তিন পর্বের লেখা

১৬ই এপ্রিল, ২০১৫

প্রথম পর্ব

গতকাল ছিল পয়লা বৈশাখ।
বাংলা নববর্ষ।
গতকাল ছিল পয়লা বিশাখ।
আমার বাবা সুধীন্দ্রনাথের জন্মদিন।

আমার বাবা, আমার ছেলেবেলা থেকে যৌবনকাল অবধি ঘনিষ্ঠ স্তরে দেখা আমার জ্যাঠা বাদে একমাত্র হিন্দু নামপদবিধারি একমাত্র বাঙ্গালি যাঁকে দেখেছিলাম মুসলমানদের স্বাভাবিক সহনাগরিক হিসেবে দেখতে, মুসলমানদের সম্বন্ধে বিদ্বেষ পোষণ না করতে। হয়তো এ আমার দুর্ভাগ্য যে আমার ঘনিষ্ঠ স্তরে এমন আর কাউকে জীবনের সেই পর্যায়ে দেখতে পাইনি। তার পরে দেখেছি বৈকি, তবে সংখ্যায় কম।

ছেলেবেলা থেকেই বাবার কাছে তাঁর সময়, যুগ সম্পর্কে নানান গল্প শুনতাম। শুনতাম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। একদিকে যেমন বলেছিলেন – কলকাতার দাঙ্গা সম্পর্কে শুধু হিন্দুদের মত শুনিস না। মুসলমানদের সম্পর্কে হিন্দুদের মুখে যা শুনবি, লেখায় যা পড়বি তার অনেকটাই কিন্তু মুসলমান-বিদ্বেষ থেকে তৈরি, সত্য নয়। – দাঙ্গার সময়ে লেকমার্কেটে একদিন দেখেছিলাম মুসলমান রিক্সাওয়ালাদের মাথাগুলো ফুটপাথে সাজানো, শরীরগুলো রাস্তায়।

তেমনি এও বলেছিলেন – বুঝলি, লীগ আমল আসার পর কিন্তু রেডিয়োয় দু’একজন সাম্প্রদায়িক মুসলমানের দর্শনও পেয়েছিলাম। একজন ছিলেন Z A Bokhari. সাংঘাতিক হিন্দু-বিদ্বেষী। কিন্তু মুসলমান কর্মীদের মধ্যেই অনেকে, যেমন আমার বন্ধু শামসুল হুদা চৌধুরী, বোখারি ও তাঁর চ্যালাদের বিরুদ্ধে ছিলেন, ঝগড়া করতেন, চাকরিজীবনে সাজাও পেতেন।

লীগ আমলে একবার রেডিয়োর কর্মচারীদের এক অংশ ধর্মঘট করেছিলেন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। আমার বাবা বরাবরই ভীতু গোছের। যোগ দেননি। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিকাশ রায় (পরে নামজাদা অভিনেতা) ধর্মঘটে অংশ নেন ও চাকরি খোয়ান। সুধীন্দ্রনাথ অংশ নেননি, বিকাশ রায় নিয়েছিলেন এবং চাকরি খুইয়েছিলেন, কিন্তু দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বে কোনওদিন চিড় ধরেনি। আমার যৌবনকালের পরেও দেখেছি – সুধীন্দ্রনাথ ও বিকাশ দু’মাসে একবার হলেও দেখা করছেন, আড্ডা মারছেন।

সেই যুগের Zeitgeist অন্যরকম ছিল।
ব্রিটিশ আমলেই সুধীন্দ্রনাথ একবার ডিউটি অফিসারের ঘরের একটা আলমারির চাবি ভুল করে পকেটে পুরে বাড়ি নিয়ে চলে এসেছিলেন। সেই আলমারিতে খুব জরুরি কাগজপত্র ও গ্রামোফোন ডিস্ক থাকত যেগুলো রোজ দরকার হতো। তার পর তাঁর একদিন ছুটি ছিল। মনেও পড়েনি চাবির কথা। মনে পড়ল তার পরের দিন, অর্থাৎ অফিসে যাওয়ার দিন। সুধীন্দ্রনাথ: আমি ছুটতে শুরু করলাম, বুঝলি? ট্রামেও উঠলাম না। দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে লাগলাম।

হাঁফাতে হাঁফাতে গার্স্টিন প্লেসে রেডিয়োর আপিসে পৌঁছে ডিউটি অফিসারের ঘরে গিয়ে দেখেন বন্ধু শামসুল হুদা চৌধুরী বসে আছেন আর মিটিমিটি হাসছেন। সুধীন্দ্রনাথ পকেট থেকে চাবিটা বের করার পর হুদা : ‘কি স্যার, হারিয়ে ফেলোনি তাহলে।’
সুধীন: চাকরিটা আছে না গেছে? বড়সাহেব (বোখারি) নিশ্চই জানেন? কী করব এখন?
হুদা: চা খাও, সিগারেট ধরাও, আমাকেও একটা দাও। আমি গোপনে গোপনে চাবিওলা ডাকিয়ে ডুপ্লিকেট বানিয়ে আলমারি খুলেছি। কপাল ভাল ছিল, সাহেবরা টের পায়নি। একজন দারোয়ান দেখেছে, কিন্তু টুঁ শব্দটি করেনি।

সুধীন: তুমি বলতে চাও আর কেউ জানে না?
হুদা: বলতে চাই না, বলছি। আর কেউ জানতে পারলে তোমার আমার দুজনের চাকরিই যেত। তোমার জন্য বে-আইনি কাজ করলাম, আজ সন্ধেবেলা রিজেন্টে কাটলেট খাওয়াবে।
দেশ ভাগের সময়ে কলকাতা রেডিয়োর মুসলমান কর্মীদের তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে চলে গিয়ে রেডিয়ো পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। একমাত্র হুদা সাহেব যেতে চাননি। ভারতেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। বিদায়ী সহকর্মীদের ফেয়ারওয়েলে হুদা সাহেব তাঁর পাকিস্তানে-চলে-যেতে চাওয়া সহকর্মীদের বলেছিলেন: “তোমরা ঐ দেশের হিন্দুদের কেমন রাখবে, কী চোখে দেখবে তার ওপরেই কিন্তু নির্ভর করবে আমার দেশে আমার অস্তিত্ত্ব, আমার ভাল থাকা।” – সুধীন্দ্রনাথ তাঁর ছোট ছেলেকে জানিয়েছিলেন এসব সেই কবে।

সুধীন: বুঝলি, বছর দুই তিনের মধ্যেই হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা কাকে বলে টের পেয়ে গেলাম পুরোপুরি। হুদাকে উঠতে বসতে অপমান করতে লাগল যে হিন্দু সহকর্মীরা – সকলেই বাঙ্গালি ভদ্রলোক – তাদের স্বরূপ যে এমন তা দেশভাগের আগে জানতে পারিনি। আমি হুদার বন্ধু ছিলাম, পারিবারিকভাবেও বন্ধু ছিলাম আমরা, হুদার স্ত্রী চমৎকার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন, রেডিয়োতেও, তোর মায়ের বন্ধু ছিলেন, তা আমি হুদার বন্ধু তাই আমাকেও ঠেস দিয়ে দিয়ে কথা বলতে লাগল অনেকে। আশ্চর্য, আর কেউ হুদার পাশে এসে দাঁড়াল না। হুদা কিন্তু হাসি মুখে সব সহ্য করত। আমি রেগে যেতাম। হুদা আমায় ঠাণ্ডা করত। … কিন্তু আমিই একদিন ওকে বললাম, হুদা, তোমার এই অপমান তো নিতে পারছি না আর। বাথরুমে গিয়ে কেঁদেছিলাম আমি। তার কিছুদিন পরে হুদা আমায় কাঁদতে কাঁদতে বলল – আমি আর পারছি না। কবে যে কী করে বসব। তার চেয়ে ঢাকায় চলে যাই। ওটা আমার কাছে ‘দেশ’ না। আমার দেশ এখানে। আমি বীরভূমের ছেলে। কলকাতায় বড় হয়েছি। কিন্তু ঢাকাতেই মানিয়ে নিতে চেষ্টা করি, কী করব। – সুধীনও মেনে নিলেন অগত্যা।

সুধীন্দ্রনাথ আমায় আমার ছেলেবেলাতেই বলেছিলেন – বিচ্ছেদের যন্ত্রণা যে কী তা আমি সেই প্রথম টের পেলাম।
আমার ছেলেবেলা থেকে সুধীন্দ্রনাথ তাঁর মৃত্যুর কয়েক দিন আগে পর্যন্ত “বন্ধু” কথাটা উঠলেই শুধু “হুদা হুদা” করতেন। ১৯৫৪/৫৫ সালের পর দুই বন্ধুর আর দেখা হয়নি, কেউ কাউকে চিঠিও দেননি। কী আশ্চর্য। সম্ভবত ইতিহাস ও ভাগ্যের ওপর অভিমান করেই দুই বন্ধু দুই প্রান্তে জীবন কাটিয়ে গেলেন।

১৯৮০ সালে ভয়েস অফ আমেরিকার চাকরি নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে গেলাম। সেখানে প্রথম দিনেই আলাপ হলো ইকবাল বাহার চৌধুরির সঙ্গে। উনি তার অনেক আগে থেকেই ওখানে। বয়সে আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। প্রথম দিনেই আমায় একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন: শামসুল হুদা চৌধুরি নামটা আপনাকে কিছু বলছে?

আমি যা বলার বললাম।
বাহার: আশ্চর্য, সেই পাঁচের দশকের মাঝামাঝির পর আপনার বাবার সঙ্গে হুদা সাহেবের দেখা হয়নি? আপনি এখানে আসার সপ্তাহ দুই আগে উনি আমায় ফোন করে বললেন, “বাহার, ভাল করে শোনো, আমার যৌবনের বন্ধু সুধীন্দ্রনাথের ছেলে সুমন চট্টোপাধ্যায় তোমাদের ওখানে যাচ্ছেন চাকরি নিয়ে, আমি খবর পেয়েছি। মনে রেখো, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছেলে, ওকে দেখে রাখার, ভাল রাখার দায়িত্ব আমি তোমায় দিলাম।”

যে ৫ বছর ভয়েস অফ আমেরিকায় চাকরি করেছিলাম (তারপর ইস্তফা দিয়েছিলাম) ইকবাল বাহার চৌধুরির মধ্যে পেয়েছিলাম এক সহৃদয়, উদার, দায়িত্বশীল, কর্মঠ, সেকুলার সহকর্মীকে। কতো মজাই না করেছি তাঁর সঙ্গে।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের জন্য গান গেয়ে টাকা তুলতে আমি বাংলাদেশ যাই। সেই প্রথম। ঐ যাদুঘরের পরিচালকরা আমায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ঢাকায় গিয়ে প্রথমেই আমি এক নবলব্ধ বন্ধুকে হুদা সাহেবের কথা বলি আমি জানাই যে আমি দেখা করতে চাই কারণ তিনি আর আমার বাবা বন্ধু ছিলেন এবং বাবা ১৯৯৩ সালে মারা গেছেন। সেই ঢাকা-বন্ধু প্রায় আঁৎকে উঠলেন – “ওরে বাবা, শামসুল হুদা চৌধুরি! উনি তো বি এন পি! ভাই, কিছু মনে করো না আমরা তোমায় ওনার কাছে নিয়ে যেতে পারব না।”
দিন চার-পাঁচে খান পাঁচেক অনুষ্ঠান – সময় ছিল না যে নিজে চেষ্টা করব দেখা করতে।

১৯৯৮ সালে একই লক্ষ্যে দ্বিতীয় সঙ্গীত সফরে বাংলাদেশ গেলাম। আবার সময় খুব কম। দেখা করতে যাওয়া হলো না। হুদাকাকার কাছে যেতে পারলাম তার পরের বছর আমার এক আপার মধ্যস্থতায়। তিনি কোনও দল করেন না। – প্রণাম করার পর আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে শুধু কাঁদলেন আর কাঁদলেন আমার পরমাত্মিয়। কান্নার মধ্যেই বলতে লাগলেন, “বাবা, তোমার কাকিমা চলে গেছেন, আমার বন্ধু সুধীন চলে গেছেন, ছেলেমেয়েরা বাইরে, তোমার এই বুড়ো কাকা এখনও বেঁচে। সুধীন চলে গেছে, আমি আছি। আমার কাছে এসে থাকবে, বাবা?”

আমিও কাঁদছিলাম। এখনও তো সেই কান্নাই। বাবা, হুদাকাকার পর এবারে আমার প্রজন্মের পালা।
হুদাকাকা আমায় বলেছিলেন, “বাবা, বীরভূমের মাটির জন্য শুধু কেঁদেই গেলাম, কলকাতার জন্যেও কেঁদে গেলাম সারাজীবন। বিশ্বাস করো – এখানে খুব যে মেলাতে পারলাম তা নয়। দেশ সেই দেশ-ই।”

কাল যা যা হয়েছে তার পর ভাবছিলাম আর এ মুখো হবো না।
কিন্তু আজ, গলার ব্যয়াম করতে করতে ফেস বুক খুলে যা যা দেখলাম তার পর মনে হলো কিছু কথা আমার বলা দরকার – আমায় যাঁরা এখনও ভালবাসেন, সম্মান করেন তাঁদের জন্য অন্তত।

ফেসবুকে কতো লোক আমার সম্পর্কে কতো কিছু লিখেছেন। এতো ধরণের খারাপ কথা, গায়ে পড়ে বলা খারাপ কথা ক’জনকে শুনতে হয়? তাও আমি অনেক সময়ে উত্তর দিয়েছি। সম্ভবত কমিউনিকেট করার এক অদম্য প্রবৃত্তি নিয়ে জন্মেছিলাম বলে। আমার গানেও তো আমি কমিউনিকেট করে এলাম, কতো ঘটনা কতো ব্যক্তিত্বের কথা বললাম। বাংলা ভাষায় কেন, ইংরিজি ভাষাতেও এতো বিচিত্র বিভিন্ন ধরণের গান কেউ বাঁধেননি।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।
জানি না।

আমি যে এইসব লিখছি তা বিশ্বাস হারিয়ে পাপ করে ফেলব এই ভয় থেকে নয়। যারা আমায় অদ্ভূত সব কারণে ঘৃণা, অপছন্দ করেন তাদের জন্য নয়। যারা আমায় আজও অসম্মান করেন না তাঁদের জন্য।

আজকের বিষয়টি নিয়ে লিখলাম – একজনের পোস্ট পড়ে মনে পড়ে গেল এক বাঙ্গালি আমায় জব্দ করার জন্য এই ধরণের কথা লিখেছিল যে কবীর সুমনের বাবার বন্ধু ছিলেন বি এন পি নেতা শামসুল হুদা চৌধুরী। মানে আমার রক্তের মধ্যেই ব্যাপারটা রয়েছে। সেই ব্যক্তি এটা লেখেনি যে হুদা সাহেব যখন আমার বাবার বন্ধু হয়েছিলেন তখন ভারত অবিভক্ত ছিল। তার পর দীর্ঘকাল দুই বন্ধুতে যোগাযোগ ছিল না। ওই লোকটা, আমায় খিস্তি করতে গিয়ে, আমার নামে অপবাদ করতে গিয়ে আমার বাবা এবং আমার বাবার বন্ধু (আমার কাকা) সম্পর্কে কটাক্ষ করল। লোকে, সকলেই বাঙ্গালি, তাকে বাহবা দিল।

লোকটাকে হাতের কাছে কখনও পাবো না। আমি মনে করি বাবা ও মা নিয়ে যারা কটাক্ষ করে তাদের সঙ্গে কথা নয় অন্য ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সেটা পারছি না। কিন্তু আমি বিশ্বাস রাখি নিজেদের জীবনেই এরা সব ফেরত পেয়ে যাবে।

দ্বিতীয় পর্ব

কনিশ মজুমদার।
দেখছি একটি সূত্র ধরে লিখেছেন যে তিনি আমায় বহুকাল ধরে চেনেন ও জানেন যে আমি সব সময়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চেষ্টা করি। – এমনিতে তো লোকে পাত্তা দেয় না তাই লোকের নজর কাড়ার চেষ্টা এইভাবে। – এই হলো শ্রীমান কনিশের বক্তব্যের সারাংশ। এবারে শ্রীমানকে আমি কিভাবে চিনতাম:
২০০৫ সাল হবে (এক বছর আগেও হতে পারে), কলকাতার সাখওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের (বিখ্যাত সরকারি স্কুল) শিক্ষিকারা ও ছাত্রীরা আমায় একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। বেগম রোকেয়ার জম্মদিন। তাঁর জীবনের ওপর একটি নাটক করবেন ছাত্রীরা। আর আমি আমার গান “বেগম রোকেয়া” গেয়ে শোনাব। আমি গিটার নিয়ে হাজির।

হঠাৎ দেখি এক তরুণ এক ক্যামেরাশিল্পী নিয়ে হাজির। সঙ্গে ভিডিও ক্যামেরা। দেখলাম তারা চ্যানেল। আমি নিজেও তখন তারা চ্যানেলে একটি জনপ্রিয় লাইভ আলোচনা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করি। সেই সময়ে, জানি না কোন কারণে, তারা চ্যানেলের এক সম্পাদক বা অমন কেউ (আমি পাকা কর্মী ছিলাম না, ফ্রিলান্সার ছিলাম) বাংলার মাদ্রাসাগুলো সম্পর্কে ভুয়ো খবর দিচ্ছিল। ভিডিও রিপোর্ট। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সাজানো। কয়েক জনকে বলেও আমি ওটা থামাতে পারছিলাম না। তখন আমি তারার একটি বানানো-মাদ্রাসা-রিপোর্টাজ বাড়িতে কপি করে সেটাকে আমার এডিটিং সফটওয়্যারে ফেলে তার সঙ্গে আমার মন্তব্য জুড়ে দিয়ে আর-একটি সংস্করণ তৈরি করি এবং তা থেকে সিডি বানিয়ে সেটি সংখ্যালঘু যুব ফোরামের কাছে পৌঁছে দিই। তাঁরা পদক্ষেপ নেন। তারা চ্যানেলের সেই মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা সাময়িকভাবে হলেও থেমে যায়।

সাখওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে তারার নবীন সাংবাদিক এই শ্রীমান আমাকে দেখেই বললেন – কিছু শুনতে চাই। ভারি মিষ্টি দেখতে ছেলেটিকে। দেখেই বোঝা যায় সাংবাদিকতায় অনভিজ্ঞ। জানালেন তাঁর নাম কনিশ মজুমদার।

আশপাশে তখন স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের হৈচৈ চলছে। মনে রাখতে হবে – বেগম রোকেয়া সাখওয়াত হোসেনের প্রতিষ্ঠা করা স্কুল – আমাদের দেশের এক বিদ্যাতীর্থ। সেখানে হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান সকলেই পড়েন। কনিশ, তাঁর ক্যামেরাম্যান ও আমি দাঁড়িয়ে আছি সকলের মাঝখানে। তিনি আমায় প্রথমেই প্রশ্ন করলেন – বাংলার মাদ্রাসাগুলোয় যে ভারত-বিরোধী শিক্ষা মুসলমান ছেলেমেয়েদের দেওয়া হচ্ছে সে সম্পর্কে আমার কী মত।

অনুমান করতে পারি – শ্রীমানের আজ যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে (এক সুন্দর, তরুণ উঠতি সাংবাদিক থেকে এক মিথ্যেবাদী, অপপ্রচারশীল লোক) তাতে এ সবই অস্বীকার করবেন তিনি।

আমি বেজায় রেগে গেলাম। কনিশকে বললাম – এখানে বেগম রোকেয়ার জন্মদিন উদযাপিত হচ্ছে, এই বিদ্যাতীর্থ তাঁরই হাতে তৈরি। এখানে যথেষ্ট সংখ্যক মুসলমান মেয়ে পড়েন – এ-কী প্রশ্ন! বেগম রোকেয়া সম্পর্কে জানতে চান তিনি বরং। – তাঁর অবস্থা দেখেই বুঝলাম তাঁর ‘বস্’ তাঁকে বলে দিয়েছেন আমায় এই প্রশ্ন করতে, কারণ আমি মুসলমান। ঐ চ্যানেলে যে লাইভ অনুষ্ঠান করতাম (তখনও করে চলেছি) তা শুরুই করতাম – নমস্কার/ আদাব বলে। শেষ করতাম – আসসালামু ওয়ালেইকুম – সকলের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক – এই বলে। আমার আগে আর কেউ কোনওদিন এভাবে অনুষ্ঠান শুরু ও শেষ করেননি। বলা বাহুল্য কোনও কোনও মুসলিমবিদ্বেষী কর্মীর এতে রাগ হচ্ছিল।

কনিশ ও তাঁর ক্যামেরাম্যানকে বুঝিয়ে আমি সাখওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের অনুষ্ঠানের ছবি তুলিয়ে নিই, আমার মতামতও দিই যাতে অফিসে ফিরে কনিশ একটা সুন্দর রিপোর্টাজ বানিয়ে নিতে পারেন।
আমার প্রাক্তন সহকর্মী অনির্বাণ সাধুর ঐসব ঘটনা মনে থাকার কথা।

কনিশের সঙ্গে আমার ভারি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। উনি আমায় জানান – ওঁর বাবামা আমার গানের ভক্ত ছিলেন, কিন্তু বাবা অকালে মারা যান। এই বয়সে পিতৃহীন – এটা জেনে ছেলেটিকে আমি আরও কাছে টেনে নিই। শ্রীমান আমায় জানান তাঁর বাবামা একটা বাড়ি করেছেন এবং বাবার সাধ ছিল বাড়ির নাম রাখবেন – “ইচ্ছে হলো” (আমার একটি গান থেকে)। একদিন কনিশ আমায় দিয়ে “ইচ্ছে হলো” এই কথাদুটি একটি বিশেষ কাগজে লিখিয়ে নিলেন। সেই হাতের লেখা থেকে ফলকে বাড়ির নাম লেখা হবে। এইরকম ছিল আমাদের সম্পর্ক।

গণআন্দোলনের সময়ে কনিশ আন্দোলনের পক্ষে। আমি ভোটে দাঁড়ানোর সময়ে তাঁর পূর্ণ সায় ছিল না। কিন্তু কনিশ আমার এতোটাই প্রিয় ও অভিজ্ঞতা এতো কম যে কারণটা তাঁকে সময় নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।

আমি এম পি হয়ে গেছি – কনিশ বিয়ে করলেন। তাঁর বৌভাতে গিয়ে দেখি – দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছে – যেখানে বৌমাকে বসানো হয়েছে সেখানে এবং সেই বড় ঘরটির নানান জায়গায় আমার নানান গানের লাইন হাতে লিখে সেঁটে দেওয়া। এমন দৃশ্য জীবনে দেখিনি।
এর পর শ্রীমান একদিন আমায় জানালেন তিনি অন্য ধরণের কাজ নিয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে যাচ্ছেন। আমার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কনিশ, অনির্নাণ সাধু, সন্দীপন চক্রবর্তী, সন্দীপন রায় – এই সব তরুণ টেলিভিশনকর্মীরা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আমার সন্তানের মতো। আজও তাঁরা সেরকমই।

এর পর কনিশের মায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ছেলের বিয়েতেই দেখা হয়েছিল। আলাপ শুরু হলো তার পর। শ্রীমতী স্বপ্না মজুমদার এক শান্ত, বিষণ্ণ মানুষ। তিনি ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে চাকরি করতেন। বারবার আমায় বলতেন – আমার অবসর নেওয়ার সময় হয়ে এলো, আপনার প্রকাশককে বলুন আপনার বইগুলো নিয়ে আমার কাছে আসতে, আমি তাহলে আপনার বইগুলো জাতীয় গ্রন্থাগারে রাখার ব্যবস্থা করে দেবো। অনেক বার খুঁচিয়ে আমার প্রকাশককে (সপ্তর্ষি প্রকাশনীর সৌরভ মুখোপাধ্যায়) শ্রীমতী মজুমদারের কাছে পাঠাতে পেরেছিলাম। সৌরভ অন্তত তাই জানিয়েছিলেন আমায়।

২০১১ সালে আমার যখন ভয়ঙ্কর নিউমোনিয়া হলো আমি টালিগঞ্জের সরকারি হাসপাতাল বাঙ্গুরে ভর্তি হলাম। কনিশের মা শ্রীমতী স্বপ্না মজুমদারও এসেছিলেন আমায় দেখতে। কথা বলার অবস্থায় ছিলাম না। নাকে মুখে নানান নল।
কনিশের সঙ্গে, কালক্রমে ওর মায়ের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ কমে এসেছিল। সকলেই ব্যস্ত।

আমার সম্পর্কে শ্রীমান কনিশ মজুমদার যে ধরণের কথা লিখছেন এবং যে ভঙ্গিতে তার কোনও কারণ দেখতে পাচ্ছি না। তাঁর সঙ্গে বিরোধ তো কোনওদিন ছিলই না বরং আদরের সম্পর্ক ছিল। আমায় তিনি ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যেভাবে দেখেছেন তাতে এইসব কথা তো লেখার কথা নয়। ২০০৭ সালে আমি তারার মতামত অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের পদ ছেড়ে দিই – ‘সিঙ্গুর’ ‘নন্দীগ্রাম’ এই কথাগুলো এই অনুষ্ঠানে আর বলা যাবে না – এই ফতোয়া কর্তৃপক্ষ জারি করার পর। কাজেই কনিশের সঙ্গে আর নিয়মিত দেখাও হতো না।

উনি আমায় দেখতেন গণ-আন্দোলনের সভাগুলোয়, মিছিলে।
আমি ভোটে জেতার পর তাঁকেও অনন্দ করতে দেখেছি আমার সামনে। তাঁর বিয়েতে গিয়েছি (বড় একটা যাই না কোথাও, কনিশ তো আমার ছেলে, ওর বিয়েতে আবো না!) যখন, আমি তখন এম পি। তার পর তিনি ব্যাঙ্গালোরে।
মাঝে আর দেখা হয়নি।

কিছুতেই ভেবে পেলাম না কোন কারণে শ্রীমান কনিশ মজুমদার এমন উদ্ভট,বাজে কথাগুলো এইভাবে লিখলেন, একবার নয়, বারবার, এবং সেই সঙ্গে জানালেন যে তিনি আমায় দীর্ঘকাল ধরে চেনেন। কিভাবে চেনার সুযোগ হয়েছিল তা জানালাম। ২০০৫ সালের আগে আমাদের দেখাও হয়নি। তিনি আমার চেয়ে সব দিক দিয়েই অনেক ছোট, কাজেই আমার বন্ধু তিনি ছিলেন না ঠিক। বন্ধু হওয়াড় জায়গায় তিনি কখনও আসেননি।

আমাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল না। আমরা একসঙ্গে পলিটিক্স করিনি, রাস্তায় মিছিল করিনি, মারপিট করিনি, পুলিশের সামনে দাঁড়াই নি, সংগঠন করিনি, গানবাজনা করিনি – তেমন কিছুই করিনি যে তিনি আমার স্বভাব জানতে পারবেন ঘনিষ্ঠভাবে।
আমি সমকামী নই। শ্রীমান কিনা জানি না। দুজনে প্রেমে পড়ে একসঙ্গে থাকিনি – এটা জানি। কোনও রেস্তোরাঁয় বসে বা কফি হাউসে তাঁর সঙ্গে গুলতানিও করিনি।

অতএব শ্রীমান কনিশ মজুমদার কেন এমন লিখলেন, লিখছেন ও লিখবেন তা তিনিই জানেন।
তাঁকে সব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য, আমায় যারা শত্রু সাব্যস্ত করেছে তাদের জন্য এটা লিখলাম না। লিখলাম আমায় যাঁরা এখনও – ভগবান জানেন কেন – সম্মান করেন তাঁদের জন্য।
পড়ে মজা পেলেন তো?

তৃতীয় পর্ব

কালও আমার পরিবারের মানুষরা আমায় বলছিলেন – তুমি কিছু বলো না।
ঠিকই।

কিন্তু…ঐ যে… স্বভাব!
গতকাল, বাংলা বছরের প্রথম দিনে এ বি পিতে যে লেখাটি বেরিয়েছে তা আমি এখনও পড়িনি। তবে সেটি সম্পর্কে যা লেখা হচ্ছে তা থেকে বুঝতে পারছি।
ইতিহাস:

১৯৯২ সালে আমার তোমাকে চাই, তারপর শ্রীযুক্ত নচিকেতা, শ্রীযুক্ত অঞ্জন, শ্রীমতী মৌসুমীর গানের এলবাম বেরনোর পর আনন্দবাজারে এক ক্রিড়াসাংবাদিককে দিয়ে একটা লেখা লেখানো হয়। কোনও সংগীত-সাংবাদিক লেখেননি। লেখাটা পড়ে যে-কোনও স্বাভাবিক, সুস্থ পাঠকের বোঝার কথা ছিল – আমাদের নিয়ে তামাশা করার জন্যেই লেখাটি বের করা হলো।
এরপর আনন্দবাজারে এক সঙ্গীত-রিভিউকারি আমার অনুষ্ঠান সম্পর্কে ঠাট্টা করে লেখেন: “আর-একজন আছেন, তিনি তো আবার সব্যসাচী। দুহাতে যন্ত্র বাজান…।“
কোনওদিন কোনও স্বাভাবিক রিভিউ বেরোয়নি।

++++

১৯৯৫/৯৬ সালে কলকাতার এক সিপিএম-অভিনেতা আমার নামে পুলিশকে জানান আমি নাকি তাঁকে টেলিফোন করে গাল দিচ্ছি।
পুলিশ আমায় তলব করেন। কমিশনারকে আমি বলি – আমায় লাই ডিটেকটরে বসান না, তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। চুপ করে গিয়েছিলেন বেচারি। বুঝতে পারছিলাম ভদ্রলোকের ওপর সরকারের চাপ আছে। আমাদের আলোচনা থেকে কিছুই বেরলো না। ভদ্রলোক আমায় সেভাবে শাসালেনও না। কারণ ওনার জানার কথা যে অভিযোগটা মিথ্যে। বেরনোর সময়ে উনি আমায় বললেন – বাইরে ফোটোগ্রাফাররা অপেক্ষা করছে। আপনাকে বিব্রত করবে।
আমি বললাম – সাংবাদিকদের অধিকার আছে।
কমিশনার সাহেব বললেন – আপনারও অধিকার আছে নিজের সম্মান বাঁচানোর।
সত্যিই শিক্ষিত, ভদ্র মানুষ। আশা করি তিনি ভাল আছেন। তাঁর মঙ্গল হবেই।

আমি পেছনের দরজা দিয়ে বেরোইনি। সামনে দিয়েই বেরোলাম। সামনে কয়েকশো ফোটগ্রাফার। মনে হচ্ছিল – আমি ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ঝলসে উঠছিল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। শটের পর শট। আমি স্থির দাঁড়িয়ে। শেষে আনন্দবাজারের এক নামজাদা ফটোগ্রাফার আরও কয়েকটা বাড়তি শট্‌ নিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে চলে গেলেন। আমার ধারণা, ধর্ষণ করার পর রেপিস্টরা এই রকম করে।

++++++

তার পরের দিন কীসব লেখা যে বেরলো…সঙ্গে সেই ছবিটা।

++++++

আমার গানের অনুষ্ঠান কিন্তু কমাতে পারল না বাম-সরকার। উলটে শ্রীমতী মাধবী মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রথম ছবি আত্মজার সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আমায় নিলেন। শ্রী চিরঞ্জিত তাঁর ভয় ছবিটের জন্য আমার কাছ থেকে দুট গান নিলেন।

++++++

সেই অভিনেতা, যাকে আমি নাকি টেলিফোনে গাল দিতাম, পরের বিধানসভার ভোটে বামফ্রন্টের টিকিটে দাঁড়াল। সি পি এম প্রার্থী। আহা, তৃণমূলের শ্রীযুক্ত তাপসের কাছে বিষ্ঠা-হারান হারল।

+++++

কানোরিয়া জুট মিলের লক আউট শ্রমিকদের আন্দোলনে আমি ছিলাম বলে এই মহান পত্রিকা মাঝেমাঝেই ঠুকত আমায় তাদের রাজনৈতিক মন্তব্যে।

+++++

২০০০ সালে আমার প্রাক্তন স্ত্রী আমার নামে ৪৯৮-এ ধারায় মামলা করেন। এই ধারাটির সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার হয়ে আসছে ভারতে। আমার নামে হুলিয়া বেরলো। আমি ডুব দিলাম। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগল আমায়। আর বাংলার বেশিরভাগ বড় কাগজে, প্রায় সব কাগজে ও পত্রিকাতেই আমার নামে কুৎসার বন্যা বইয়ে দেওয়া হলো। এমন অবস্থা হলো যে আমার হয়ে কোনও উকিল দাঁড়াতে চাইছিলেন না। Trial by media একে বলে। অনেক কষ্টে একজনকে পাওয়া গেল। কাগজে কাগজে, চ্যানেলে চ্যানেলে আমায় ধর্ষণ করা চলছে। আমি কলকাতাতেই লুকিয়ে। আইনটা এমন যে ধরা পড়লেই জেল। এবং এই মামলা প্রত্যাহার করা যায় না। বধু-নিগ্রহ মামলা। জজেও ভয় পায়।

আনন্দবাজারের আনন্দলোক পত্রিকায় ‘গানওলার কেচ্ছা’ নামে সচিত্র নিবন্ধ ছাপালেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। চমৎকার সভ্য রুচিশীল সাংবাদিকতা ও “সম্পাদকতার” নজির রাখলেন তিনি বাংলায়। আহা। আহা অকালে মারা গেলেন। বড় গুণী মানুষ। ছিলেন।

+++++

যেভাবে রাজ্য জুড়ে বিচিত্র আক্রমণ চলল কয়েক মাস – আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে সে আত্মহত্যা করত।

+++++

কত কী চেষ্টা করল মিডিয়া, সরকার, পার্টি – ওঃ আজকাল পত্রিকা তখন পারলে আমায় রাস্তায় ফেলে ধর্ষণ করে, কুপিয়ে মারে — এমন ভাব।

+++++

কিন্তু মামলাটা এতোই বানানো ছিল, “মেরিট” এতই কম যে আদালত আমায় আগাম জামিন দিতে বাধ্য হলেন। আমিই ভারতের প্রথম ৪৯৮এ খাওয়া নাগরিক যে আগাম জামিন পায়। তার পর থেকে অনেকে জামিন পেয়েছেন আমার মামলার রায় দর্শিয়ে। কিন্তু ধারাটা ছিল জামিন-অযোগ্য।

অতো মিথ্যে কথা বললে চলে?
আগাম জামিন পেলাম। সেই খবর কিন্তু মিডিয়ায় বিশেষ বেরলো না। মামলাটায় আমি বেকসুর খালাস পাই। সরকার কোনও সাক্ষীকেও হাজির করতে পারেন নি। কী করে পারবেন। মিথ্যে সাক্ষ্য দিতে হতো যে! মুশকিল।
এই খবরটাও মিডিয়ায় বেরোয়নি।
তবে একটি বিশেষ বাম-দলের সদস্যরা রটিয়ে গিয়েছেন যে আমি আমার প্রাক্তন স্ত্রীকে খুন করেছি।

+++++

এর পর মিডিয়া কিছুকাল ভোম্বল সেজে বসেছিল। উলটে, একদা-বেজায় শত্রু আজকাল (গুরুদেব!!!) আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করল। উফ্। আমি লিখতে শুরু করলাম। মনমেজাজ কলামটা। – এই হলো জীবন।
আনন্দবাজারেও আমি নিবন্ধ লিখেছি একাধিক। কর্তৃপক্ষই আমায় লেখার ফরমাশ দিয়েছেন নানান সময়ে।
কিন্তু…কিন্তু…

২০০৯ সালে আমি ভোটে দাঁড়ানোয় আনন্দবাবাজির মহা গোঁসা। আনন্দ-চ্যানেল (স্টার-আনন্দ ছিল বোধহয়) তাদের এক প্রিয় সমীক্ষককে দিয়ে (আহা রে, তিনি আবার আমারও বন্ধু ছিলেন) হিসেব কষে বের করে ফেলল যে যাদবপুর কেন্দ্রে আমি ৪০ হাজার ভোটে হারছি। বেচারারা বারুইপুরে যে এস ইউ সি আই এর ৪০ হাজার ভোট আমি পাবো সেই ফ্যাক্টরটা বাদই দিয়ে দিয়েছিল। আহা রে। আনন্দ-সমীক্ষক আমার সেই বিশেষ বন্ধুটি (বড় ভালো মানুষ ছিলেন) অকালে মারা গেলেন। বিধাতার কী যে লীলা!!!!!!

ভোটের কয়েক দিন আগে দেবাশিস নামে এক আনন্দ-সাংবাদিক আমাদের বড়িতে এসে হুজ্জুত করতে শুরু করলেন – তাঁকে সাক্ষাৎকার দিতে হবে, আমি নাকি বলে রেখেছি। টিপিকাল আনন্দ-মিথ্যে। কাউকে কিছু বলে রাখিনি। আমাদের বাড়িতে তখন আমার বান্ধবী চন্দ্রাবলী ছিলেন। আমার সেই সময়কার সেক্রেটারি বাইরে। তাই চন্দ্রাবলীকে বলেছিলাম থাকতে। ঐ সময়ে একা না থাকাই ভাল। বাইরে আনন্দ-চেঁচামেচি শুনে আমি চন্দ্রাবলীকে বললাম ওদের ভেতরে ডাকতে। তা, সেই আনন্দ-দেবাশিস এলেন। আমি বললাম, কেন ফালতু গুলটা দিলেন। আমি তো আপনাকে কোনও কথা দিইনি। আনন্দ-দেবু দাঁত বের করে হাসলেন। আধ ঘন্টার ওপর হলো। ভোটের ঠিক দুদিন আগে আনন্দবাজারের প্রথম পৃষ্ঠায় দেবুবাবুর প্রতিবেদনটি বেরলো। তাঁর বক্তব্য – কবীর সুমন হারছে। সেই লেখায় দেবুবাবু এমন ইঙ্গিত দিলেন যেন আমি তাঁকে এপয়েন্টমেন্ট দিয়েও তা রাখতে চাইনি। আমাদের সাংবাদিকরা যে কবে স্বাভাবিক হবেন। – লেখার মধ্যে আনন্দ-রিপোর্টার সকলের আনন্দের জন্য জানিয়ে দিলেন যে বাড়িতে চন্দ্রাবলী (নাম সমেত) নামে এক লাস্যময়ী মহিলা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন – আহা, কী মধুর ইঙ্গিত। যেন আমি ও আমার বন্ধবী ওই পত্রিকার টাকায় খাই, ঘুমোই। ভাবুন, পলিটিকাল রিপোর্ট।
আহা, কতম চেষ্টাম করিলেনম আনন্দম্ আমাকেম হারানোরম জন্যেম। কিন্তু আমি জিতলাম। আমরা জিতলাম।
+++++

এর পর একদিন এক আনন্দ-ফটোগ্রাফার এলেন, বললেন কাগজের জন্য কিছু ছবি দরকার – কিসের? আমি যে গানের ক্লাস নিই সেই গানের ক্লাসের।

এলেন তিনি। রবিবার সকালে। আমার ছাত্রছাত্রীরা কতো আশা নিয়ে বসলেন – আহা অত্তো বড় পত্রিকায় ছবি উঠবে। আমার ইস্টুডেন্টদের মধ্যে পুরুষ মহিলা মোটামুটি সমান সমান। নানা ভাবে ছবি উঠল। ওমা, বেরলো যখন – দেখি পুরুষদের ছবি ভোঁকাট্টা। শুধু মেয়েরা! আহা! তাই যদি হতো – পালে পালে মহিলা যদি আসতেন গান শিখতে??? –
আনন্দ-সম্পাদকরা শুধু কবীর সুমনের ছাত্রীদের ছবি ছাপলেন।
কী দোষ করলেন ছাত্ররা?
কবীর সুমন যে আসলে ‘মহিলাবাজ’ তার ইঙ্গিত। দ্যাখো দ্যাখো গানের ক্লাসের নামে এই কবীর সুমনের হারেম।
এই হলো আনন্দ-সাংবাদিকতা।

এই কাগজে আমি সুমনামি লিখেছি। না আনন্দবাজার আমায় বলেনি। সত্যটা হলো – আমার এক প্রিয় লেখক-কবি-মানুষ শ্রী চন্দ্রীল ভট্টাচার্য আমায় এই অফারটা দিয়েছিলেন অন্য একটি পত্রিকার জন্য। আমি রাজি হয়েছিলেম। কিছু দিন পরে চন্দ্রিল আমায় জানালেন তিনি আনন্দবাজারে যাচ্ছেন, আমি আমার কলামটি তাও লিখতে চাই কিনা? আমি তো আগেই রাজি হয়েছিলাম – চন্দ্রিল বলেছিলেন বলে। এখনও তিনিই বলছেন। আমি পেশাদার। লেখাপিছু টাকা পাবো –দুহাজার। আনন্দ দিলে সেখানেই লিখব! লিখেছি। আর লিখব না।

++++

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress