দস্যি

দস্যি ছেলে লক্ষ্মী আজ

১৯৭২ সাল হবে। সবে চাকরিতে ঢুকেছি। নিউ এম্পায়ারে একটা বাংলা ছবি দেখতে গিয়েছি। ‘৭৮ দিন পরে’। বেশি দিন চলেনি ছবিটা। সম্ভবত শমিত ভঞ্জ ছিলেন প্রধান চরিত্রে। সঙ্গে চিন্ময় রায়। সিরিয়াস চরিত্রে চিন্ময় রায়। ওয়াগনব্রেকারদের গল্প। পুলিশ নজর রাখছে বলে দলের পাণ্ডা বাড়িতে থাকতে পারেন না। এক দিন তিনি লুকিয়ে, অনেক ঝুঁকি নিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। মায়ে-ছেলেতে যখন দেখা হচ্ছে, নেপথ্যে শোনা যাচ্ছে মহিলার কণ্ঠে, ‘খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল বর্গি এল দেশে।’ ছবিটি আজও মনে আছে ওই মুহূর্তটির জন্যই। আমায় পেড়ে ফেলেছিল ওই গানটির প্রয়োগ। তার কিছু ক্ষণ পরে ‘খোকা’ মারা যাবে পুলিশের গুলিতে। ঘর-ছাড়া, দাগি ‘সমাজবিরোধী’ ছেলে লুকিয়ে দেখা করতে এসেছেন মায়ের সঙ্গে। কয়েক মুহূর্তের বেশি সময় তাঁদের নেই। অনেক দিন পর ছেলেকে দেখে মায়ের হাহাকার নেপথ্যে

‘খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে।”

কে লিখেছিলেন এই গান? কে সুরকার? আমার এক নবীন ইতিহাসবিদ বন্ধু বললেন, বর্গি আক্রমণের কথা যখন আছে, এ-গান সম্ভবত অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে লেখা নয়। আর সে আক্রমণ যেহেতু পূর্ববঙ্গে হয়নি, এ-গান সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের। আমার চেয়ে দশ বছরের বড় এক বন্ধু, যাঁর জন্ম পদ্মার ও পারে, আমায় জানালেন, তাঁর মা তাঁকে ঘুম পাড়াতেন,

‘ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো
খাট নাই পালঙ নাই চোখ পেতে বসো’

এই গানটি গেয়ে গেয়ে। দুটি গানের সুর মোটের ওপর এক। খুব ছেলেবেলায় শুনতাম বাবা মা গাইছেন, ‘চমকে তিমির থির বিজলির বিভায় মনচোরা আয় রে মধুর বাজিয়ে নূপুর স্বর্গ স্বপন ঝোরা’। সত্যি বলতে, সেই শৈশবে ‘চমকে তিমির থির বিজলি’ এই কথাগুলি ছাড়া আর কোনও কথা আমার মাথায় ঢোকেনি। ঢুকলেও নেহাতই আলগা ভাবে। সুর কিন্তু পুরোটাই গাঁথা হয়ে গিয়েছিল আমার মনে। আমার বাবা আমার মুখে বোল ফোটার মুহূর্ত থেকে আমার কথাবার্তা, আমার গাওয়া গান ‘প্রথম কাকলি’ নামে যে বাঁধানো খাতাটায় লিখে রেখেছিলেন সেই খাতাটি আমার যৌবনে পড়ার সুযোগ পেয়ে জানতে পেরেছিলাম যে একেবারে প্রথম থেকেই ওই গানটি আমি আপন মনে গাওয়ার চেষ্টা করতাম। কেবল, কোনও এক কারণে, ‘স্বর্গ স্বপন ঝোরা’ কথাগুলোর বদলে রবীন্দ্রনাথের ‘হে ভৈরব, শক্তি দাও’ গানটির ‘সর্বখর্বতারে’ কথাটি ঢুকে পড়ত। আমায় ঘুম পাড়াতে গিয়ে মা কি কখনও এই গান গাইতেন? জানি না। ঠিক যেমন জানি না ‘খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল বর্গি এল দেশে’ প্রথম কোথায়, কার কাছে শুনেছি। মায়ের কাছে শুনেছি বলে মনে হয় না। ‘খোকা’ কথাটি ঘুমপাড়ানি গানেও বলার মতো মানুষ আমার মা ছিলেন না। তবে খুব ছেলেবেলায় যে শুনেছিলাম তাতে সন্দেহ নেই। এবং শুনেই টের পেয়েছিলাম এই গানের সুর বাবা-মায়ের মুখে শোনা ‘চমকে তিমির থির বিজলির বিভায় মনচোরা’র প্রথম লাইনের সুরেরই মতো। অনেক পরে জেনেছি, ‘চমকে তিমির’ দিলীপ কুমার রায়ের লেখা, সুর করা। তিনি ও সাহানা দেবী গ্রামোফোন রেকর্ড করেছিলেন। যত দূর জানি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ঘুমপাড়ানি গান— ‘আয় রে আমার সুধার কণা আয় রে ননির ছবি’ গানটির প্রথম লাইনের সঙ্গে দিলীপকুমার রায়ের গানটির সুরের মিল আছে। ‘ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো’ গানটির সুরও মোটের ওপর এক।


খোকা ঘুমোল। নিশ্চিন্দিপুরের সেই বাড়ির দাওয়ায় ইন্দির ঠাকরুণ। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’।

এ থেকে একটা সাধারণ সূত্র পাওয়া যাচ্ছে: প্রচলিত দুটি ঘুমপাড়ানি গানের সুর এবং দ্বিজেন্দ্রলাল ও দিলীপ কুমার রায়ের দুটি গানের প্রথম লাইনের সুর মোটের ওপর অভিন্ন। এমন কি হতে পারে যে, ‘খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল’র সুর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল? অনেক বড় সঙ্গীতকারই প্রচলিত গানের সুর ভেঙে বা সেই সুরের আদলে নতুন গান বানিয়ে নিয়েছেন। পাশ্চাত্যে, ধ্রুপদী সঙ্গীতকাররাও ঘুমপাড়ানি গানের সুর রচনা করে গিয়েছেন: ব্রাম্স, মোরিস, রাভেল, শপ্যাঁ, ফেরুচ্চো বুসোনি, ইগর স্ত্রাভিন্স্কি, জর্জ গাশউইন। এঁদের রচনা করা সুরেও প্রভাব ফেলেছে প্রচলিত গান, গানের সুর। ব্রাম্স-এর রচনা (সম্ভবত ১৮৬৮ সালে রচিত ‘ভিগেন্লিড’, শিথিল তর্জমায় দোলনার গান) হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে রেখেছে মানুষ। এতটাই মনে রেখেছে যে দরজার ইলেকট্রনিক ঘণ্টা, মোবাইল ফোনের রিংটোন, মায় গাড়ি-এ-বার-পেছন-দিকে-যাবে-কিন্তু এই হুঁশিয়ারি দিতে চাওয়া মহা বিরক্তিকর ইলেকট্রনিক সতর্কতা-ঘোষণাতেও ব্রাম্সের এই রচনাটি শোনা যায় দুনিয়া জুড়ে। শুধু শুদ্ধ স্বর দিয়ে এই শান্ত রচনাটি তৈরি। ষড়জ, শুদ্ধ রেখাব, শুদ্ধ গান্ধার, শুদ্ধ মধ্যম, পঞ্চম, শুদ্ধ নিখাদ। একটিও কোমল স্বর নেই। ব্রাম্সের আগে ও পরে যে ক্রিসমাস ক্যারলগুলি লোকপ্রিয় হয়ে ওঠে, সেগুলির স্বরবিন্যাসও একই রকম। বেশির ভাগ ক্যারল ঘুমপাড়ানি গানের মতোই গাওয়া যায়। মেজাজটা একই। যেমন, ইংরেজি ভাষায় সম্ভবত সবচেয়ে লোকপ্রিয় ক্রিসমাস ক্যারল ‘সাইলেন্ট নাইট, হোলি নাইট।’ লক্ষ করার মতো যে, বাঙলার ঘুমপাড়ানি গানের সুরও কেবলমাত্র শুদ্ধ স্বর সম্বলিত। দ্বিজেন্দ্রলাল ও দিলীপ কুমারের রচনাতেও কোমল বা তীব্র স্বরের প্রয়োগ নেই। রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল শুদ্ধ স্বরগুলিকে প্রাধান্য দিয়ে সুর করতে গিয়েও মাঝে মাঝেই কোমল নিখাদ অন্তত স্পর্শ করেছেন। তার কারণ কি বাংলার সঙ্গীতচেতনায় খামাজ ঠাটের ভূমিকা, যা কীর্তন থেকে শুরু করে ভাটিয়ালি পর্যন্ত নানান ধরনের গানে শোনা যায়? ঘুমপাড়ানি গান বাঁধতে গিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল কিন্তু চেষ্টা করেছেন কোমল নিখাদ স্বরটিকে প্রাধান্য না দিতে। তাঁর সঙ্গীতচেতনায় পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রভাব খুব সাবলীল ভাবেই এসেছিল। ‘আয় রে আমার সুধার কণা’র সুর দিতে গিয়ে তিনি হয়তো পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ঘুমপাড়ানি গানের স্বরবৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। ওই গানটিকে অনুসরণ করে তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার ‘চমকে তিমির’-এর সুরের ছক তৈরি করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, অভিনব নির্মাণকৌশলের লক্ষ্যে তাঁদের মতো পরিশীলিত সুরকার আর যা-ই করুন, ঘুমপাড়ানি গান তৈরি করবেন না। এমনিতে দুজনেই যাকে বলে ‘আর্ট সং’ নির্মাণে ব্রতী হয়েও ক্ষেত্রবিশেষে ‘ফোক সং’-এর দিকেও গিয়েছেন। ঘুমপাড়ানি গান সাধারণ, অপটু মানুষের গাওয়ার উপযুক্ত না হলে আর হল কী? এই গান গাইতে গেলেও যদি বাড়িতে ওস্তাদ রেখে তালিম নিতে হয় বা সঙ্গীতগুরুর কাছে গিয়ে নাড়া বাঁধতে হয় তো সেটা ঘুমপাড়ানি গান হবে না। ব্রাম্সের মতো ধ্রুপদী সঙ্গীতকার ও সঙ্গীতস্রষ্টাও তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘দোলনার গান’ তৈরি করেছেন এমন ভাবে যাতে খুব প্রাথমিক শিক্ষা থাকলেই যে-কেউ এটি গুনগুন করতে পারেন বা এক হাতে পিয়ানোয় বাজাতে পারেন। সুরটি এত সহজ-সুন্দর যে আমাদের দেশেও যে কোনও শিক্ষার্থী হারমোনিয়মে এটি ধীরে ধীরে বাজিয়ে ফেলতে পারবেন অল্প আয়াসে। কোমল ও তীব্র স্বরের অনুপস্থিতির কারণে খুব বেশি মকশোও করতে হবে না। যাঁরা সবে হারমোনিকা বাজাতে শুরু করেছেন তাঁরাও ব্রাম্স যেমন বাজাতে পারবেন, তেমনি বাজাতে পারবেন ‘আয় রে আমার সুধার কণা’, ‘চমকে তিমির’ এবং অবশ্যই ‘খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল’। শিশুকে ঘুম পাড়ানোর জন্য মায়েরা কি এই সুরগুলি আজও গুনগুন করছেন? কাছে-দূরে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর সময়ে বেশির ভাগ মা তাঁদের প্রিয় গানগুলিই গুনগুন করে গান আর সেই সঙ্গে বাচ্চাটিকে অল্প-অল্প দোলাতে বা তার গায়ে নরম করে তাল দিতে থাকেন। অর্থাৎ ঘুমপাড়ানি হিসেবে তৈরি নয় এমন গানও ঘুমপাড়ানি হয়ে উঠতে পারে। আর, ঘুমপাড়ানি গান যে কেবল মা-ই গান, তা তো নয়। আধুনিক বাংলা গানের এক জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া শচীদুলাল দাস আমায় জানালেন দ্বিজেন্দ্রলালের স্ত্রীবিয়োগের পর দুই ছেলেমেয়েকে তিনিই মোটের ওপর মানুষ করেছিলেন। ‘আয় রে আমার সুধার কণা’ গানটিতে মা-হারা সন্তানকে বুকে নিয়ে বাপের বেদনার বার্তা কথায়-সুরে থেকে গিয়েছে: ‘আমার স্বভাব কেঁদে ফেলি হাসতে হৃদয় ভরে’।

তেমনি বিট্লস দলের রিঙ্গো স্টার রেকর্ড করেছিলেন ‘গুড নাইট’, আর বিলি জোয়েল রেকর্ড করেছিলেন ‘গুড নাইট, মাই এঞ্জেল’। ১৯৬৮ সালে রিঙ্গোর রেকর্ডিং প্রকাশিত হওয়ার পর পাশ্চাত্যের অনেক বেতারকেন্দ্র রাতের অনুষ্ঠান শেষ করতেন এই গানটি বাজিয়ে। পুরুষের গলাই তো।

হঠাৎ মনে হচ্ছে, ‘৭৮ দিন পরে’ ছবিটায় প্রধান চরিত্র পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানোর পর যে মর্মান্তিক দৃশ্য তাঁর স্যাঙাত তাঁর মৃতদেহটিকে রেল লাইনের পাশ দিয়ে কোনও রকমে হিঁচড়ে টেনে আনছেন আর বিড়বিড় করে কী সব বলছেন সেই সময়ে নেপথ্যে যদি একটি পুরুষকণ্ঠ গুনগুন করত ‘খোকা ঘুমোল’র সুরটা? সেন্টিমেন্টাল, নিঃসন্দেহে। কিন্তু কারুর কারুর কান্নাও কি পেত না?

আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress