নামান্তর/ধর্মান্তর

সুমনের নামান্তর/ধর্মান্তর নিয়ে যাদের বিস্তর জিজ্ঞাসা, তাদের জন্য সুমনের ভাষ্য…

আমার সন্তানতুল্য সাংবাদিক ঋজু বসুর একটি সূত্র ধরে জনৈক ভটচাজ-মশাই আমার “ধর্ম নিয়ে ধ্যাষ্টামো”র প্রসঙ্গ তুলে একটি ছড়া কেটেছেন। বেশ লাগল। তাই ঋজুকে আমি এই লেখাটি পঠিয়েছি।/ -ঋজু, আমি তো নেহাতই ছোট মাপের মানুষ। আধুনিক যুগ এবং আমাদের দেশটার নাম ভারত আর রাজ্যটার নাম পশ্চিমবঙ্গ বলে এখনো আমার মতো লোক প্রাণে বেঁচে আছে। মধ্যযুগে আমার মতো লোকদের মেরে ফেলা হতো। এই কৃষ্ণের জীবটি আসলে মধ্যযুগেই পড়ে আছেন। ওনার রাগে-ঘৃণায় আরও অনেকে শরিক। আমার মা যখন বেঁচে ছিলেন, অনেক লোক তাঁকে ফোন করে বলতো: কী ম্যাডাম, আপনার ছেলে যে মোচলমান হয়ে গেল!!! – মা তাঁদের বলতেন, “আমার ছেলে মুসলমান হবে না তো কি তোমার বাবা হবেন?”

কবীর সুমন নামটার মধ্যে কোথাও কোনও ধর্মের গন্ধ নেই, সম্প্রদায় বা জাতপাতের গন্ধ নেই। তাতে সেকুলার লোকদের ভালো লাগার কথা। অনেক লোক খেপে যায় আবার ঐ কারণেই। ধরো, আমি যদি যুক্তি দিই: “নানান ধর্ম দীর্ঘকাল মানুষকে ব্যবহার করে এসেছে তাদের উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য। আমি ধর্মকে ব্যবহার করলাম আমার উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য – আমার বাবামায়ের দেওয়া নামটা আমার পদবিতে রূপান্তরিত করব বলে। আর “কবীর” নামটি নেওয়া – অতীতের এক মুস্লিম বৈষ্ণব-পদকর্তা শেখ কবীরের নাম থেকে”? কী কী ঘটতে পারে? মৌলবাদীরা একদিন আমায় মেরে ফেলতে পারে। “চট্টোপাধ্যায়” পদবিটায় আমার বাবার কোনও হাত ছিল না। চাটুজ্যের ছেলে চাটুজ্যে। আমার বাবা নাস্তিক ছিলেন। আমার মায়ের পদবি বিয়ের আগে ছিল ভট্টাচার্য। তাতে তাঁর কোনও হাত ছিল না। বাবাকে বিয়ে করে চাটুজ্যে। সেখানেও মায়ের কোনও হাত ছিল না। “সুমন” নামটি আমার বাবামায়ের দেওয়া। রাষ্ট্রীয় অনুজ্ঞায় ওই নামটি আজ আমার পদবি। ফার্স্টনেম: কবীর। – এতে লোকের আপত্তির কারণ কী? কেউ আবার চেষ্টা করে দেখুন তাঁর নাম সরকারিভাবে পাল্টাতে। তাহলেই দেখবেন। ঋজু, তুমি যদি ঋজু আকাশ বা কমল ঋজু নাম নিতে চাও, পারবে না। তুমি ধর্ম বা জাতপাত না মানলেও রাষ্ট্র তোমায় তোমার জন্মনাম ঋজু বসু মোতাবেক তোমাকে একটি বিশেষ ‘বর্ণের’ মধ্যেই ফেলে। এখানে তোমার কোনও হাত নেই। তুমি যদি ‘বসু’ ত্যাগ করে ‘মণ্ডল’ বা ‘পোদ্দার’ বা ‘চাটুজ্যে’ হতে চাও, পারবে না। পারতে গেলে তোমায় পঞ্চায়েত বা কর্পোরেশন থেকে সেই মর্মে, অর্থাৎ তোমার নতুন ‘জাত’-মার্কা পদবিটাই যে সংগত সেই মর্মে একটা সার্টিফিকেট আনতে হবে। কে দেবে, কী করে দেবে? খেয়াল করে দেখবে, কাগজে নাম-পরিবর্তনের এফিডেভিট সংক্রান্ত যে বিজ্ঞপ্তি বেরোয় (আমাকেও দুটি বড় পত্রিকায় দিতে হয়েছিল – একটি বাংলা, অন্যটি ইংরিজি) তা থেকে বোঝা যায় ‘পদবি’ পরিবর্তন হলেও caste বা “জাত/বর্ণ” (শালা, ভাবতেও কেমন লাগে) পাল্টাচ্ছে না। আদালতে যখন গেছিলাম এক সহৃদয় ফার্স্ট ক্লাস ম্যজিস্ট্রেট আমায় সব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। “বসু” থেকে তুমি তোমার বাবামায়ের দেওয়া নাম ঋজু-তে নামান্তরিত বা পদবি-অন্তরিত হতে পারবে না। কিন্তু তুমি যদি ঐ কাজটা বাস্তবিকই করতে চাও তাহলে তোমায় ধর্মান্তরিত হতে হবে। সোজা কথা। এবারে কেউ যদি আমার নামে মামলা করেন তো মামলায় আদালতের ডক্-এ হাকিমের সামনে দাঁড়িয়ে আমি যা বলব সেটাই আইন গ্রাহ্য করবে। তখন আমি নিজেকে নিরাপদ জায়গায় রেখেই যা বলবার বলব। ফেসবুকে বা কাউকে লেখা চিঠিতে বা জনসভায় এমনকি পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে আমি কী বললাম আইনে তার কোনও দাম নেই।

কবীর সুমন একটি সেকুলার নাম। কী করা যাবে। কয়েক বছর আগে এক দল (হিন্দু) ছেলেমেয়ে আমার কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন “আপনি কবীর সুমন হয়ে গেছেন বলে বাড়িতে আপনার গান আর শুনতে দেয় না, আপনার ক্যাসেটগুলো ফেলে দিয়েছে।” – কী বলবে? – আমি এও দেখেছি, যাঁরা তৃণমূল করেন, কংগ্রেস করেন – যাঁদের অনেকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলেন, তাঁরা কিন্তু আমার নতুন নামটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সিপিএম ও বামপন্থী রাজনীতি করা অনেকে আমায় আজও উল্লেখ করে আগের নামে। এরা আবার মানুষের অধিকার, ব্যক্তির অধিকার – ইত্যাদি বিষয়ে উপদেশ দেন। এন্টনি কবিয়াল গান বেঁধেছিলেন : “শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে এই কথা শুনি নাই।” অথচ সারা জীবন সেটাই দেখলাম। “সুমন চট্টোপাধ্যায়” হলে গান শোনা যাবে, “কবীর সুমন” হলে যাবে না। আমার ক্ষেত্রে মজা হলো – আমি তো নিজের নাম পাল্টেছি, অন্য কারুর না। তাতেও কত লোকের আপত্তি। ক’দিন আগে, এম পি হিসেবেই আমি গড়িয়ার এক আবাসন-সমবায়ে গিয়েছিলাম বাসিন্দাদের কিছু অভিযোগের কথা শুনতে। তাঁদের নর্দমা দরকার, জল দরকার। সুন্দর সভা হচ্ছে। প্রবীণ প্রবীণারা বসে। খুবই ভদ্র পরিবেশ। হঠাৎ তাঁদের এক (হিন্দু) মুখপাত্র আমায় সব্বার সামনে জিজ্ঞেস করলেন: ” আচ্ছা, আপনি রোজ নামাজ পড়েন?” জল-নিকাশ, নর্দমা, জল সরবরাহ, রাস্তাঘাট, কর্পোরেশনের অনুজ্ঞা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সেই শিক্ষিত, অধ্যাপক, সমবায়-পদাধিকারী কিন্তু আমায় দিব্যি জিজ্ঞেস করতে পারলেন এটা। আমি যদি “চট্টোপাধ্যায়” থাকতাম, উনি কি আমায় জিজ্ঞেস করতে পারতেন :”আপনি রোজ গায়ত্রী জপ করেন? আহ্নিক করেন?” – হা হা।

এখন পর্যন্ত দু’জন “বন্ধু” (এখন আর নন) আমায় খাটো গলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন : “আচ্ছা, আপনাকে/তোমাকে কি ইয়ে… মানে… ইসে… মানে …” আর বলে উঠতে পারছিলেন না। তাই আমিই তাঁদের সাহায্য করেছিলাম: “সুন্নৎ করতে হয়েছে?” তাঁরা এক গাল হেসে বলেছিলেন – “হ্যাঁ হ্যাঁ, ঐটাই।” আমি তাঁদের বলেছিলাম – আমার সুন্নৎ হয়েছিল ছ’বছর বয়সেই। পারিবারিক ডাক্তার হিমাংশুবাবু করে দিয়েছিলেন – ফাইমোসিস হয়েছিল কি না। — কতগুলো কাজ এ-জীবনে না করলে অনেক ইন্টারেস্টিং জিনিস জানা যায় না। আমার এক স্নেহভাজন ব্যক্তি একদিন আমায় মিঠে হেসে (তিনি সব সময়ে লাজুক-লাজুক মুখে মিঠে হাসেন) বলেছিলেন, “আমি কিন্তু আমার নামটাই ব্যাবহার করি, পদবি না।” – অর্থাৎ তিনি আমায় লক্ষ্য করে একটা ছুঁচোবাজি চালালেন। আহা কৃষ্ণের জীব, আসলে মুস্লিম-বিদ্বেষী। আমি বললাম,”তুমি কি সরকারিভাবেও শুধু ঐ প্রথম নামটা?” তিনি বললেন, “অবশ্যই।” – আমরা তখন সবে অন্য একটা শহর থেকে বিমানে করে কলকাতায় ফিরেছি। একসঙ্গেই। আমি খেয়াল করেছিলাম যাওয়ার পথে এয়ারপোর্টে তিনি টিকিট দেখিয়ে বোর্ডিং কার্ড নেওয়ার সময়ে তাঁর পাসপোর্টটা দেখিয়েছিলেন। তাই তাঁকে (তখন আমরা এক জায়গায় বসে কফি খাচ্ছি) বললাম, “তোমার পাসপোর্টটা একটু দেখাবে?” – আহা, কৃষ্ণের জীব। নিরুপায়। দেখালেন। তাতে তাঁর প্রথম নাম এবং পদবিটি বিলক্ষণ ছাপা। আমি তাঁকে স্নেহ করেই বলেছিলাম – আমাকে লেঙ্গি মারবে এইভাবে? আগে সত্যিই নিজের নামটা সরকারিভাবে পাল্টাও, পাসপোর্ট বানাও সেই নামে, ব্যাংক একাউন্ট খোলো সে নামে, প্যান কর্ডেও সেই নাম থাক, ট্যাক্স ফাইলেও। তারপর কবীর সুমনকে বিব্রত করার স্বপ্ন দেখবে। – কী বলবে? – আমি এক গণতান্ত্রিক দেশের আয়করদাতা নাগরিক। আমি যে ধর্ম ইচ্ছে নেব, যে নাম ইচ্ছে বানাবো নিজের নামে, তাতে কার কী? হিন্দু হলে এ-দেশে সেকিউলার হওয়া যায় সরাসরি। হিন্দু নামধারী automatically সেকিউলার।

মুসলমান হলেই অমনি সে সেকিউলার হওয়ার অধিকার খোয়ালো। অমনি সে মৌলবাদী। এখনও বারবার এটাই দেখছি। অতএব আমি এক গর্বিত মুসলমান। আমার পুরো নাম মহম্মদ ইয়াকুব আসিফ কবীর আরিফ হেদায়তুল্লাহ্ সুমন শেখ। কিছু মাস আগে পশ্চিম বঙ্গ সরকারের এক উচ্চপদস্থ officer এক জনসমাবেশে আমার উপস্থিতিতে ভাষণ দিতে গিয়ে “প্রধান অতিথি, সাংসদ সুমন চট্টোপাধ্যায়” বলেছিলেন। ভাবো। সেই মুস্লিম-বিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদীর এটা অন্তত জানার কথা যে ঐ নামে কেউ সাংসদ হননি। কিন্তু কী করবে? তিনি (আসলে) বামপন্থী দল-করা এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী, যিনি তাঁর দল এ-রাজ্য থেকে বেমালুম হাওয়া হয়ে গিয়েছেন বলে ভীষণ পীড়িত। তাই তিনি এক্কেবারে ধ্বসিয়ে দিলেন নিজেকে। আমি খুব ভদ্রভাবে তাঁকে বললাম, “ম্যাডাম, আমি ২০০০ সালে ইসলাম ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রীয় অনুজ্ঞায়, অনেকের বুকে তুষের আগুন জ্বালিয়ে কবীর সুমন নামটি নিয়েছি। যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে সি পি এমের মহাপ্রার্থীকে প্রায় ৫৯ হাজার ভোটে যে হারিয়ে দিয়ে সাংসদ পদটি জিতে নিয়েছিল সেই অধমের নাম হেঁহেঁ মহম্মদ সফিউল্লাহ্ কবীর সুমন আবদুল্লাহ্। দয়া করে পুরো নামটি বলুন।” – তিনি, কী আর করবেন, ধীরে ধীরে নামটি বললেন, আমি তাঁকে সাহায্য করতে গিয়ে গুলিয়ে ফেললম কারণ ঐ নামটী আমি তখনই বানিয়ে নিয়েছিলাম। তাও বলালাম। তারপর, মঞ্চ সাজানোর জন্য যে ফুলগুলি ছিল তা থেকে একটি সুন্দর ফুল তুলে নিয়ে ম্যাডামের হাতে দিয়ে বললাম – মাননীয়া, অপরাধ নেবেন না। আমি আপনাদের বেচারা-সাংসদ কবীর সুমন। নামটা মনে মনে বলুন, দেখবেন খারাপ লাগছে না। আমি মুসলমান, তাতে কী হয়েছে?” – অনেকে ছিলেন সেই সমাবেশে। সব্বাই কিন্তু হাততালি দিলেন। খুব হাসছিলেন সকলে। ওখানেও কিন্তু অনেক সিপি এম সমর্থক ছিলেন। সকলে ঠিক স্পিরিটেই নিলেন। – যে ভট্চাজ-মশাই তাঁর গভীর মুস্লিম-বিদ্বেষ ও অসূয়া থেকে আমার সম্পর্কে ওটি লিখেছেন তাঁর হিন্দু-হাতে আমি, ধর্মে মুসলমান কবীর সুমন, এই ষষ্ঠীর দিনে একটি ফুল তুলে দিলাম। ভারত কিন্তু মুসলমানদেরও দেশ। সক্কলের দেশ। —- আর একটা কথা, আরও অসংখ্য লোক আমার পৌনঃপুনিক বিয়ে এবং প্রেম ইত্যাদি নিয়ে বেজায় খাপ্পা। সেটা বলেও বেড়ান। অনেকে আমার গান শুনলেও বলেন বলে শুনেছি – “গান? খুব খারাপ লোক। কতগুলো বিয়ে করেছে। এখনো প্রেম করে বেড়ায়।” – কিশোর কুমারও অনেকগুলো বিয়ে করেছিলেন। আমি অবশ্য এই একটি ক্ষেত্রে তাঁর রেকর্ড ভেঙেছি। শুনেছি আচার্য আলি আকবর খান সাহেবও একাধিক বিয়ে করেছিলেন। আচার্য রবিশংকরের বিবাহ-বহির্ভূত কন্যা গানে বেশ নাম করেছেন। অনেকে শোনেন। কেউ তো বলেন না – এ মা, এর মাকে রবিশংকর বিয়ে করেনি রে! –

আমার ওপর বিবাহ-প্রেম ইত্যাদির কারণে যাঁরা খাপ্পা এবং এই কারণে যাঁরা আমার গান নিয়েও গাল পাড়েন তাঁদের এই মহাষষ্ঠীর পুণ্য প্রহরে বলিবঃ “হিংসা করিয়ো না, পরিশ্রম করো – তোমারও হইবে।”

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress