নতুন শীতের কোনও এক সন্ধেতে

f2

তানিশা আমীনের একটি পোস্ট পড়ে চমকে উঠলাম। এভাবে তো ভাবিনি কোনওদিন।

কিম্ভূতকিমাকার এক সময়ে আমরা। অন্যভাবে দেখতে গেলে – একটু ডিকেন্‌সিও শোনাবে হয়তো – এ হলো নিকৃষ্টতম সময়, আবার এটাই হলো সবচেয়ে ভালো সময়। ভারতে আর যাইই চলুক থিওক্র্যাটিক রাজনৈতিক মতবাদ যে চলতে পারে না তা অনুভব করার সময় আজ। বিজেপি আর এস এসের কথাবার্তা কাজকর্ম নিশ্চই অনেককে আকর্ষণ করছে। আবার করছে না-ও অনেককে। যাঁরা আকৃষ্ট হচ্ছেন তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আপন মনে ইতিহাস বিকৃত করে মিথ্যে কথা রটিয়ে চলেছেন। অথচ ভারতের ইতিহাস জেনে নেওয়া কঠিন কাজ নয়। ভারতের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস। ভালো ভালো বই আছে।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তর ‘উটপাখি’ কবিতাটি আর একবার পড়া যেতে পারে। “অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে।” –
বব ডিলানের ‘ব্লোইং ইন্‌ দ্য উইণ্ড’ গানটি আবার শোনা যেতে পারে। “How many times must a man look up/ Before he can see the sky.// How many ears my must one man have/ Before he can hear people cry.// How many deaths must it take till he knows/ That too many people have died.// The answer my friend is blowing in the wind…”

খবর পেলাম, মুর্শিদাবাদ জেলার (ভারতের এই জেলাতেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলমানের বাস) মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্র (সম্ভবত নির্বাচন কমিশন থেকে আসা – আমি ঠিক জানি না) তাঁরা যে ভারতের নাগরিক তার যাবতীয় প্রমাণ অবিলম্বে জমা দিতে হবে। খবরটি পেয়েছি গতকাল জেলার এক সাংবাদিকের কাছ থেকে। ঐ জেলার অনেক মুসলমান কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন। ২/৩ দিনের মধ্যে তাঁরা কী করে এই নির্দেশ পালন করবেন?

খবরটা যদি ভুল হয় তো স্বস্তি পাবেন অনেকেই। ঠিক হলে অস্বস্তি।
আমার বন্ধু, এস ইউ সি আই দলের ডাক্তার তরুণ মণ্ডল (প্রাক্তন সাংসদ) আজই আমায় বলছিলেন আসামে বিজেপি একই ধরণের কার্যক্রম নিয়েছেন কয়েকটি এলাকায় – কোন্‌ বাঙ্গালি মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছেন তা যাচাই করবেন বলে। হিন্দু চলে এলে ঠিক আছে, মুসলমান এলে বেঠিক।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ও তার পর ভারতের লক্ষ লক্ষ মুসলমান বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে পাকিস্তান চলে যেতে চাননি, যাননি। তাঁরা ঠিক করে নিয়েছিলেন ভারতই তাঁদের দেশ। তার পর থেকে তাঁরা নানান সময়ে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, নানান ভাবে অপমানিত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্য দেশেও সংখ্যালঘুদের কপালে একই দুর্দশা জুটেছে। তার মানে এই নয় যে আমাদের দেশেও সংখ্যালঘুদের অনুরূপ দুর্দশায় ভুগতে হবে।

খাগড়াগড় বোমা ফাটার ঘটনার পরমুহূর্ত থেকে বিজেপি আর এস এস এবং পশ্চিমবাংলার অন্তত দুটি বড় বাংলা দৈনিক নাগাড়ে মুসলমানদের যে ছবি তুলে ধরেছেন তা একই সঙ্গে হাস্যকর ও মর্মান্তিক। আউটলুক পত্রিকায় সাংবাদিক অজিত সাহি তাঁর তদন্তের ভিত্তিতে যা জানিয়েছেন তা থেকে দেখা যাচ্ছে দিল্লি থেকে যাঁরা তদন্ত করতে এসেছিলেন তাঁদের কর্মপদ্ধতি ও সিদ্ধান্তগুলিতে কত রকমের ফাঁক ফোকর। ঐ রিপোর্টটি ভালো করে পড়া দরকার। স্বপন মণ্ডল কোথায় হারিয়ে গেলেন? করিমের বাবাকে কেন সেল ফোনে তোলা একটি ছবি দেখানো হলো? উপযুক্ত কাগজে ছাপা বড় ছবি কেন তাঁকে দেখানো হলো না? আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন পারভেজ, যিনি তদন্তকারী সাংবাদিককে যা বলেছেন তার সঙ্গে দিল্লি থেকে আসা বড় বড় সত্যানুসন্ধানীদের সিদ্ধান্তের মিল নেই। দিল্লির ব্যোমকেশ বক্সিদের কথা যদি ঠিক হয়, স্বপন/করিমের বাবাকে যদি ঠিক ছবি সেল ফোনেও দেখানো হয়ে থাকে তো নিহত ব্যক্তির মুখ অক্ষত হয়ে গেল কোন্‌ যাদুবলে। কেউ কেউ বলছেন স্বপন ওরফে সুভান। উদার আকাশ সংস্থার জনাব ফারুক আহমেদের ডাকে আমি যেদিন কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলি এবং এইসব ঘটনা এক বড় ষড়যন্ত্রের অংশ – এই সন্দেহ প্রকাশ করি, সেদিন বর্ধমান থেকে আসা এক যুবক আমাকে জানান যে স্বপন মণ্ডল নামে এক যুবকও প্রাণ হরিয়েছিলেন। বর্ধমানের সেই যুবকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে আর-এক যুবক আমায় একই সঙ্গে জানান – নিহত ছেলেটি ‘শোভন’ নামেও পরিচিত। ‘শোভন’, ‘সুভান’ – উচ্চারণের দিক দিয়ে কাছাকাছি। ‘স্বপন’ও দূরে নয়। কিন্তু কাক্কেশ্বরের হাতে আর পেন্সিল নেই, আছে ‘মণ্ডল’ পদবিটা। প্রেস ক্লাবের সভা শেষ করে আমি অন্যদের সঙ্গে বেরোচ্ছি এমন সময়ে ঐ দুই যুবক কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে খবরটা দেন। এতো ভীড় ছিল, আর জায়গাটাও ছিল এতো ছোট যে ঐ দুই যুবককে আর দেখতে পাইনি আমি।

সজোরে ও সবেগে মিডিয়া-ঢাক পিটিয়ে ঐ বোমা-ফাটা (জঙ্গিরা যেধরণের বিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করেন বলে শুনে এসেছি, জেনে এসেছি সেরকম কিছু ফাটলে ঐ বাড়িটা কি আস্ত থাকত? খোদ বাড়িটা কতোটা বিধ্বস্ত হয়েছে?), সন্দেহভাজন (বলা বাহুল্য) মুসলমান, তাঁদের নানান গূঢ় যোগাযোগ, তাঁদের জঙ্গিপণার ম্যানিফেস্টো (যা আসলে আরবি ভাষার বর্ণপরিচয়, আমার বাড়িতেই একটা ছিল, আমি সেই সাংবাদিক বৈঠকে দেখিয়েওছিলাম – হায় রে ভারত, হায় রে পশ্চিম বাংলার মিডিয়া!), বাংলাদেশের এক জঙ্গি সংস্থার গোপন ভূমিকা, তারই মধ্যে সারদার টাকার বাংলাদেশ-সফর, সেই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্রয়ে এই রাজ্যের বুকে ইসলামী জঙ্গিদের ঘাঁটিস্থাপন, তারই ফাঁকে ‘স্বপন মণ্ডল’ আসলে ‘সুভান’, optionally করিম – ইত্যাদি রোমহর্ষক সব খবর ছড়িয়ে দেওয়া হলো। তারই ফোকরে ঢুকে গেল একটি হলুদ মোটরগাড়ির গল্প। “The (Little) Yellow Rolls Royce”. গ্রামবাংলার বুকে ছোট্ট হলুদ পাখি নয়। মোটরগাড়ি। কেন? কার গাড়ি? কে ব্যবহার করে? ‘Mr Osama Bin Laden, I presume!” নাকি দস্যু ঘচাং ফুঃ! এ-রাজ্যের ব্যোমকেশ-কিরিটি-জয়ন্ত মিডিয়া রটিয়ে দিলেন – ঐ গাড়িতে করে দুই মুসলমান মহিলা অস্ত্রপ্রশিক্ষণ নিতে যেতেন। কোথায় হতো সেই জঙ্গি মহড়া? তা কেউ জানে না। বলছি যেতো – এটাই তো যথেষ্ট। তাছাড়া, বলছি না? মুসলমান? তার মানেই তো জঙ্গি বা ‘হবো-হবো-জঙ্গি’। – দিন দুই আগে খবর পেলাম (ঠিক যেভাবে আমাদের মিডিয়া তাঁদের উৎস থেকে তাঁদের খবর পেয়েছিলেন, পেয়ে চলেছেন) গাড়িটির অফিসিয়াল মালিক নাকি এক অবসরপ্রাপ্ত আর্মির অফিসার, মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা। ঐ ছোট্ট মিষ্টি মোটর গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। গাছ গজিয়ে গিয়েছিল। উপযুক্ত লোকজন গাড়িটিকে ধুয়েমুছে খাইয়ে দাইয়ে রোদ্দুরে শুকোতে দেন। ব্যাস্‌। গাড়ি চলুক না চলুক আজ মুসলিমবিদ্বেষীদের বসন্ত।

নতুন শীতের কোনও এক সন্ধেতে হালকা চালেই লিখলাম। আর কী করব। চুপ করে থাকা যেত। অনেকেই তো চুপ করেই আছেন। ঠিক পারলাম না। যেমন আর পারলাম না বলে পুরনো সিডিগুলোর মধ্যে “রুখে দাও” গানটির সিডি পেয়ে, ওয়েভ ফর্ম্যাট এম পি থ্রিতে রূপান্তরিত করে সাউণ্ডক্লাউডে তুলে দিলাম। সেখান থেকে ফেসবুকে।

সাংসদ হওয়ার ঢের আগে আমার বন্ধু সুব্রত করের ছেলের নাম রাখতে হয়েছিল। রেখেছিলাম। পুষ্পল। সাংসদ হওয়ার অল্প কিছুদিন পর এক ভোরবেলা স্থানীয় একটি সরকারি হাসপাতালের বাইরে পরিত্যক্ত এক নবজাতককে পাওয়া যায়। এইটুকুনি একটি ছেলে। বাঙ্গুর হাসপাতালের কর্মীরা বাচ্চাটিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পরিচর্যা করেন, তার জামাও কিনে দেন। খবরটি পেয়ে আমি তার নাম রেখেছিলাম ‘কর্ণ।’ তাকে নিয়ে একটি গানও লিখেছিলাম। জেনেছিলাম সেই গানের লিরিক নোটিস বোর্ডে ঝোলানও হয়েছিল। এক দম্পতি পরে বাচ্চা ছেলেটিকে দত্তক নেন। যে দিদি হাসপাতাল থেকে বাচ্চাটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি দম্পতিকে জানান যে কবীর সুমন নামে একটা লোক এর নাম রেখেছে ‘কর্ণ’। বাচ্চাটির নতুন মা বাবা নাকি সেই দিদিকে জানান যে তাঁদের এই সন্তানের নাম কর্ণই থাকবে। – এই খবরটি আমায় হাসপাতালের এক কর্মীই দিয়েছিলেন।

বারুইপুর হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়েছলাম। রুগীদের মধ্যে একজন, গ্রামের এক সাধারণ-অসাধারণ ‘মা’ (নাম তাঁর আমিনা), আমাকে তাঁর সদ্যজাত শিশুকন্যাটিকে দেখালেন এক-গাল হেসে। আমি বললাম – আমার নাতনি যে! কী-সুন্দরই না হয়েছে আমার নাতনি। – আমার সদ্য-পাওয়া মেয়ে, আমিনা, আমায় বললেন, “বাবা, তাহলে তুমি আমার মেয়ের নাম রেখে দাও একখানা, ভালো দেখে।” – বেশি ভাবতে হয়নি। কেন জানি না ‘নয়নতারা’ নামটি আমার মুখে চলে এলো। মা আমিনাকে বললাম। বেজায় খুশি হলেন তিনি। বললেন, তোমার দেওয়া এই নামটাই থাকবে তোমার নাতনির। আমি বললাম, ধরো – নয়নতারা খাতুন? – মা বললেন, তাইই হবে।

এর পরেও নাম রাখার অনুরোধ পেয়েছি। এক নাতির নাম রেখেছি অভি। আমাদের গণ-আন্দোলনের অসামন্য কর্মী-কমরেড বিজ্ঞানী অভির নামে। আমার চেয়ে বয়সে কতো ছোট অভি চলে গেলেন – নিজেরই আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।

পুষ্পল, কর্ণ, নয়নতারা, অভি – আমার নাতি নাতনি। এরা ছাড়াও আছেন – গানদাদু, টাকদাদু। হয়তো-সেরা-হয়তো-নিকৃষ্টতম এই যুগমুহূর্তে এঁরাও। তানিশার কাছ থেকে ফেসবুকে উপহার পাওয়া এই ছবিটির ওপরে যা লেখা, আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমার নাতি নাতনিদের কথা। ওঁদের কাছ থেকেই তো ধার করেছি এই দুনিয়া। আর কিছু না, আমার সংগীতের প্রতি সৎ থেকে, এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সরব থেকে আমি যেন মরতে পারি।

আমার এই লেখাটির বিরুদ্ধে বা আমার বিরুদ্ধে কে বা কারা কী বললেন তাতে আমার কিছু যায় আসে না। They are what they are and I am what I am.

নমস্কার। আদাব। তানিশা – অনেক ধন্যবাদ, আদর।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress