জুন মধ্যরাতের মধ্যেই মৃতদেহগুলিতে রাইগর মরটিস হয়ে গিয়েছিল, যা থেকেই বোঝা যায় তাদের ভোরবেলা এনকাউন্টারে মারা যাওয়ার গল্পটি মিথ্যে। পুলিশ অফিসাররা নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসার লোভে এবং প্রমোশনের আশায় এই ভুয়ো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে রিপোর্টে বলা হয়। তারপর পুলিশই ওই নীল সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় পুলিশের ‘তথ্য’র ওপর ভিত্তি করেই পুলিশের হাতে ধরা পড়া বা ‘এনকাউন্টার’এ মারা যাওয়া কাউকে সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গী বলে দেগে দেওয়া রেওয়াজে পরিণত করে ফেলেছে আমাদের দেশের কর্পোরেট ও বড়ো মিডিয়া।

ইশরাতের মা শামিমা তার মৃত মেয়ের গা থেকে এই ‘জঙ্গী’ তকমাটি মুছতে চান।
ইন্ডিকা গাড়ির গল্প ফাঁদে এবং তার মধ্যে একে ৪৭ সহ প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র রেখে দিয়েছিল, ভুয়ো সংঘর্ষের ঘটনাটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য। আরও বলা হয়, ‘জঙ্গী’ চারজনের সঙ্গে লস্করের যোগাযোগের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গুজরাত সরকার এই রিপোর্ট চ্যালেঞ্জ করে এবং গুজরাত হাইকোর্ট এই রিপোর্ট স্থগিত ঘোষণা করে পাঁচ বছর পর আবার তদন্তের নির্দেশ দেয়। সেই তদন্তে অবশ্য এই রিপোর্টকে ‘এভিডেন্স’ বা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। ইশরাতের মা হাইকোর্টের এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গেছেন।

এই রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে গুজরাত সরকার যে যুক্তি দেয় তা হল, ভারতের সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোই জানিয়েছিল যে এই চারজন লস্করের লোক এবং এরা মোদীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছে। কীভাবে এই ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এবং আহমেদাবাদ ক্রাইম ব্রাঞ্চের তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তার এক গোয়েন্দা কাহিনীসুলভ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল বামঘেঁষা রঙিন ঝকঝকে ইংরেজি পাক্ষিক পত্রিকা ফ্রন্টলাইন-এ (ভলিউম ২১, ইস্যু ১৪, জুলাই ৩-১৬, ২০০৪)।

কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এই অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যকে এভিডেন্স বা প্রমাণ ধরে নেওয়া যাবে না।
সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় পুলিশের ‘তথ্য’র ওপর ভিত্তি করেই পুলিশের হাতে ধরা পড়া বা ‘এনকাউন্টার’এ মারা যাওয়া কাউকে সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গী বলে দেগে দেওয়া রেওয়াজে পরিণত করে ফেলেছে আমাদের দেশের কর্পোরেট ও বড়ো মিডিয়া। ইশরাত জাহান এবং তাঁর বন্ধুরা তাই আজও আমাদের কাছে ‘জঙ্গী’, যদিও ইশরাতের পাড়ার লোকেরা কেউ তা বিশ্বাস করে না। ইশরাতের মা শামিমা তার মেয়ের গা থেকে এই ‘জঙ্গী’ তকমাটি মুছতে চান।


সৌজন্যেঃ
শমীক সরকার, কলকাতা, ২৬ সেপ্টেম্বর।
সংবাদ মন্থন।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress