চন্দ্রিলিয়ে

চন্দ্রিলিয়ে ১

“A good cricketer plays also from his memories”: An old saying.
শিল্পসাহিত্যের অনেকটা জুড়েই স্মৃতি। আমার জীবনসায়াহ্ণে এই লেখাগুলোর মধ্যে স্মৃতির ভূমিকা বড়। সেই সঙ্গে অর্জিত অভিজ্ঞতা। সুর তাল ছন্দ আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা যা আমার মনে আছে। আমার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বময় ঘটনার সঙ্গে সুর জড়িয়ে। বসে বসে ভাবা আমার স্বভাবের বাইরে। ভাবতে গেলে আমায় বই পড়তে হয় বা কাগজে আঁকিবুঁকি কাটতে হয়, কিছু লিখতে হয়, বা সুর ভাঁজতে হয়। আমার কাছে সুর মানে গান নয়। সুর হলো গানের একটি উপাদান মাত্র।এই যে লিখতে বসেছি, ভাবতেও শুরু করেছি আমি।

অল্প কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি খেতাব নিতে গিয়ে দেখা পেলাম দীর্ঘ অদেখার পর সরোদশিল্পী বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর। ওস্তাদ, পণ্ডিত এসব আর লিখি না। ইদানিং গলার আড় না ভাঙা অর্বাচীনদের নামের আগেও ঐ দুটি শব্দ বসানোর রেওয়াজ দাঁড়িয়ে গেছে এই অভিশপ্ত দেশে।

বছর দেড়েক তো হয়েই গেল শর্বরী দাস ও ভিশ্ওয়াশ্ কুল্কার্নির প্রচণ্ড চেষ্টায় আই সি সি আর-এর উদ্যোগে মুম্বই শহরে বাঁশের বাঁশির দেবতা পান্নালাল ঘোষের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে একটি অনুষ্ঠান হয়। ভারতের একজন সাংসদ হিসেবে আমি এই শিল্পীর জন্মশতবর্ষের কথা দেশের প্রধানমন্ত্রী ও লোকসভার স্পীকারকে দু’বার চিঠি লিখে জানিয়েছিলাম এক সময়ে। পান্নালাল ঘোষের শততম জন্মদিনের প্রায় শত দিন আগে। আশা ছিল – লোকসভায় ঐ দিনে স্পীকার কিছু বলবেন এবং ভারত সরকার এই জন্মশতবর্ষ ঘটা করে না হলেও উদযাপন করবেন। প্রধানমন্ত্রী বা স্পীকার কেউই আমার একটি চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার পর্যন্ত করেননি।পান্নালাল ঘোষের জন্মশতবর্ষ ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদযাপন করেননি। উদযাপন করেছিলেন বাংলাদেশ সরকার। শুনেছি তিন দিন ধরে।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের দেড়শ’তম জন্মদিনের ক্ষেত্রেও আমার কপালে একই নিরবতা জুটেছিল। প্রায় দু’মাস আগে থেকে আমি প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার ও বিরোধী দলীয় নেতাকে চিঠি দিয়ে মনে করাতে থাকি। আমার প্রস্তাব ছিল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের লেখা Autobiography of a Bengali Chemist বইটির সুলভ সংস্করণ বের করুন ভারত সরকার। আচার্য তাঁর এই বইটি উৎসর্গ করেছিলেন ভারতের তরুণদের। ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন জওহরলাল নেহেরু। আমার চিঠিতে এসবেরও উল্লেখ ছিল।
সেই সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রীর কিছু সিদ্ধান্ত ও নীতির বিরোধিতা করছিলাম বলে (শেয়ার করতে গিয়ে এইসব প্রসঙ্গ এবং আজকের সময়ের প্রসঙ্গ তুলে কেউ যদি কোনও কুমন্তব্য, আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন তো তার মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তির বংশপরিচয় ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ পাবে না/ ঐ ধরণের ইতরদের জন্য আমি এই লেখা লিখছি না/ তোরা মরে যাওয়ার পর তোদের কথা ভুলে যাবে লোকে;আমি মরার পরেও আমার কিছু গান মনে রাখবে বাঙ্গালি জাতির কেউ কেউ) দলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। তাই আমি দলের অন্য সাংসদদের (যাঁরা আমার সঙ্গে আগাগোড়া ভাল ব্যবহার করে এসেছেন) অস্বস্তি এড়ানোর জন্য বেশি যেতাম না সংসদে। কিন্তু আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের দেড়শ’তম জন্মদিনে হাজির ছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম – স্পীকার তাঁর আসন নিয়েই ঘোষণা করবেন এই দিনটির গুরুত্বের কথা। করলেন না। রিসেসের সময়ে তাঁর ঘরে গিয়ে আমি জানতে চাইলাম কেন উল্লেখ করলেন না তিনি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্মদিনের কথা। তিনি বললেন, “আপনি আমায় কাল মনে করিয়ে দিলেন না কেন?” – আমি বলেছিলাম, “আপনাকে আমি দুটি চিঠি দিয়েছি গত দেড় মাসে। আপনার দপ্তর কি খেয়াল রাখেন না দেশের এতো বড় মাপের কৃতী সন্তানদের জন্মদিন কবে?” তিনি চুপ করে ছিলেন। বেরিয়ে এসেছিলাম আমি। আর কখনও লোকসভায় যাইনি আমি।

পান্নালাল ঘোষের জন্মশতবর্ষও মনে থাকেনি তাঁর দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের। অথচ সেই সরকারের এক কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার সম্প্রচার মন্ত্রী বাঁশির দেবতাকে না-খেতে-পেয়ে মরার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। বালকৃষ্ণ ভিশ্বনাথ কেসকার (১৯০৩-১৯৮৪) ১৯৫২ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার সম্প্রচার মন্ত্রী হন। ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ ঐ পদে ছিলেন তিনি। বাবার কাছে তাঁর কথা অনেক শুনেছি ছেলেবেলায়। তিনিই ভারতের প্রথম কেন্দ্রীয় ‘বৃন্দ বাদ্য’ দল তৈরি করেছিলেন। হিন্দি ছবির গানের কট্টর বিরোধী ছিলেন তিনি। সেই ফিল্মি গানার প্রভাব রুখতে তিনি আকাশবাণীতে ‘সুগম সঙ্গীত’ (বাংলায় “রম্যগীতি”) ইউনিট খোলেন প্রতিটি কেন্দ্রে। নতুন নতুন মিউজিক স্টুডিয়ো তৈরি হয় প্রতিটি কেন্দ্রে। সঙ্গীত প্রযোজক, সুরকার, গীতিকার ও যন্ত্রীদের চাকরি দেওয়া হয়। ভারতের নানান ভাষায় আধুনিক গান তৈরি ও রেকর্ড হতে থাকে।

সেই বি ভি কেসকার খবর পান পান্নালাল ঘোষ চরম দারিদ্রে দিন কাটাচ্ছেন কলকাতায়। পান্নালাল বোম্বাই গিয়ে সেখানকার ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছিলেন কিছুদিন। কিছু ছবির সঙ্গীত পরিচালনাও করেছিলেন। বোম্বাইতেই তিনি, যতদূর জানি, দেখা পান আচার্য আলাউদ্দিন খান সাহেবের, যিনি পান্নালালকে তালিম দিতে থাকেন। বোম্বাই-এর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি পান্নালাল। তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। কিন্তু এখানকার ইন্ডাস্ট্রির কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেন। পান্নালাল আর কাজ পেলেন না। চরম দারিদ্রে দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি। এমন সময়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বি ভি কেসকার সটান কলকাতায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। শুনেছি, এতই অনটন ছিল পান্নালালের সেই সময়ে যে মন্ত্রীকে চা খাওয়ানোর সামর্থ্যও ছিল না তাঁর। পাশের বাড়ি থেকে ধার করে আনতে হয়েছিল।

কেসকার সাহেব পান্নালালকে ‘বৃন্দ বাদ্যের’ পরিচালক ও আকাশবাণী দিল্লির প্রযোজকের চাকরি দেন। দিল্লি চলে গিয়ে প্রাণে বাঁচেন পান্নালাল ঘোষ।

এ-হেন পান্নালাল ঘোষের জন্মশতবর্ষ পালনে ব্রতী হন কলকাতার শর্বরী দাস ও পান্নালালের ঘরাণার এক বাঁশিশিল্পী ভিশ্‌ভাশ্‌ কুলকার্নি। তাঁদের চেষ্টায় আই সি সি আর মুম্বইতে একটি অনুষ্ঠান করেন। শর্বরীর বন্ধু আমি, তাই আমিও আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। পান্নালালের তৈরি রাগ ‘নূপুরধ্বনি’র ওপর একটা বাংলা গান বেঁধেছিলাম আমি। সেটাই গাইতে গেলাম সেই অনুষ্ঠানে। সঙ্গে গিটার। বাকি সব শিল্পী তানপুরা, তবলা, হারমোনিয়ম, সারেঙ্গি সহযোগে খেয়াল গাইছেন কেবল আমি গিটার কোলে মঞ্চে বসে বাংলা গান গাইছি।

আমার নামটা তো ঘোষণা করা দরকার। স্মার্ট, পেশাদার ঘোষক জানতে চাইলেন, “স্যার, কী বলব? ওস্তাদ?”
এই হলো আজকের সময়।

শ্রী কবীর সুমন।
কাজেই, বাঙলার সরোদশিল্পী বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর নামের আগে ওস্তাদ, পণ্ডিত কিছুই বলছি না আমি।
সেদিন, সরকারি খেতাব নিতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে যখন দেখা হলো তিনি বললেন, “তোমার বাবার একটা ছবি দিতে পারবে আমায়? তোমার বাবা যদি না থাকতেন আমি কিন্তু ‘আমি’ হতাম না”।

অনেক কাল আগে বাবার কাছেই শুনেছিলাম। বুদ্ধদেববাবু তখন মস্ত বড় চাকরি করেন সম্ভবত সি ই এস সি-তে। ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন তিনি। বাবার চাকরি অতি সাধারণ – আকাশবাণীতে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আকাশবাণীর সরোদ শিল্পী। কিন্তু, এমনই তাঁর চাকরির হ্যাপা যে আকাশবাণীর কর্তৃপক্ষ রেকর্ডিং-এর যে সময়টা তাঁকে দেন সেই সময়ে তাঁর পক্ষে স্টুডিয়োয় এসে রেকর্ড করা সম্ভব নয়। – বাবা আমায় বলেছিলেন, ‘আমি দেখলাম, এটা তো হতে দেওয়া যায় না। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আকাশবাণী কলকাতায় বাজাবেন না! কয়েকজনকে কন্‌ফিডেন্সে নিয়ে আমি একটা ফন্দি আঁটলাম। বুদ্ধেদেবের যখন ফুরসৎ হবে উনি আমায় জানালেই আমি ব্যবস্থা করে রাখব। একটা স্টুডিয়ো, একজন তবলাশিল্পী আর তানপুরো ছাড়ার একজন তৈরি থাকবে। বুদ্ধদেব চলে আসবেন। আমরা চুপচাপ রেকর্ড করে নেব। তারপর তাঁর অনুষ্ঠানের দিন নির্ধারিত সময়ে সেটাই চালানো হবে’।
এই কাজটা ছিল সম্পূর্ণ বে-আইনি। চরম ঝুঁকি নিয়ে এই কাজটা করে গেছেন আমার বাবা। কতদিন করেছেন তা আমায় বলেননি। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কি বলেছেন? জানি না। হয়তো বলেছেন। ধরা পড়ে গেলে বাবা সাসপেণ্ডেড হতেন। অন্য সহকর্মীদের কিছু হতো না। কারণ, তাঁদের পাছে কিছু হয় (সেই রেকর্ডিস্ট, তবলাশিল্পী ও তানপুরাশিল্পী) তাই বাবা তাঁদের কাছে সাদা কাগজে লিখে সই করে দিয়েছিলেন যে এই কাজটি তাঁরা করছেন সম্পূর্ণভাবে সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশে।
সরোদে আমাদের গর্ব বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সত্যিই এই জায়গায় পৌঁছতে পারতেন না যদি সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় নামে কলকাতা বেতার কেন্দ্রের এক অফিসার না থাকতেন। বেতারে নিয়মিত অনুষ্ঠান না করলে শিল্পী হিসেবে দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না, বিশেষ করে ধ্রুপদী সঙ্গীতে। দেশের নানান জায়গায় কন্‌সার্ট বুকিং-ও হতো বেতার-অনুষ্ঠানের দৌলতেই। ঐভাবে ধ্রুপদী সংগীতের শিল্পীদের নাম ছড়িয়ে পড়ত সারা উপমহাদেশে।

তারও অনেক আগে, আমার জন্মের সাল নাগাদ, এক প্রতিভাবান বাঁশিশিল্পী আকাশবাণী কটক কেন্দ্রে স্টাফ আর্টিস্টের চাকরি পান। সেটাই তাঁর জীবনের প্রথম চাকরি। সুধীন্দ্রনাথ তখন কটক কেন্দ্রে এক সাধারণ অফিসার। যুবকটির বাজনা শুনে সুধীন্দ্রনাথের মাথা ঘুরে যায়। অনেক পরে তিনি আমায় বলেছিলেন, “বুঝলি, আমি দেখলাম – এ তো জিনিয়াস রে! ছটফটে ছেলেটা বাঁশি নিয়ে ম্যাজিক করছে। কোথায়? এ আই আর-এর কটক স্টুডিয়োয়!! ইম্‌পসিব্‌ল্‌। এটা চলতে দেওয়া যায় না। এর জায়গা বম্বে। একমাত্র বম্বের ফিল্‌ম্‌ ইন্ডাস্ট্রি এর প্রতিভাকে ব্যবহার করতে পারবে, এর প্রতিভার আরও বিকাশ ঘটবে সেখানে। একমাত্র সেখানে। … ছেলেটিকে ডেকে আমি সব বললাম। ছেলেটি প্রথমে ভয় পেয়ে গেল। ভাবল ওর কাজে আমি খুশি নই তাই ওকে ভাগাতে চাইছি। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম – পান্নালাল ঘোষের পর এমন জিনিয়াস আর আসেনি বাঁশিতে। তুমি বাবা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দাও। ফিল্ম মিউজিক টিউজিক নিয়ে খবরদার কিছু লিখবে না। লিখবে পারিবারিক কারণে তোমার ও তোমার, ধরো, বৃদ্ধ অসহায় বাবামায়ের খুব উপকার হবে তুমি যদি এ আই আর বম্বেতে বদলি হতে পারো। আমিও লিখছি আমার দিক থেকে’।

দু’জনে মিলে অনেক চিঠি লিখলেন। কাজ হলো। জিনিয়াস যুবকটি বম্বেতে বদলি হলেন।
২০০৬ সালে আমার মা মারা যান। তার আগের বছর (সম্ভবত) তাঁর এক বন্ধু মাকে জানান যে কোন্‌ এক পত্রিকার সাক্ষাৎকারে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া বলেছেন (আমি প্যারাফ্রেজ করছি), “One Mr. Chatterjee played a very important role in my getting transferred from AIR, Cuttack, to AIR, Bombay. And that made me.”

চন্দ্রিলিয়ে ২

‘যুদ্ধ’ কথাটা শুনলেই ভয় আর বিরক্তি আসে। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শুনলে আসে না অনেকেরই। তাঁদের মধ্যে আমিও আছি। অথচ যুদ্ধে রুচি নেই। আমার এক প্রয়াত বন্ধু ও গানের সহযোদ্ধা, মহারসিক কমল সরকার (মনীষ) তাঁর একটি গানে লিখেছিলেন: ‘এ লড়াই সেই সে লড়াই/ সকল লড়াই ঘুচিয়ে দেওয়ার,/ এ-লড়াই বহুদিনের/ বাকির হিসেব চুকিয়ে দেওয়ার।/ এ-লড়াই আঁধার চিরে আলোর তোরণ পরশ করার,/ এ-লড়াই তোমার আমার/ এ-লড়াই সর্বহারার’।

কমলদা নকশালপন্থী ছিলেন বলে আমাদের সরকারি বামরা তাঁকে ও তাঁর গানগুলিকে অচ্ছ্যুৎ করে রেখেছিলেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গণ-গায়েনে ছিলেন কমলদা। আর ছিলেন গানে আর অনর্গল ঠাট্টাতামাশায়।

প্রথমবার জার্মানি থেকে ফেরার পর যখন পুরনো বন্ধু অমিত রায়ের ডাকে তাঁদের গণসঙ্গীত দলে যোগ দিই, তখনই কমলদার সঙ্গে ও তাঁর সৃষ্টিগুলির সঙ্গে আলাপ। তারপর, (অমিতের কাছে ক্ষমা চেয়ে) ভিয়েতনাম-ভালো-না-কম্পুচিয়া এই বিতর্কের আতিশয্যে আমরা কেউ কেউ যখন বেরিয়ে আসি বাংলা গান আঁকড়ে ধরে, কমলদাও আসেন। অমিত কিন্তু আদ্যন্ত গানপাগল ছেলে। সুররসিক। কিন্তু সেই সময়ে কাম্পুচিয়াপন্থী হয়ে পড়েছিল। তাই বলে আমাদের বন্ধুতায় চিড় ধরেনি। তার অনেক বছর পর মেট্রো চ্যানেলে মমতার অনশন মঞ্চে অমিতের সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়। সি পি আই এমের বিরুদ্ধে লড়াই-এ আমরা সব এক হয়ে গিয়েছিলাম। খাঁটি মানুষ অমিত।

যাই হোক। আমরা যখন ১৯৭৯ সালে আলাদা হয়ে গিয়ে আমাদের বাড়িতে বৃন্দগানের মহড়া শুরু করলাম তখন আমাদের এক বন্ধু তাপস (সুনীল) আমাদের দলের নাম প্রস্তাব করলেন ‘অন্য কথা অন্য গান’, কারণ ততদিনে আমার এই তত্ত্ব প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়ে গিয়েছে যে আমরা নাগরিক, নগর সমাজের লোক, কাজেই নগরজীবন থেকেই উঠে আসবে আমাদের গান এবং সেই গান আমাদেরই বানাতে হবে, পুরনো গান আর চলবে না বিশেষ। প্রচলিত ‘কথার’ বাইরে গিয়ে আমরা ‘অন্য কথা’ গাইব। আমার এই তত্ত্বে দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার ‘নিউ সং’ আন্দোলনের প্রভাব ছিল। তাপসের প্রস্তাব একজন মানলেন না। গোরা। চমৎকার জোরালো, সুরেলা গলা, খাসা তালছন্দজ্ঞান। কিন্তু গোরা সি পি আই এম ঘেঁষা, আমরা, বাকিরা যা নই। তাপস নিজে নকশাল আন্দোলনে ছিল, জেল খেটেছিল, পরে ছাড়া পায়। সুভাষও তাই। কমলদাও তাই। যদিও দুজনের কেউই জেল খাটেননি। – গোরা আমাদের বন্ধু, রাজনৈতিক মতাদর্শ যাইই হোক আমরা একসঙ্গে গান গাইছি, গাইব। ওকে কোনওমতেই বাদ দেওয়া নেই।

গোরার মত – আমাদের বৃন্দ গান দলের নাম হোক ‘স্বতঃস্ফূর্ত অগ্নিবীণা’। নামটা শুনে আমরা থ। কমিটেড সি পি আই এম গোরা লড়ে গেল। আমরা নিলাম কমলদার শরণ। বয়সে তিনিই সবার বড়। পরের মহড়ায় কমলদা গোরাকে বললেন, ‘গোরে, তোর প্রস্তাব খাঁটি। অর্থের দিক দিয়ে এক্কেবারে নিরেট, অব্যর্থ। কেবল, আমি বলি কী – ঐ নামটা একটু খটোমটো। উচ্চারণ করা শক্ত। এমনিই একবার বলে দ্যাখ। দেখবি একটু অসাবধান হলেই মুখ থেকে থুথু ছিটকোতে পারে। মহা মুশকিল হবে। লোকে আমাদের ফাংশান দেবে না। তোর পার্টীই দেখবি আপত্তি করছে ঐ থুথু ছিটকোনোর জন্য। তা, আমি বলি কী, নামটা মাথায় থাক। খাসা নাম। কিন্তু ঐ নামটা মাথায় রেখেই আমরা বলতে গিয়ে থুথু ছিটকোবে না এমন একটা নাম নিয়ে ভাবি’। – গোরা রাজি হয়ে গেল। এই ছিলেন কমলদা। তিনিই গান বেঁধেছিলেন – ‘এ-লড়াই সেই সে লড়াই সকল লড়াই ঘুচিয়ে দেবার’।
কমলদার মৃত্যুর পর নাকতলার সি পি আই এম-রাই একটা সভা ডাকেন। সেখানে আমার দুই পুরনো বন্ধু-কমরেড অমিত রায় আর বাবলু নিয়োগীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে ‘এ লড়াই শেষের লড়াই’ গেয়েছিলাম। ততদিনে আমার নাম হয়ে গিয়েছে। সি পি আই এমের নেতারা কী আর করবেন – ড্যাবড্যাব করে তাঁদের চরম শ্রেণীশত্রুকে দেখছিলেন আর গানটা গিলতে বাধ্য হচ্ছিলেন। ‘নকশালবাড়ি’ নিয়ে বাঁধা কমলদার একটা গানও গেয়েছিলাম আমরা তিন জন। সি পি আই এম-বৃন্দ কোঁৎ পাড়ছিলেন।
এই বাবলু নিয়োগীকে নিয়ে ছবি হওয়া দরকার। ক্ষ্যাপা। পল্লীগান আর গণসঙ্গীতের পোকা। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের দলে ছিলেন দীর্ঘকাল। ‘মাধব মালঞ্চি কইন্যা’র মূল গায়েন ছিলেন। আমাদের পাশেই ফ্ল্যাট কিনেছেন বাবলু ও তাঁর স্ত্রী। পাড়ার কিছু সি পি আই এম মাতব্বর একবার (কিছু বছর আগে) বাবলুকে ‘গণশক্তি’ গছাতে গিয়েছিলেন। বাবলু আবার একটু তোতলা। ভারী মিষ্টি লাগে। বেশি জোরজার করায় ও কিঞ্চিৎ ভয় দেখানোয় (“নতুন এসেছেন এ-পাড়ায়, আমাদের সঙ্গে তো একটু মানিয়ে চলতেই হবে”) বাবলু তাঁদের বলেছিলেন, “ভ-য়, ভভভ-অ-য় দ্দে-দেখা—আ—চ্ছেন? ও-ও-টা একটা রিরিরিপু। জ-জ-জ্জয় করেছি সসসেই ছে-ছে-ছেল্লেবেলায়”।

বাবলু রে, যুদ্ধের রিপুটা বোধহয় জয় করা যাবে না।
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেই ভারতকে, বিশেষ করে আকাশবাণীকে গানে পায়। চীন-ভারত যুদ্ধের সময়ে আকাশবাণী কলকাতা থেকে নতুন নতুন দেশাত্মবোধক গান প্রচারিত হতো। তার কোনওকোনওটি শুনে শুধু দেশাত্মবোধ নয় সর্বাত্মকাত্মবোধ চটকে যেত। যেমন সতীনাথ ও উৎপলার গাওয়া “শপথ নিলাম”। “মোরা শপথ নিলাম, শপথ নিলাম/ প্রাণ করিলাম পণ”। ভৈরবী রাগে বাঁধা সেই সুর, ছন্দ, বিরক্তিকর লয় ও কথা রোজ শুনতে বাধ্য হতাম সকালবেলা রেডিয়োয়, কোনও-না-কোনও বাড়িতে। শুনেই টের পেতাম বেচারা সতীনাথ ও উৎপলা কী-কষ্টটাই না পেয়েছিলেন গানটি আকাশবাণীর স্টুডিয়োতে রেকর্ড করতে গিয়ে। তার চেয়ে ফাঁসি হওয়াও ভালো।

আমি তখন কিশোর। সেই বয়সেই মনে হয়েছিল – আমাদের দেশে যখন যুদ্ধের সময়ে এমন গান তৈরি হচ্ছে তখন পরাজয় অনিবার্য। আমাদের সৈন্যদের কানে যেন না যায়। গেলে, তাঁরা জার্সি বদলে চীনের সেনাদলে গিয়ে নাম লেখাবেন।
একই যুদ্ধের সময়ে হেমন্ত গেয়েছিলেন “বুদ্ধ গান্ধী বিবেকানন্দ বিশ্বকবির মহান দেশে/ আজ শান্তির মহান পতাকা কেড়ে নিতে চায় শত্রু এসে/, আর ঘুমায়ো না শিবাজী-প্রতাপ ঝাঁসির লক্ষ্মী জাগো এবার…” ইত্যাদি। ওরে বাবা, সে-কী ভয়ানক। একই ভয় আর দিশেহারা ভাব আমার মনে জাগিয়েছিল তার অনেক- বছর পর কলকাতার এক ব্যাণ্ডের গান: ‘অমন তাকিয়ো না, ক্যাবলা হয়ে যাই/ আমার হৃদয় কাঁপে পরিস্থিতির চাপে(!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!)’ – ‘অমন’ থেকে ‘যাই’ অবধি যা লেখা তার পর ‘আমার হৃদয় কাঁপে’ এবং তারপর ‘পরিস্থিতির চাপে’।

সত্যিই তো। পরিস্থিতির চাপ। আমাদের জীবনটাই তো পরিস্থিতির চাপ। দার্শনিক গান। কী গান। কী বাংলা। কী লেখার মুন্সিয়ানা। কী সুর। কী ‘চাপ’।

চীন-ভারত যুদ্ধের ‘পরিস্থিতির চাপে’ আকাশবাণীর অনুমোদিত গীতিকাররা গান লিখছিলেন। দেশাত্মবোধক গান। হেমন্তর গাওয়া ঐ গানে ছিল: “শুধু ঘরের কোণের প্রদীপেই নয়/ বিদ্যুতে মোরা জ্বলতে জানি/ বুকের রক্ত দিতে হয় দেব/ পরাজয় তবু নেব না মানি”। বুকের রক্ত দিচ্ছিল বাংলা গান, “মোরা” না।

ধা-ধিন্‌না-না-তিন্‌না ডবল দাদরা তালে সামান্য কটি যন্ত্রের সাহায্যে হেমন্ত বেচারির সে-কী আপ্রাণ চেষ্টা। গুরুর জন্য কাঁদতাম দাদা আর আমি, আর গাল দিতাম সেই গানের গীতিকার সুরকারদের।
তখন ভাবতাম – এতো খারাপ গান কী করে বানাতে পারে মানুষ। এখন, বিশেষ করে গেল শতকের ন’এর দশক থেকে এবং উত্তরোত্তর বুঝতে শিখেছি, শিখেই চলেছি ওগুলোও ছিল ছ’মাস বাধ্যতামূলক হবিষ্যি গেলার পর এক পূণ্যপ্রভাতে হঠাৎ এক-থালা মাংস-ভাতের (প্লীজ, মুর্গি নয়) মতো।

সে-সময়ে হেমন্তর আর-একটা দেশাত্মবোধক গান ছিল – “মা গো, ভাবনা কেন/ আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে/ তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি/ তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি”। – গান শুনে আমার বাবাকে রেগে যেতে দেখেছি, রাগের চোটে তিন বার নস্যি নিতে দেখেছি দু’তিন বার। সেই ছিল প্রথম। “ইয়ার্কি মারার জায়গা পায় না! প্রতিবাদ করতে জানি!!! কবে করেছে প্রতিবাদ! কবে করেছি আমরা প্রতিবাদ!!!!!” – সে মহা চ্যাঁচামেচি।
বাঙলার ভুলে যাওয়া এক মহাগুণী প্যারোডি-শিল্পী মিন্টু দাশগুপ্ত এই গানটির একটি যুগোপযোগী প্যারোডি বানিয়েছিলেন তার কিছু কাল পরেই: “তোমার ভয় নেই মা আমরা/ ভালো বোম বাঁধতে জানি”।

এই অংশটি আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলির জাতীয় ও মতবাদগত গান হওয়ার কথা। এই সেদিনও আমার এক প্রিয় মানুষ আমায় বললেন, “কবীরদা, আপনার মাওবাদীপ্রীতিটা কি চলে? ওরা খুনোখুনির রাজনীতি করে”। – আমি তাঁকে বললাম, “সেই। ঠিকই। সংসদীয় দলগুলি তো কোনওদিন খুন করেনি, করে না”।

চীন-ভারত যুদ্ধের সময়ে শ্যামল মিত্র গেয়েছিলেন “এই চল্লিশ কোটি হৃদয়ে সাজানো দীপান্বিতার অর্ঘ্য/ এ ভারতভূমি শত শহীদের স্বপ্নের গড়া স্বর্গ”। – গানের লিরিক সরকার-নির্দেশিত পন্থায় দেশাত্মবোধ মার্কা হলেও আর-একটু লিরিকাল, আর সুরটি ছিল মনে রাখার মতো। কার, কে জানে। সুরের ধাঁচা শুনে মনে হয়েছিল দুনিচাঁদ বড়াল। রাইচাঁদ বড়ালের ছেলে। জিনিয়াসের জিনিয়াস ছেলে। রম্যগীতিতে চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘তুমি কি আকাশে আজ সুনীল মায়া ছড়িয়ে দিলে’ আর শ্যামল মিত্রর গাওয়া ‘কতোটুকু তুমি জানো’ দুনিচাঁদ বড়ালের সুর। আবার জন্মাতে চাই শুধু কয়েকটি গান গুনগুন করতে পারার জন্য। এই দুটি গান রয়েছে তার মধ্যে।

সর্বকালের, সর্বযুগের এক সেরা কন্ঠশিল্পী নির্মলা মিশ্র সেই সময়ে রেকর্ড করেছিলেন (আকাশবাণীর স্টুডিয়ো রেকর্ড) “মা আমার লক্ষ্মী মাগো, অঙ্গঘিরে হেমবসন”। কী সুর! আজও ভুলিনি। এই মহাগায়িকাকে আমি ছেলেবেলা থেকে চিনি, তাঁকে পিসি বলে ডাকি, বয়সে আমার চেয়ে বেশী বড় নন। এই সেদিন ফোনে জানতে চাইলাম, তিনি জানালেন – না রে, ভুলে গেছি। কিচ্ছু মনে নেই। আমি একটু গাইলাম। তিনি মনে করতে পারলেন না। কী করে পারবেন? কেউ কি কখনও তাঁকে বলেছেন? নির্মলা বলতেই বালের বাঙ্গালি শুধু ‘এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’ আর ‘ও তোতাপাখীরে’ ভাবতে পারে।
যুদ্ধের সময়ে নির্মলার গাওয়া আর-একটি গান ছিল “তোরা ডাক দিয়ে বল বল/ বল্‌ সবারে / যেন, দেশের মান মাটির মান/ কাড়তে না পারে, ওরা কাড়তে না পারে”।

সব দেশের দেশাত্মবোধক গানেই একটু গদগদ, টিপিকাল ভাব থাকে। সলিল চৌধুরির “এই দেশ এই দেশ”-এও আমি অন্তত পেয়েছি। কিন্তু প্রবীর মজুমদারের “মাটিতে জন্ম নিলাম” এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। ১৯৫৫ সালে কলকাতায় আসার পর থেকে শুনছি। কী-গানই না গেয়েছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। “মাটিতে জন্ম নিলাম”-এর মতো দেশের গান বাংলা ভাষায় খুব কম। কোনওদিন গেয়ে উঠতে পারিনি গানটি। গানটি শুরু করলেই কান্না পেয়ে যায়, গলা বন্ধ হয়ে আসে। কাউকে কখনও গাইতেও শুনিনি এই গান। যেমন, এমনিই, নানান গান গাইতে গাইতে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ কেউ গেয়ে দিলেন – আজ পর্যন্ত শুনলাম না। ভেবে দেখেছি – এতো হেমন্ত-মান্না-কিশোর – নানান গানের মধ্যে এই গানটি বা ‘মাটিতে জন্ম নিলাম’ কেউ গেয়ে দিচ্ছেন, শুনলাম না। কী সঙ্গীতপ্রেমের দেশ “মোদের”।

ন’এর দশকে কিন্তু অঞ্জন মঞ্চে তাঁর বাঁধা গান গাইতে গাইতে আমার গান গেয়েছেন, আমি তাঁর গান, নচিকেতার গান গেয়ে দিয়েছি। এই তো, বছর দেড়েক আগেও গেয়েছি। কী-সম্মানই না আমাদের করলেন আমাদের আগে থেকে যাঁরা গাইছেন তাঁরা।
বাঙলার এক সত্যিকার গুণী গিটারশিল্পী কিছুদিন আগে আমায় জানালেন, এক বিরাট শিল্পীকে তিনি সানন্দে জানাচ্ছিলেন ‘আমাদের সুমনদা বাংলায় খেয়াল গাইছেন, শোনার মতো, আমি বাজালাম’। সেই মহান শিল্পী মুখ ভেটকে তাঁকে বললেন, ‘কবীর সুমনও খেয়াল গাইছে, আমাদের তাহলে গানবাজনা বন্ধ করে দিতে হবে’। – গিটারশিল্পী খুব আহত হন। ঐ কথাটি বলে সেই মহান মহিলা শিল্পী আমাদের গিটারশিল্পীকেও যে অপমান করলেন তার কী হবে, কারণ তিনি তো কবীর সুমনের সঙ্গে বাজিয়েছিলেন।

চুণী গোস্বামী ফুটবলে দুনিয়া কাঁপিয়ে ক্রিকেটে যান। এ-রাজ্যের কোনও খেলোয়াড় কিন্তু তখন কাউকে বলেননি – ‘চুণীবাবু এবারে ক্রিকেট খেলছেন! আমাদের তো তাহলে খেলা ছেড়ে দিতে হয়!’

ঐ বিরাট শিল্পীটি এক সময়ে গ্রামোফোন কোম্পানির কাছে উমেদারি করেছিলেন – আমি যেন তাঁর জন্য একটা এলবাম বানিয়ে দিই। দিয়েছিলাম। বিক্কিরিও হয়েছিল ভাল। কোনও আসরে আমার বাঁধা কোনও গান তিনি গাননি। অথচ তাঁরই রেকর্ড করা। আমি জানতে চাওয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘না ভাই, জানো তো ভাই, তোমার গান ভাই গাইলে ভাই ওরা রেগে যাবে ভাই, আমি ভাই আর ডাক পাবো না’। – সে যুগ অতিক্রান্ত। এখন তিনি ভাই নতুন যুগের ভাই সঙ্গে আছেন ভাই। এখন কি গাইবেন ভাই? আপনার জন্য তৈরি করে আপনাকে দিয়ে দমদমের স্টুডিয়োয় রেকর্ড করানো অতোগুলো গানের একটি? – না ভাই, এখন না ভাই, কী জানি ভাই, এরা ভাই, মানে ভাই, এরাও বোধয় ভাই, সুমনকে ভাই পছন্দ করে না ভাই, কী দরকার ভাই এদের ভাই খেপিয়ে ভাই?

এই হলো, ভাই, আমার কপাল। আরও দু’জন হেভভি নাম-করা শিল্পীর জন্য এলবাম বানিয়ে দিয়েছিলাম আমি। কেউই, ভাই, কোনও আসরে, ভাই, আমার বানানো-তাঁদের-রেকর্ড-করা একটা গানও, ভাই, গান-ভাই-নি-ভাই। বি—ঈ—শা—আ—ল নাম তাঁদের ভাই। আমাদের এই “ভাই-শিল্পী/কবীর-সুমনও-খেয়াল-গাইছে-তাহলে-আমাদের-গান-ছেড়ে-দেওয়াই-ভালো শিল্পীর চেয়ে কয়েক শো গুণ ক্ষমতাধরী, নামী তাঁরা, ভাই। কী করব, ভাই, আমার কপাল ভাই।

তেমনি, ভাই, লোপামুদ্রার ভাই, কোনও সমস্যা দেখিনি ভাই। তাঁর জন্য বাঁধা আমার গান তিনি আপন মনে গেয়ে গিয়েছেন অনুষ্ঠানের পর অনুষ্ঠানে। সি পি এম আমলেই তাঁর নামডাক হয়। আমার বাঁধা গান ‘সূর্য তাকেই দেখতে চায়’ বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া প্রথম গান, যতোদূর জানি। সি পি আই এমের লোকেরা তা বিলক্ষণ জানতেন। হিট হয়েছিল গানটি। সেই গান তিনি সমানে গেয়ে গিয়েছেন। সে-জন্য তাঁকে সি পি আই এম বকে দিয়েছেন বা অনুষ্ঠান দেওয়া বন্ধ করেছেন বলে শুনিনি কখনও।
যাই হোক, চীন-ভারত বা ভারত-চীন যুদ্ধের সময়ে আকাশবাণী কলকাতার স্টুডিয়ো রেকর্ডে গাওয়া ‘তোরা ডাক দিয়ে বল্‌ বল্‌’ কী-যে সুন্দর লেগেছিল। কথাগুলোও সময়োপযোগী। পল্লীগীতির রসে চোবানো সুরটি আজও আমার দু’চোখ ভিজিয়ে দেয়। আমার প্রৌঢ় বয়সের স্মৃতিতে, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া। সেই সুর ও গায়কীর “পরণে ঢাকাই শাড়ি,” সিঁথিতে চওড়া করে লাগানো সিঁদুর। – সেই সময়ে হন্যে হয়ে অপেক্ষা করতাম – কখন রেডিয়োয় বাজবে সেই গান। ছেলেবেলা থেকে বাঙলার অগ্নিযুগের বই পড়তাম। ভেতরে কীসব হতো। কোনওদিন বলতে পারিনি কাউকে। অনেক পরে, পীপ্‌ল্‌স্‌ ওয়ার-এর কিছু নেতা যখন কলকাতায় এসে গোপনে দেখা করলেন আমার সঙ্গে (একজনও বাঙ্গালি ছিলেন না) তখন আমার মনে হয়েছিল – এই মানুষগুলোর কাছে বলা যায়। নির্মলার গাওয়া “তোরা ডাক দিয়ে বল বল” এই খাঁটি বিদ্রোহীদেরও গান, সারা দুনিয়ার প্রতিরোধ যোদ্ধাদের গান। জার্মান ছাত্র-বিপ্লব-নেতা রুডি ডুচকের অকালমৃত্যুর পর হ্বল্‌ফ্‌ বিয়ারমান্‌ লিখেছিলেন: “Sanft war er. Sanft, wie alle echte Revolutionaere” –

“কোমল ছিলেন তিনি। কোমল, সব খাঁটি বিপ্লবীর মতো”।
“তোরা ডাক দিয়ে বল্ বল্” নরম গান। আসল গান। কোমল। সেইখানেই তার জোর।

গোটা গান আমার আর মনে নেই। মুখটা মনে আছে। অন্তরার সুরটাও। পর পর কিছু অন্তরা ছিল বোধহয়। মাঝেমাঝেই গুনগুন করে গাই। কেউ শুনতে পায় না। পাবেও না। সবকিছু সব্বাই শুনবে? ক্রমশ আমি প্রাচীন লোকদের মতো ‘অধিকারভেদ’-এ বিশ্বাসী হয়ে যাচ্ছি। রোজ আরও বেশি। অধিকার আছে ক’জনের? কিসের বাল গণতন্ত্র? কতো গান যেচে যেচে যাকেতাকে শুনিয়েছি। তার পরেও তো বাঙ্গালি আকাশবাতাসজুড়ে আমার খিস্তি করতে ছাড়ল না। তার পরেও একটা সরকারি খেতাব পেলে বালের কলকাতার বালের বাংলা কাগজ তামাশা করে, তামাশা করে একটা বরবটি-চেহারার পদ্যকার – “মাসতুতো বোন পিসতুতো ভাই/ এসো লাগাই এসো লাগাই।“ – এই তো দৌড়। এদেরও শোনাবো? এরাও শুনবে? শালা, আগে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন কর্, সুরতালছন্দলয়-সঙ্গীতরসের ব্রাহ্মণত্ব, তারপর …

চন্দ্রিলিয়ে ৩

সবার আগে আমার বাবামা, কালীপদ দাস, আমীর খান, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ এবং অন্য গুরুদের নাম নিয়ে শুরু করলাম।

এর আগের ‘চন্দ্রিলিয়ে’ শুরু করেছিলাম যুদ্ধ ও গান নিয়ে। এই লেখাটাও শুরু করছি একটি যুদ্ধ ও সেটিকে ঘিরে গানের প্রসঙ্গ দিয়ে।

১৯৬৫ সাল। পাক-ভারত যুদ্ধ। নাকি ভারত-পাক বলব? দুই প্রতিবেশী দেশ যুদ্ধে মেতেছে। দুটি দেশই গরিব। দুটি দেশেই নিরন্ন মানুষ। দুটি দেশেই গরিবদের না আছে রোজগারের নিশ্চয়তা, না আছে স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থা, না আছে পানীয় জল ও সেচের জল, না আছে মানুষ হিসেবে মর্যাদা। কিন্তু “দেশের মর্যাদা” রাখতে হবে, তাই যুদ্ধ।

১৯৪৭ সালের আগে একই দেশ ছিল। দুটি দেশেই রাগগুলি, তালগুলি এক । দক্ষিণ ভারতকে বাদ দিলে (সংগীতের দিক দিয়ে বলছি) দুটি দেশই হিন্দুস্থানী রাগসঙ্গীতকে তাদের ধ্রুপদী সঙ্গীত মনে করে থাকে। ঊল্লেখযোগ্য – গেল শতকের পাঁচের দশক থেকে ভারতে এমন খেয়াল-শিল্পী কমই এসেছেন যিনি ধ্রুপদের তালিমপ্রাপ্ত। পাকিস্তানে কিন্তু একাধিক খেয়াল-শিল্পী ধ্রুপদে পুরোদস্তুর তালিম নিয়েছিলেন, যেমন সালামাত আলি ও নাজাকাত আলি। অনেকেই জানেন না, মেহেদী হাসান, যিনি ‘গজলের’ জন্য বিখ্যাত, খেয়াল গাইতেন। খেয়ালে তাঁর গ্রামোফোন রেকর্ডও ছিল। অল্প বয়সে তিনিও ধ্রুপদ শিখেছিলেন, দস্তুরমতো গাইতেন।

১৯৬১/৬২ সাল ইতিহাসে কোন্‌ কোন্‌ কারণে স্মরণীয় জানি না, কিন্তু আমার জীবনের ইতিহাসে তা স্মরণীয় ঐ সময় নাগাদ ভারতে ৭৮ আর পি এম (গালার) গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগকে বিদায় জানিয়ে আমাদের দেশ ৪৫ আর পি এম (এক্টেণ্ডেড প্লে) ও ৩৩ ১/৩ আর পি এম (লং প্লে) রেকর্ডের যুগের অভ্যুদয় দেখেছিল বলে।

তার আগে গ্রামোফোন ডিস্কের প্রতিটি পিঠে বড়জোর আড়াই-তিন মিনিটের সঙ্গীত আঁটতো। ফলে, সঙ্গীতকে ঐ সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হতে হতো। আমার ধারণা, চারের দশক পর্যন্ত ৭৮ আর পি এমেরই আরও বড় ডিস্ক বের করা হতো কিছু। পাঁচের দশকে হলে আমিই তা দোকানে দেখতাম। দেখিনি। কিন্তু আমার বাবার সংগ্রহে দিলীপ কুমার রায়ের গাওয়া ‘সেই বৃন্দাবনের লীলা অভিরাম’ গানটি বারো ইঞ্চির বড় রেকর্ডে ছিল। আর একটু বেশিক্ষণ বাজত। খান সাহেব আব্দুল করিম খানের গাওয়া ঝিঁঝিঁট খামাজ রাগে ঠুংরি, বসন্ত রাগে দ্রুত খেয়ালও বাবার সংগ্রহে ছিল বারো ইঞ্চি রেকের্ডে। – পাঁচের দশক পর্যন্ত দম-দেওয়া গ্রামোফোনই ছিল গ্রামোফোন রেকর্ড বাজানোর একমাত্র উপায়। এবং বারো ইঞ্চির রেকর্ডগুলির ব্যতিক্রম বাদ দিলে আড়াই-তিন মিনিটের বেশি কোনও গ্রামোফোন ডিস্কের একটি পিঠ বাজত না। মনে আছে, রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের সময়ে গ্রামোফোন কম্পানি অফ ইণ্ডিয়া রবীন্দ্রনাথের শ্যামা নৃত্যনাট্যের যে এলবামটি বের করেছিলেন সেটি আক্ষরিক অর্থেই একটা এলবাম: বেশ কয়েকটি ৭৮ আর পি এম ‘সিংগ্‌ল্‌স্‌’এর সংকলন। রীতিমতো ওজন ছিল তার।

এইখানে, সংগীতের সমজতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও সংগীতের যান্ত্রিক প্রতিরূপায়নের বিষয়টিকে দেখা যায় এবং দেখা উচিতও। গ্রামোফোন রেকর্ড ও রেডিয়ো আসার আগে সঙ্গীত সামাজিকভাবে গতিশীল হয়ে উঠতে পারেনি। গ্রামোফোন রেকর্ডিং যখন এলো তখন তা গতিশীল হয়ে উঠল, কিন্তু ধাপে ধাপে। প্রথমে মোমের রেকর্ড ছিল। সিলিন্ড্রিকাল। সে-রেকর্ড বেশিদিন টিঁকত না। একই গানবাজনার রেকর্ড আবার কিনতে হতো মানুষকে কিছু কাল শোনার পর। শুধু তাই নয়। শিল্পীদেরও বারবার রেকর্ড করতে যেতে হতো। প্রথম রেকর্ডিং-এ হয়তো এক হাজার কপি মোমের সিলিন্ড্রিকাল রেকর্ড ছাপা হলো। ভালো বিক্রী হলে শিল্পীকে আবার গিয়ে রেকর্ড করতে হতো। আরও এক হাজার। হিট্‌ হয়ে গেলে শিল্পীকে বারবার রেকর্ড করতে হতো ।

এবারে ভাবুন, সে-যুগের শিল্পীদের মান কেমন ছিল। যে-শিল্পীর কাজ মানুষের এতো ভাল লেগে গেল যে তারা তার তিন হাজার কপি কিনল, সেই শিল্পীকে কঠোরভাবে তাঁর উৎকর্ষ, মান বজায় রাখতে হতো। তিন হাজার বিক্রী হয়ে গেছে মানে এবারে পরের হাজারের জন্য আবার, অর্থাৎ চতুর্থবার রেকর্ড করতে হবে। লোকের প্রত্যাশা শিল্পী একই মানের কাজ করবেন। কম্পানিরও প্রত্যাশা একই। শিল্পীও মান বজায় রাখলে এবারে কম্পানির কাছে আরও টাকা চাইতে পারবেন। এবং তা সম্ভবত পাবেনও, নয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী কম্পানি আছে।

আমরা আজ সেই চ্যালেঞ্জ কল্পনাও করতে পারব না। মান? সারা পৃথিবীর বাসিন্দাদের কোরাসে হো হো করে হাসা উচিত। বম্বে ও কলকাতার অনেক প্রতিষ্ঠিত “গায়ক গায়িকা” এখন আর সুরে গাইতে পারেন না। মেলোডাইন (নাকি মেলো ডাইম) নামে একটা সফটওয়্যার আছে। সেটা দিয়ে বেসুরে চলে যাওয়া ফাংশানে আড়াই লাখ থেকে চব্বিশ লাখ হাঁকা ও পাওয়া মহাশিল্পীদের কম্বুকন্ঠ আঁকশি দিয়ে ‘A – 440 Hz’ এই মান মোতাবেক ‘সুরে’ টেনে আনা যায়। এই কথাটা সকলেই জানে ও মানে। আমি জানতাম না ‘জাতিস্মর’-এর গান রেকর্ডিং-এর যাওয়ার আগে। আমি তো বুড়োভাম,সাবেক কালের লোক। আমি জানতামই না। ন\’এর দশকে এইসব ছিল না, করণ তখনও সফটওয়ারে রেকর্ডিং ততো শুরু হয়নি, আদৌ শুরু হয়নি বোধহয়। ন-এর দশকে টেপ ও তারপর হাই এইট ফরম্যাটে রেকর্ডিং হতো। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের জাতিস্মর ছবির কাজ করতে গিয়ে স্টুডিয়ো ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে শুনলাম, জানলাম। কান মন,তনুমনধন পবিত্র হয়ে গেল। এই সেদিন, অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের ছবি ‘শঙ্কর মুদির’ কাজ করতে গিয়ে স্টুডিয়ো ইঞ্জিনিয়ারের কাছে আবার শুনলাম। বম্বে দিল্লি আগ্রা চাম্পাই কুলুমানালি হীমসাগর ল্যাঙড়া ফজলি বোলপুর কলকাতা কালকাতা কলকাতার “প্রায় সকলেই” (তিনি যা বললেন) নাকি বেসুরে গায় আজকাল, তারপর সফটওয়্যারের সাহায্যে তাঁদের সুরে ভেড়ানো হয়।কোনও কোনও নামজাদা গায়ক গায়িকা নাকি সফট্‌ওয়্যারটি সঙ্গেই নিয়ে আসেন; স্টুডিয়োয় সেই সুর-খেয়ার-নাইয়া না থাকলেও কোনও সমস্যা নেই। এই মেলোডাইন ও বেসুরো গাওয়াকে সফটওয়্যারের আঁকশি দিয়ে টেনে টেনে সুরে ভেড়ানোর যুগেই \’জাতিস্মর\’ ও \’শঙ্কর মুদি\’ ছবির কাজ করতে গিয়ে এমন তৎপরতার মুখোমুখি হতে হয়নি আমার। যাঁরা গেয়েছেন তাঁরা সুরেই গেয়েছেন।

ভাবুন, মানুষ যদি অতীতেও আমাদের দেশের হাল-আমলের এই siল্পীদের মতো হতো!!!

যাই হোক, সিলিন্ড্রিকাল রেকর্ডের যুগে বাজার-সফল শিল্পীদের বারবার রেকর্ডিং করে আসতে হতো যাতে বারবার মোমের সেই রেকর্ড ছাপা যায়। তখনও কিন্তু আজকের মতো মাইক্রোফোন ছিল না। একটা চোঙার মধ্যে মুখ প্রায় ঢুকিয়ে দিয়ে গাইতে হত।কী করে গাইত লোকে কে জানে। সেই অবস্থা অবশ্য কিছুকাল পরেই আর ছিল না। কিন্তু মাইক্রোফোন ছিল তখনও দুর্বল। দুর্বল ছিলেন না শিল্পীরা।

গালার গ্রামোফোন ডিস্কের যুগে মাইক্রোফোন অনেকটা জোরালো, কিন্তু মাইক্রোফোনে গৃহীত ধ্বনি আর-এক ধাপ জোরালো করার যে pre-amp, compressor ইত্যাদি ছাড়া আজকাল স্টুডিয়ো রেকর্ডিং আমরা ভাবতেও পারি না, সেসব ছিল না সে-যুগে। সত্যি বলতে, আমি নিজে যখন গ্রামোফোন রেকর্ডিং করতে গিয়েছি তখনও, অর্থাৎ ১৯৭২/১৯৭৩ সালেও এসব ছিল না। আকাশবাণীর স্টুডিয়োতে তো ছিলই না। আটের দশকের পর স্টুডিয়োয় ঐ সব যন্ত্র এবং স্টুডিয়ো ইকো ও রিভার্ব যন্ত্র আসে। ততদিনে গ্রামোফোন ডিস্ক আর তৈরি করছে না গ্রামোফোন কম্পানি অফ ইণ্ডিয়া। এসে গিয়েছে মিউজিক ক্যাসেটের যুগ।

এতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই যে গ্রামোফোন রেকর্ডিং-এর ইতিহাসে, আমাদের দেশে অন্তত, গালার তৈরি ৭৮ আর পি এম ও তারপর বিশেষ ধরণের কিছু-একটাতে (জানি না ঠিক কী, তবে গালা নয়) তৈরি ৪৫ ও ৩৩ ১/৩ আর পি এমের ডিস্কের যুগে সঙ্গীতশিল্পীদের মান অনেক উঁচু ছিল। তার একটা বড় কারণ – আকাশবাণীতে অন্তত বি-হাই গ্রেডের অধিকারী না হলে সচরাচর গ্রামোফোন রেকর্ডিং-এর সুযোগ পাওয়া যেত না। ব্যতিক্রম ছিল খুবই অল্প। খু-উ-ব-ই। ফলে বেতারের কড়া প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিল্পীরাই গ্রামোফোন রেকর্ড করতে পারতেন। এর দরুণ আমরা দক্ষ, প্রশিক্ষিত শিল্পীদের গান-বাজনাই শুনতে পেতাম।

কিন্তু অন্য একটা দিক দিয়ে – প্রযুক্তির একটি বিশেষ সীমাবদ্ধতার কারণে গানের দৈর্ঘ হয়ে পড়েছিল বাঁধাধরা। সংগীতের সমাজতত্ত্বে এ এক আবশ্যিকভাবে বিবেচনাযোগ্য সূত্র। ৭৮ আর পি এমের যুগে (এবং সেই যুগটাই সবচেয়ে লম্বা) আড়াই-তিন মিনিট মানে গানের কাঠামোও একট-দুটি নিয়মে বাঁধা। দু লাইনের স্থায়ী। দু লাইনের অন্তরা; স্থায়ীতে ফেরার সেতু হিসেবে বড়জোর আর একটি লাইন। দু লাইনের সঞ্চারী। দুলাইন (+ একটি সেতু-লাইন) দ্বিতীয় অন্তরা। অনেক পণ্ডিত বাঙ্গালি এটাকে আভোগ বলেছেন, এখনও হয়তো বলেন, যেটা ভুল। আভোগ ছিল ধ্রুপদের বয়ানের একটি বিশেষ অঙ্গ। ধ্রুপদের সেই বয়ানের সঙ্গে আধুনিক বাংলা গান তো বটেই পল্লীগীতিরও কোনও সম্পর্ক নেই। অথচ আমাদের দেশে গ্রামোফোন আসার পর পল্লীগীতিও প্রচুর রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে সঞ্চারীও সব সময়ে ছিল না। রবীন্দ্রনাথের যুগ থেকেই আধুনিক বাংলা গান সঞ্চারী ছাড়াও বাঁধা হয়েছে, যদিও কম। সে-ক্ষেত্রে গানের কাঠামো হয়েছে – স্থায়ী> অন্তরা> অন্তরা। এমনকি, কোথাও কোথাও তিনটি অন্তরা। সলিল চৌধুরীর ব্যালাড-আঙ্গিকের ‘দূর নয় বেশি দূর’-এ তো সেই-অর্থে অন্তরাই নেই। কয়েকটি ‘স্থায়ী’র পরম্পরা।

এই ধরণের কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা সম্ভব হলেও আড়াই-তিন মিনিটের সীমাটা ছিল একটা ঘেরাটোপ বিশেষ। আধুনিক অর্থনীতিতে গ্রামোফোন ও গ্রামোফোন রেকর্ড ব্যবসায় গানের কাঠামোগত এই ঘেরাটোপ ছিল সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তির একটি বিশেষ স্তর ও তৎসংলগ্ন উৎপাদন পদ্ধতি ও রীতির সম্মিলিত কারণে তৈরি। এটিও সংগীতের সমাজতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। এই ঘেরাটোপ বাঙলার ইন্ডাস্ট্রিতে এবং গ্রামোফোন কম্পানির ইতিহাসে প্রথম নিশ্চিতভাবে ভেঙে দেয় ‘তোমাকে চাই’ এলবামটি। তার আগে, ‘সব আমাদের জন্য’ বা ‘তোমাকে চাই’-এর মতো, মায় ‘পাগল’এর মতো গান নিছক দৈর্ঘের কারণে গ্রামোফোন রেকর্ড হতো না। অমন গান বেতারে বাজবে না, রেকর্ডও হবে না, তাই, সম্ভবত সেই কারণেও কেউ অমন গান বানানোর কথা ভাবতেনও না। মনে রাখা দরকার সলিলের সুরে সুকান্তর রানার ও সত্যেন দত্তর পাল্কির গান ছাপা হয়েছিল একই ৭৮ গ্রামোফোন রেকর্ডের দুই পিঠে। তেমনি, গ্রামোফোন ডিস্কের যুগ সমানে বলবৎ থেকে গেলে, মিউজিক ক্যাসেটের যুগ না এলেও অতো লম্বা লম্বা গান রকের্ড করা যেত না। লং প্লে রেকর্ডে প্রযুক্তির দিক দিয়ে সম্ভব হতো। কিন্তু একটা ডিস্কের একটা পিঠে মাত্র দুটি বা তিনটি গান থাকলে অর্থনৈতিকভাবে তা থেকে ফায়দা আসত না। ক্রেতার মনস্তত্ত্ব পথ আটকাতো। লং প্লে রেকর্ডের দাম অনেকটাই বেশি ছিল স্ট্যাণ্ডার্ড প্লের চেয়ে। অতো টাকা দিয়ে এ-পিঠে তিনটে ও-পিঠে দুটো –কুল্লে মাত্র পাঁচ ছটা গান? দামে পোষাবে না, পড়তায় পোষাবে না।

গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগান্তর ও সমাজতত্ব্ব বিষয়ে এই আলোচনাটা জরুরি ছিল, কোনওদিন কেউ বিশেষ কিছু লেখেনি এ নিয়ে। আলাদা লিখতে পারতাম, কিন্তু কথায় কথায় এসে পড়ল তাই লিখে গেলাম টানা।

৭৮-এর যুগ থেকে ৪৫ ও ৩৩ ১/৩-এর যুগ আসায় ডিস্কের প্রতিটি পিঠেই সময় পাওয়া গেল বেশি। অবশ্য, ৪৫ আর পি এম ‘এক্সটেণ্ডেড প্লে’ নামটা তার মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছিল গ্রামোফোন কম্পানি ৬১/৬২ সালের অল্প কিছু বছরের মধ্যেই ৭৮ আর পি এম রেকর্ড উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে ৭৮-এর জিনিস (ঐ দৈর্ঘের গানবাজনা) ‘স্ট্যান্ডার্ড প্লে’ নাম দিয়ে ৪৫ আর পি এম ডিস্কে ছাপাতে শুরু করার পর। ৭৮ আর পি এম-এর রেকর্ড ৬১/৬২ সাল নাগাদ বাজারে ৪৫ ও ৩৩ ১/৩ আর পি এম রেকর্ড বেরিয়ে যাওয়ার পরেও তৈরি হয়েছিল, যার প্রধান কারণ ছিল সেই প্রযুক্তি ও বাজার-অর্থনীতি।

বাজারে তখনও পুরনো গ্রামোফোন, দম দেওয়া কলের ছড়াছড়ি শুধু নয় একাধিপত্য। তা দিয়ে ৪৫ আর ৩৩ চালানো সম্ভব নয়। নতুন যুগের ডিস্ক চালানোর জন্য বিদ্যুত-চালিত রেকর্ড প্লেয়ার দরকার। তার দু’একটি মডেল সবে বাজারে আসতে শুরু করেছে। একটি ছিল এইচ এম ভির ‘শের্পা’। বেশি দাম নয়। সত্যি বলতে দম-গ্রামোফোনের চেয়ে সস্তা। তেমনি ‘শের্পার’ নিজের স্পীকার ছিল না। তার দিয়ে রেডিয়ো সেটের সঙ্গে জুড়ে দিলে তবে আওয়াজ পাওয়া যেত। অর্থাৎ, যাদের বাড়ির রেডিয়ো সেট সাবেক আমলের, অকজিলিয়ারি ইনপুট যেগুলোতে ছিল না তারা রেকর্ড শোনার সখ জোরালো হলে বাধ্য হলো নতুন মডেলের রেডিয়ো কিনতে, যাতে শের্পা বা ঐধরণের না-বেশী-দামী ইলেকট্রিক রেকর্ড প্লেয়ার জুড়ে দেওয়া যায়।

“সুখী গৃহকোণ শোভে গ্রামোফোন” – ১৯৫৫ সালে কলকাতায় আসার পর থেকে বিজ্ঞাপনে দেখে আসছিলাম। ছবিতে বাবা মা দুই ছেলেমেয়ে দম-গ্রামোফোনের সামনে বসে রেকর্ড শুনছে। ছ-এর দশকের গোড়ায় ইলেকট্রিক রেকর্ড প্লেয়ার আসার পর অমন স্মরণীয় কোনও বিজ্ঞাপন-বয়ান আর দেখা যায়নি। মস্ত একটা যুগ শেষ হল, যদিও সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ৭৮ যুগের গ্রামোফোনই শোভা পেতে থাকল, নতুন রেকর্ড প্লেয়ার তৈরি সত্ত্বেও নির্মাতারা গালার রেকর্ড বানিয়ে গেলেন কিছুদিন, কারণ ক্লাসিকাল ছাড়া অন্য কোনও সঙ্গীত এক্সটেণ্ডেড বা লং প্লে রেকর্ড বের করলে বিক্রী হবে না। সাধারণ লোক তখনও রেকর্ড প্লেয়ার কিনছে না সেই সংখ্যায়। বাংলা গানও গালার ৭৮-এই থেকে গেল কিছু কাল। এক্সটেণ্ডেড প্লে-ও সত্যিই এক্সটেণ্ডেড – তিন মিনিটের বেশি একেক পিঠ। ধ্রুপদী সঙ্গীতে এ এক লম্বা পদক্ষেপ। যে-কোনও রাগ আড়াই তিন মিনিটে যতটা ফুটবে, পাঁচ-ছ মিনিটে ফুটবে তার চেয়ে বেশি। ফলে প্রথম এক্সটেণ্ডড প্লে রেকর্ডে আমরা পেলাম বাঘা বাঘা ধ্রুপদী শিল্পীদের।

রবি শংকর আলি আকবরের মাঁজ খামাজ এক্সটেণ্ডেড প্লে-তে। হৈচৈ!

বিসমিল্লাহ খান সাহেবের সানাই এক্সটেণ্ডেড প্লে-তে। কেয়া বাৎ।

সালামাত আলি নাজাকাত আলির পাহাড়ি ঠুংরি এক্সটেণ্ডেড প্লে-তে। সুনামি!

পাকিস্তানের এই দুই শিল্পীর গান গ্রামোফোন রেকর্ডে শোনার সুযোগ আমরা আগে পাইনি, কারণ ৭৮ আর পি এমে ও-জিনিস ধরা যায় না, ভাবাও যায় না। সামনেও না। কিন্তু কলকাতার বাজারে সালামাত নাজাকাতের পাহাড়ি ঠুংরির রেকর্ড বেরনোর পর বাঙলার শ্রোতারা যেন গায়কী, দক্ষতা, অকল্পনীয় দক্ষতা, কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীল মেধার এক নতুন দুনিয়ার সন্ধান পেলেন।

ছয়, এমনকি সাতের দশকেও কলকাতায় ও সারা রাজ্যে বাঙ্গালি শ্রোতারা যে কতটা সুররসিক ছিলেন তা আজকের মানুষ কল্পনাও করতে পারবেন না। কী-শ্রোতাই না ছিলেন বাঙালিদের মধ্যে। আজ যখন আজকের বাংলা ও বাঙালির অবস্থা দেখি আর সে-দিনগুলোর কথা ভাবি, বিশ্বাসই হয় না। সত্যিই সে ছিল আগের জন্ম। সেই-জন্মে আমি রসিক বাঙালিদের দেখা পেতাম, তাঁদের সঙ্গে বসে, হল ভর্তি করে বসে সঙ্গীত-উন্মাদনা ভাগ করে নিতাম। এক সঙ্গে কাঁদতাম, হেসে উঠতাম, এ ওর হাত জড়িয়ে ধরতাম। আলিঙ্গন করতাম এ ওকে, অচেনাকে।

চেনাজানাদের মুখে মুখে তখন সালামাত নাজাকাতের পাহাড়ি ঠুংরির কথা। লোকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলছে, মুখে স্বর্গীয় হাসি। কোন্‌ এক পরশমণি আমরা যেন অনেকে মিলে আবিষ্কার করে ফেলেছি। ঠুংরির দেবতা বড়ে গোলাম আলি খান সাহেবের পাশাপাশি এ-হেন “উঠিয়াছি আমি বিস্ময়!” কে না জানে এ-কথা কার, তাই আর বললাম না। – এই ফাঁকে বলে রাখি, আচার্য বড়ে গোলাম আলি খান সাহেবের গাওয়া “হরি ওম্‌ তৎসৎ”ও পাহাড়ি ঠুংরি – মাউন্ট এভারেস্ট বললেও কমিয়ে বলা হয় – এবং গ্রামোফোন কম্পানির প্রথম দিকের এক্সটেণ্ডেড প্লে-গুলির অন্যতম। ও-গান মানুষে গাইতে পারে না। পৃথিবীর ভেতর থেকে, মহাজগৎ থেকে ও-গান আসতে পারে, এসেছিল। আমরা আর তার খবর রাখি না।

বড়ে গোলাম আলি খানের পাহাড়ি-ঠুংরি ‘হরি ওম্‌” শুনে মনে হয়েছিল এমন গান যিনি গাইতে পারেন, এভাবে গাইতে পারেন তিনি ঈশ্বর স্বয়ং। আর সালামাত নাজাকাতের পাহাড়ি ঠুংরি ‘সাঁইয়া বিনা গর্‌ সুনা’ শুনে মনে হয়েছিল – আমাদের এক অবিশ্বাস্য বন্ধু, আমার খেলার সাথী, এঁরা দুজন ব্যাট করবেন আর আমরা সবাই বল করব আর বৃথা ফিল্ডিং দেব – কারণ আমাদের প্রতিটি বল ওঁরা যেভাবে মারবেন তা ভেল্কি – আটকানোর গল্প নেই, আছে ভেল্কি দেখে মাথা খারাপ করার গল্প। মেসির খেলার ধরণ দেখে আমার সালামাত নাজাকাতের পাহাড়ি ঠুংরির গায়কী ও ব্যাপারস্যাপার মনে পড়ে যায় আর আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখি, আসলে শুনি। দেখি যত, শুনি তার চেয়ে বেশি। ঐ তো একটা অমানুষিক সাপাট তান, টুকরো তান, বক্‌রি তান, ঐ তো একটা অভূতপূর্ব কম্বিনেশন, আমার ভাবনারও আগে চলে গেল কোথা থেকে কোথায়। মেসির সকার-ভেল্কিতে আমি পাই সালামাত নাজাকাতের খ্যাপামি, আপনায় আপনি বিভোর থাকা, প্রতিপক্ষকে প্রেমিক বানিয়ে দেওয়ার দম্‌ আর কায়দা। মেসি যেভাবে পর পর প্রতিপক্ষ-খেলোয়াড়দের একবার এদিকে একবার ও-দিকে হেলিয়ে দেন, ফেলে দেন স্পর্শমাত্র না করে, সালামাত নাজাকাতের সরগম তেমন। সরগম চলছে সে-কী ঐশ্বরিক নির্লিপ্ততায়, যেন কিছুতেই কিছু যায় আসে না আবার আসে, জিততে হবে, জিতবই, জানি জিতবই, তবে এই ভেল্কিটাকে সত্যি করে তুলে জিতব।

ছ-এর দশকের গোড়ায় ধ্রুপদী সংগীতের বাঙ্গালি শ্রোতাদের মনে সালামাত নাজাকাতের পাহাড়ি ঠুংরির তরঙ্গ। আর ১৯৬৫ সালেই কিনা পাক-ভারত বা ভারত-পাক যুদ্ধ। আকাশবাণীর প্রচারে, কাগজে – সর্বত্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচার। যুদ্ধের সময়ে যা হয়ে থাকে। অথচ কলকাতায় ও রাজ্যের নানান জায়গায় ধ্রুপদী সংগীতের আসর মানেই সালামাত নাজাকাত, বাইরের দেশগুলোয় যাঁদের “পাকিস্তান ব্রাদার্স” বলা হতো। তাঁদের অকল্পনীয় গায়নদক্ষতা পাশ্চাত্যেও তাঁদের আদরণীয় করে তুলেছিল। ঘোর যুদ্ধ। কিন্তু তাই বলে বাঙলার সুররসিক, মার্গসঙ্গীতরসিক মানুষ সালামাত আলি নাজাকাত আলির মধ্যে কোনও ‘পাকিস্তানীকে’ দেখেননি, দেখেছিলেন দুই আদরের খেয়াল-ঠুংরি শিল্পীকে। দুই আকাট দেশ-নেতৃত্বের হাম্‌বড়াই আর সামরিক দম্ভ হেরে গিয়েছিল সংগীতের কাছে, রাগসঙ্গীতের কাছে। পাকিস্তানে ভারতের দূতাবাসও কখনও সালামাত আলি নাজাকাত আলিকে যুদ্ধ-চলাকলে ভিসা দিতে আপত্তি করেননি। তেমনি, \”এই বাঞ্চোৎ, ভারতের শ্রোতারা তোদের এতো ভালোবাসে কেন রে? তোরা নির্ঘাৎ ভারতের চর\” – এমন কথা পাকিস্তান সরকারের কেউ তাঁদের ঐ দুই শিল্পীকে বলেছিলেন বলে জানা যায়নি। বলা তো দূরের কথা, কেউ ভাবতেও পারননি – যতদূর মনে হয়।

তেমনি, যুদ্ধকালীন গান। – আকশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে সে-সময়ে নিয়মিত বাজত একটি গান, সমবেত কন্ঠে – ‘জননী তেরি জয় হ্যায়’। কার লেখা জানি না। সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। কী যে সুন্দর সুর আর ছন্দ, কী-যে চমৎকার গাওয়া আর যন্ত্রাণুষঙ্গ। দ্রুত ছন্দের গান, আনন্দের গান, কিন্তু কান্না পেত আমার – এতো সুন্দর। বিশেষ করে অন্তরা থেকে ফেরার সময়ে ‘জননী…জননী…’ – ঐ দ্বিতীয় ‘জননী’র আবেদনে। দেশপ্রেম না মাতৃভক্তি না। গানের সুর, ছন্দ ও গায়কীর কারণে। আজও আমার রক্তে বয়ে চলেছে সেই সুর, ঐ দ্বিতীয় ‘জননী’র জায়গাটা।

জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সুর করা এই যুদ্ধকালীন, ‘ভারতীয়’ দেশাত্মবোধক গানটির সুরেও পাহাড়ি রাগ। সেই সময়টাই কি ছিল পাহাড়ির?

পাকিস্তানের নাগরিকদের, বিশেষ করে ‘জওয়ানদের’ মনে সাহস ও দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য ঐ সময়ে একটি গান রচিত ও পরিবেশিত হয়েছিল। কী আশ্চর্য, “এয় বতনকে সজিলে জওয়ানোঁ/ ইয়ে নগমে তুমহারে লিয়ে হ্যাঁয়” – এই গানটিও ছিল পাহাড়ি রাগে। ভারতের গানটির চেয়ে ঢিমে তালের। ভারতের যুদ্ধ-কালীন সরকারি গানটি চার মাত্রায়, দ্রুত। পাকিস্তানের যুদ্ধ-কালীন সরকারি গানটি ছ’মাত্রায়, অনেকটাই ওয়াল্‌ট্‌স্‌ মেজাজে। লক্ষণীয় –ওয়াল্‌ট্‌স্‌ এককালে দরবারি নাচ ছিল, পরে এবং এখনও সামাজিক। মারামারিকাটাকাটির লেশমাত্র নেই। বরং আছে এক ধরণের অভিজাত আয়েস। অথচ পাকিস্তান বললেই তো সে-দেশের সামরিক বাহিনীর প্রাধান্যর কথাই মনে হয় এবং মোটামুটি ঠিকই মনে হয়। তাহলে তো ১৯৬৫র পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের গানের তাল-লয় হওয়ার কথা ছিল ‘মার্চ’, যেমন কাজি নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’। তা তো হলো না। হলো কিনা দাদরা, আসলে, ছন্দের মেজাজের দিক দিয়ে ওয়াল্‌ট্‌স্‌।

ভারতের গানটি তার সুরে-তালে-দ্রুতলয়ে উদ্দীপক চলনের। মেজাজের দিক দিয়ে কিন্তু পুরোপুরি নয়। পাকিস্তানের একই-সময়কার লড়াই-প্রস্তুতিমূলক গানের তুলনায় ভারতের একই উদ্দেশ্যে তৈরি গানটি বেশি প্রাণবন্ত ও উচ্ছ্বল। কিন্তু তার সঙ্গে যৌবন ও উৎসবের যোগ বেশি, লড়াই-এর নয়। শুনে বোঝাই যায়, গানটি জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ যে-উদ্দেশেই সুর করে থাকুন, হিংস্রতা, হিংসা, শত্রুনিধনেচ্ছা – এইসব ভালো ভালো রাষ্ট্রীয় জিনিস তাঁকে দলে টানতে পারেনি। উদ্দীপক গান বেঁধেও তিনি স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত, যৌবনের সুর বেঁধেছেন, যার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসছে তাঁর জিনিয়াস, তাঁর মেধা, তাঁর স্নেহ, তাঁর ভালবাসা।

পাহাড়ি রাগেই বাঁধা পাকিস্তানের তথাকথিত “উদ্দীপক” গানটি যেন প্রেমের গান (উৎসবেরও গান) – এমন সুর, ছন্দ, গায়কী। গানটি নাকি নূরজাহান গেয়েছিলেন পাকিস্তানের ফ্রন্টগামী জওয়ানদের সামনে দাঁড়িয়ে। খুবই নির্ভরযোগ্য সূত্রে আমি জানি, গানটি শুনতে শুনতে দশাসই, ব্যাট্‌ল্‌-গিয়ার চাপানো, জঙ্গি পোষাক পরা পাকিস্তানী জওয়ানদের অনেকেই নিরবে কাঁদছিলেন। “এই গান তোমাদেরই জন্য”। শুধু কি এই কথা শুনে? আমি বরং মনে করি ঐ গানের সুর, তাল, লয় ও গায়কীর আবেদনে। এই দেশেও এই গানটি ঠিকমতো গাইতে পারলে অনেকের চোখে জল এসে যাবে বৈকি।

দুই বিবদমান দেশ। দুই দেশের আকাট, স্বার্থপর, মেধাহীন নেতারা খেপে গিয়ে যুদ্ধে নামিয়েছেন তাঁদের সেনাবাহিনীদের, সৈন্যদের। নিজেরা ব’সে ব’সে আয়েস করে বিচি চুলকোচ্ছেন – মরবে তো ‘জওয়ানরা’। তাঁদের শোকে আমরা ফোঁপাতে ফোঁপাতে গাইব “হে আমার দেশবাসী/ চোখ একটু জল আনো/ যারা শহীদ হলেন/ তাঁদের কথা একটু মনে করো”। সেই “শহীদ”দের ভূত কোনওদিন আমাদের সব দেশের নেতাদের ও রাজনীতিকদের পাছায় পাছায় বুট-পরা পায়ের শহীদ-হওয়া লাথির চাষ করবেন না। – ঐ ধরণের গান সাধারণ মানুষদের রাষ্ট্রীয় যুদ্ধনীতির দাস বানানোর জন্য। হ্যাঁ, সঙ্গীত দাস-ও বানায়। এখনকার বাজারি সঙ্গিতের যা একমাত্র কাজ।

কিন্তু ১৯৬৫র পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ে দুই দেশের নেতাদের নীতি-নির্দেশেই যে দুটি গান দুই দেশে তৈরি ও প্রচারিত হয়েছিল তাদের সুর-ছন্দ-লয়ে-কাঠামোয় কোনও বৈরিতা ছিল না, হিংস্রতা ছিল না, ছিল না কোনও বিদ্বেষ। দুটি গানেই সব লড়াই, সব ক্ষুদ্রতা, সব হিংস্রতার ওপরে, অনেকটা ওপরে উঠে যাওয়া সঙ্গিতের রসই ছিল সবদিক জুড়ে। উৎকৃষ্ট সঙ্গীত।

আর, দুই দেশের দুই যুদ্ধকালীন সরকারি গানেই সুরভাবনার অবলম্বন ছিল একই রাগ।

চন্দ্রিলিয়ে ৪

আমার মা বাবা, কালীপদ দাস, আমীর খান, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ ও অন্য গুরুদের নাম নিয়ে শুরু করছি। দয়া করে কোনও মন্তব্য করবেন না।

গত রাতে নামহীন এক সহনাগরিক আমায় টেক্সট করে জানান – আমার গানওলা গানটি এক নবীন কোনও এক চ্যানেলের কী-এক শো-তে গেয়েছেন। টেক্সট-পাঠানো এই সহনাগরিকের লেখা থেকে বুঝলাম ব্যাপারটা তাঁর খুব ভাল লেগেছে। তিনি লিখেছেন – আমার কবীরদা এতদিন এই ধরণের অনুষ্ঠানে ব্রাত্য ছিলেন। ‘ব্রাত্য’ কথাটা ব্যবহার করেছেন তিনি। “এখন আর ব্রাত্য রইলেন না”।

মনে মনে তাঁর সহজ সরল মনটিকে আদর করলাম। কে তিনি, জানি না। জানার তেমন আগ্রহও নেই। এটুকু বুঝেছি, তিনি আমার গান ও আমায় ভালবাসেন নয়তো ঐ ভাষায় ঐ ভঙ্গিতে লিখতেন না। এমন মানুষের সংখ্যা বেশি না।

আজ সকালে আমার এক বিশিষ্ট বন্ধুও সেই ‘শো’ এবং সেই নবীনের গাওয়া আমার ‘গানওলা’ গানটির কথা টেক্সট করে জানিয়েছেন। তিনিও খুব খুশি।

তার কিছুক্ষণ পর, ঘন্টাখানেক ভাঙা গলা নিয়ে রেয়াজ করার চেষ্টা করার পর (পারলাম না, গলা ঘড়ঘড় করছে, যা তা, ফলে মেজাজ খারাপ) ফেসবুক খুলে দেখি আমার এক নবীন সহনাগরিক একই ঘটনার উল্লেখ করেছেন এবং, যা বুঝলাম, তিনি অখুশি।

গত রাতে অজানা সহনাগরিকের খুশিতে-ভরা টেক্সট পেয়ে আমার সেই মানুষটির সারল্যকে আদর করতে ইচ্ছে যেমন করেছিল তেমনি আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল – ‘এই রে!’

ইদানিং লক্ষ্য করছি এই সমাজের কেউ কেউ আমায় ‘সম্মান’ জানাতে, ‘সম্বর্ধনা দিতে’ চাইছেন। ফোন করে আমায় জানাচ্ছেন। অনেক দিন আগে আমার এক দুরন্ত-রসিক বামপন্থী বন্ধু গল্প করেছিলেন – তাঁর পরিচিত নকশালপন্থী কয়েকজন বিজন ভট্টাচার্যর কাছে গিয়েছিলেন তাঁকে সম্বর্ধনা দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে। তাঁদের কথা শুনে বিজন ভট্টাচার্য বলেন – “সম্বর্ধনা দেবা। তা, পয়সাকড়ি কিছু দেবা?” – নকশালপন্থী ব্যক্তিরা তো বেজায় অবাক। – তাঁরা – “সে-কী! আপনি বিজন ভট্টাচার্য। আপনাকে পয়সাকড়ি! আমরা আপনাকে সম্বর্ধনা দিতে চাই”।

খানিক চুপ করে থেকে বিজন ভট্টাচার্য নাকি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাঁদের বলেছিলেন – “ও, পয়সাকড়ি দেবা না, সম্বর্ধনা দেবা। – পোঁদ মারাও গিয়া”।

আমার সেই দুরন্ত-রসিক বামপন্থী বন্ধু আর আমি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিয়েছিলাম। আজও মনে পড়লেই হাসি। আমার দেহের প্রতিটি লোমকূপ হেসে ওঠে।

আমায় ‘সম্মান জানাতে চাওয়া’, ‘সম্বর্ধনা দিতে চাওয়া’ তিনজনকে এই গল্পটা বলেছি গত দেড় মাসে। তিনজনের কাছেই গল্পটা বলার আগে ও পরে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলাম। একজন খুব হেসেছিলেন। আর-একজন ছিলেন গম্ভীর। কয়েকদিন আগে যিনি আমায় ‘সম্মান জানাতে চেয়ে’ ফোন করেছিলেন তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল বছর তেইশ আগে। আমার মুখে বিজন ভট্টাচার্যর গল্প শুনে তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, “না, না, কিছু টাকাও দেব আমরা আপনাকে”।

আহা রে। আমার একটুও খারাপ লাগেনি, বরং ভাল লাগল। মানুষটি ভাল। সততার সঙ্গেই কথা বলছিলেন তিনি। আমি তাঁকে বললাম – আরও কিছু বছর যাক, আর-একটু বুড়ো হই, তারপর না-হয়…

আমার অনুভব – আমায় নিয়ে কী করা যায় এই প্রশ্ন অনেকের মনেই উঁকিঝুঁকি দিয়েছে দীর্ঘকাল। কেউ কেউ আমায় খুন করে ফেলতে চেয়েছেন। কেউ কেউ দল পাকিয়ে একটা “টেলিফোন কেলো” বানিয়েছেন – কলকেতার সাংবাদিক ও ফোটোগ্রাফারদের ওপর এক প্রাক্তন মন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে। কেউ-বা তাঁর CPIM/Subhash/DYFI/SFI sponsored শিল্পীজীবন শুরু করেছেন মঞ্চে মঞ্চে “তোমাকে চাই – চাই না” বলে হুঙ্কার দিয়ে (আজকের রৌনক-শ্রীপর্ণা-মৃন্ময়ী-সৈকত-দ্রুপদ-মনীষা-‘আউটকাস্ট’-বাংলাদেশের-বন্ধুরা তার কিছুই জানেন না, কারণ তাঁরা তখন বড্ড ছোট ছিলেন বা অন্য দেশে ছিলেন) তারপর দক্ষিণ কলকাতার এক মঞ্চে এক যুবতীর হাতে ঠাসানো থাপ্পড় এবং “এই চুত্‌মারানি, তোকে টাকা দেওয়া হয়েছে বালের গান গাওয়ার জন্য, তোর চ্যাঁটের বালের লেকচার শোনার জন্য নয়” এই অমৃতবাণী খাওয়ার পর তিনি ব্যাপক সরকারি স্পন্সরশিপে চালিয়ে গেছেন (পরে নতুন সরকারের স্পন্সরশিপে)। কেউ পুলিশের শরণ নিয়েছেন। কেউ আবার অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চেয়ে হল পাননি, কেউ লাইনবাজি করে পেয়েছেন, অনেকে নানান অজুহাতে আমায় দিয়ে মাগনায় একক অনুষ্ঠান করিয়ে নিয়ে পরে আমার পেছনের খারাপ কথায় কাঠি করেছেন, এখনও করে চলেছেন (এঁরা সকলেই বাম, কেউ ডান নন কিন্তু)। কেউ কেউ (নাম করা শিল্পী) মিটিং করেছেন আমার গানগুলো যা গান নয়, বাংলা গানের পক্ষে অতি ক্ষতিকর কিছু সেই দাবি নিয়ে (ওরকম একটি মিটিঙে শ্রোতাদের মধ্যে আমি নিজে ছিলাম – ময়দানে, শীতকালে, চাদর মুড়ি দিয়ে, তখন বেশি লোক আমায় দেখে চিনতে পারত না), তাঁদেরই মধ্যে কেউ আবার গ্রামোফোন কম্পানিকে ধ’রে আমার লেখা সুর করা গানের এলবাম করে পরে আবার – মহায়ণ – “দুর্যোধন শকুনিরে ডেকে বলে মামা/ মাই দিয়ে পোঁদ মারে হিড়িম্বারে থামা”। – প্লীজ, এটা কিন্তু সর্বজনসমাদৃত মহাসৃষ্টি ‘মহায়ণ’ থেকে নেওয়া। তারই মধ্যে তিনি আমার সঙ্গীত পরিচালনায় ছবিতে গান গাইতেও ছাড়েননি। কেউ আবার অন্তর থেকে আমার গান ভালবেসেছেন। তিনচার মাস ধরে এক মিথ্যে ৪৯৮এ মামলায় যখন গোটা রাজ্য তিনচার মাস ধরে আমায় ধর্ষণ করেছিল তখন কেউ আবার চ্যানেলে আমার পক্ষ নিয়েছেন (অঞ্জন দত্ত)। এই রাজ্যের পেশাদার গায়ক-সমিতি যখন আমায় বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন (যে-সমিতির সদস্য আমি কোনওদিন ছিলাম না) তখন একজন আবার তাতে সায় দেননি – পত্রিকার খবরে পড়েছিলাম (ইন্দ্রনীল সেন)। একাধিক বার এক বিরাট পত্রিকা যখন আমার বিরুদ্ধে নানান শিল্পীর মত সংগ্রহ করছিলেন তখন আবার একজন অন্তত বলেছিলেন ‘এ-ব্যাপারে সুমনবাবুর মতটা আমার জানা দরকার, একপেশে ব্যাপারে আমি মত দেব না’ – প্যারাফ্রেজ করলাম (ইন্দ্রাণী সেন)। A great vocalist and a LADY. কেউ ‘গান তুমি হও আমার মেয়ের ঘুমিয়ে পড়া মুখ’ শুনে ছোট্ট একটি মেয়েকে দত্তক নিয়েছিলেন – এক নিঃসন্তান দম্পতি। কেউ ক্ষমতাশালী-বামপন্থীশিবির+সুভাষাধীন সাংবাদিকবৃন্দ (সব্বাই নিশ্চই নন)+পুলিশের একাংশের সম্মিলিত উদ্যোগে বানানো ‘টেলিফোন চক্রান্ত’র সময় নিয়মিত আমার বাড়ি এসে আমায় সাহস দিয়েছেন (মাধবী মুখোপাধ্যায়, যিনি আমায় সেই সময়ে তাঁর প্রথম ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করার দায়িত্বও দিয়েছিলেন)। কেউ ফোন করে খিস্তি করেছেন। কেউ ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন ‘বন্ধু, তুমি কেঁদো না/ আমারও কান্না আছে”।

অতি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানি – এক সময়ে যখনএক বিশেষ শিবিরের কর্তাদের মধ্যে আমায় ‘নিউট্রালাইজ’ করার কথা চলছিল, খোলাখুলি চলছিল, সেখানে উপস্থিত এক উচ্চপদস্থ সচিব তখন বলেছিলেন, “ওঁকে না-হয় সরিয়ে দিলেন, ওঁর সুরগুলোকে কী করবেন?”

এতকিছু ঘটেছে দীর্ঘকাল ধরে যে গল্পগাছার মতো মনে হয়। আমি জানি অনেকেই আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। বেশ করবেন করবেন না।

আমার জীবন মোটের ওপর বাঁচা হয়ে গিয়েছে। অনেক কাজ পেতে পারত বাঙ্গালি আমার কাছ থেকে। বাঙলার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এবং বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত শ্রেণী তা চায় না। কতো কিছু করিয়ে নিতে পারত। কতো কী শিখে নিতে পারত। নিজে অনেক প্রস্তাব দিয়েছি ছেলেমেয়েদের কাছে। কেউ খাটতে চায় না। বেশিরভাগই নাম করতে চায়, শিখতে চায় না।

এরই মাঝে, “মন্ত্রীমশাই রাজকন্যার গুলিসুতো” খেয়ে ফেললেন, সৃজিতের কী দুর্মতি হলো, বেশ চালাচ্ছিল, হঠাৎ ওর ‘জাতিস্মর’ ছবির জন্য আমায় রাজি করিয়ে ফেলল। ঐ ছবিতে কাজ করে আমি একটা পুরস্কারও পেলাম। তাতে কেউ কেউ খুব আনন্দ পেলেন, কেউ কেউ গেলেন রেগে। ৩৬৫ দিন (নাকি শুধু ৩৬৫) কাগজে নামজাদা লোকেরা (আবার সেই “তোমাকে চাই – চাই-না”পার্টি) ঐ ছবিতে আমার কাজ যে কতোটা অখাদ্য তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগে গেলেন। বেশ করলেন।

আমি জানি সৃজিতের ঐ সিদ্ধান্ত ছিল ব্যতিক্রম। বেশ ছিল। – এদিকে – কী মুশকিল – “পক্ষীরাজই যদি হবে, ন্যাজ নেই কেন” – কৌস্তুভ রায় নামে এক নবীন প্রযোজক ও অনিকেত চট্টোপাধ্যায় তাঁদের ছবি ‘শঙ্কর মুদি’র সংগীতের জন্য আমার কাছে এলেন। অনিকেতকে আমি চিনতাম না। কৌস্তুভকে চিনতাম। ওকে আমি আমাদের আলাপের সময় থেকে ভালবাসি। ওকে ভালো না বেসে উপায় নেই। দুনিয়ায় কেউ কেউ থাকে এরকম। যেমন সৃজিত। আমি আমার কথা বলছি। কৌস্তুভ আমায় আগেই শাসিয়ে রেখেছিলেন – কবীরদা, আমার নতুন ছবিতে আপনাকে কাজ করতে হবে, গান বানানো, ব্যাকগ্রাউণ্ড দুটোই। – ওর ডাক্তার দেখানো উচিত। নিতান্ত পাগল না হলে কেউ আজকের দিনে এমন সিদ্ধান্ত নেয়। আমায় দিয়ে গান আর ব্যাকগ্রাউণ্ডের কাজ করাবে? ভাবুন দিকি।

কৌস্তুভ রায়-প্রযোজিত অনিকেত চট্টোপাধ্যায়-পরিচালিত ‘শঙ্কর মুদি’ ছবির গান কোনও কোনও ফালতু বাঙ্গালি আবার রেকর্ডও করে বসে আছেন। কী সর্বনাশ। – এইসব খবর নিশ্চই একটু হলেও ছড়াচ্ছে।

এদিকে “খুসখুসে কাশি ঘুসঘুসে জ্বর/ ফুসফুসে ছ্যাঁদা বুড়ো তুই মর” জ’পে যাচ্ছেন বাঙলার বিপুল সংখ্যক সুধী – সেই কোন্‌ যুগ থেকে। কতোজন মন্দিরে মসজিদে গীর্জায় মাজারে গিয়ে মানত করে চলেছেন নিয়মিত – “মাঝরাতে ব্যথা পাঁজরাতে বাত/ আজ-রাতে বুড়ো হবি কুপোকাৎ” – আহা। এতো আর্জি, মানত, ঘটি-উল্টনো, নিশি-ডাকের জন্য লোক ফিট করা – কুপোকাৎ আর হচ্ছে না বোকাচোদা বেজম্মা বুড়ো মোল্লা।

কেউ কেউ হয়তো ভাবছে – ধুৎ, কী আর করা যাবে, আজকাল যা যা চলছে তাতেও কাজ হচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথের গানের পোঁদ দিয়ে তো রাজধানী এক্সপ্রেস চালালাম, ‘দুরন্ত’ ‘শতাব্দী’ ‘পুরি এক্সপ্রেস’ ‘করমণ্ডল’ সব চালালাম। শালা, জুৎ হচ্ছে না। এবারে ‘ফুসফুসে ছ্যাঁদা’টাকে ধর্‌। এই মালেরও কিছু জিনিস আছে। শালা, কেউ কেউ জানে। চালাও পানসি বেলঘোরিয়া।

কেউ কেউ আবার ভেবে থাকতে পারেন – আরে, মালটা আছেই যখন, দেখা যাক না দু’একটা এপ্লাই করে। যদি লেগে যায়। আর গানওলা গানটা তো বুড়ো নিজেই গেয়েছিল মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কী-একটা খেতাব নেওয়ার সময়। কাজেই এই গানটা কেউ গাইলে সেটা politically correct-ও হবে।

“কেবল বলে – হোঃ হোঃ হোঃ কেষ্টদাসের পিসি/ বেচত খালি কুমড়ো কচু হাসের ডিম আর তিসি” – এই বুড়ো বোকচোদ্‌ সি এমের সামনে ‘গানওলা’ গাওয়ার পর বাঙলার এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিপ্লবী (তাঁর নাম করতে করতে লেনিন লেখালিখি করতেন/ মাও তাঁর ইয়েনান ফোরাম ভেবেছিলেন/ তাঁর নাম বুকে উল্কিতে লিখে চে বলিভিয়ার জঙ্গলে গিয়েছিলেন/ উফ্‌ফ্‌ – কী ভাগ্যবান আমি, তাঁর দর্শন পেয়েছি!!!!) ফেসবুকে লিখেছিলেন “এই পালটানো সময়ে সে ফিরবে কি ফিরবে না জানা নেই…” ওঃ হো—কেষ্টদাসের পিসি নয় পিসে। সেটা পড়ে আমার এক ছেলে দ্রুপদ ফেসবুকেই লিখেছিলেন – ‘সে যেন আর না ফেরে/ আপনিই তাঁর শূন্যস্থান পূরণ করবেন’।

অর্থাৎ বুঝেছেন তো, কোনও শো-তে ‘গানওলা’ গাওয়াটা politically correct. – এটাও একটা ‘জায়গা’ হতে পারে।

আবার কেউ হয়তো এমনিই গেয়েছেন, গানটা তাঁর ভালো লেগে গেছে বলে, গাইতে ইচ্ছে করেছে বলে।

গানবাজনার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বহুস্তর বিশিষ্ট। প্রত্যেক যুগ তার হাতে অতীত থেকে যা এসেছে তা একটু নিজের মতো করে নেয়। একটু এদিক ওদিক করে নেয়। এটা হবেই। আমাদের বাংলা গান কিন্তু কোথাও একটা “ফোক সং”-এর বৈশিষ্টটাকেও ধরে রেখেছে – কালোয়াতি-প্রধান গানগুলো ছাড়া। রবীন্দ্রনাথের কিছু গান বাঙলার “ফোক সং” হয়ে গেছে। কাজি নজরুল ইসলাম, হিমাংশু দত্তর গান কিন্তু তা হতে পারেনি সেই অর্থে। দিলীপ কুমার রায় জীবনের শেষ দিকে নাকি দুঃখ করতেন – তাঁর গান লোকে শুনল না, গাইল না। কী করে গাইবে। কী কঠিন রে বাবা। গাওয়ার আগে তো ৩০ বছর একটা ঘরে বসে গলা তৈরি করতে হবে। তাঁর গানে “ফোক সং” হয়ে ওঠার উপাদান তেমন ছিল না।

তেমনি, রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা গানও সব সময়ে ফোক সং হয়ে উঠতে পারেনি। নানান কারণে, যার একটা হলো ‘কথা’, আর-একটা হলো – অনেক গান প্রশিক্ষিত, দক্ষ গায়কী বিশিষ্ট কন্ঠশিল্পীদের উপযুক্ত করে, তাঁদের কথা ভেবেই তৈরি – সুরের দিক দিয়ে। রীতিমতো দক্ষতা না থাকলে সেইসব গান গাইতে পারবে ক’জন? অল্প বয়স থেকে গান শিখলে, ভাল গুরুর কাছে তালিম নিলে এবং প্রচুর গান শুনে শুনে নিজের রক্তে মিশিয়ে না নিতে পারলে সেইসব গান ঠিকঠাক গাওয়া প্রায় অসম্ভব। কেউ কেউ সে- প্রয়াস পান। মাইরি, ভাল লাগে না, মায় হাসিও পায়। কিছু করার নেই।

হাতে রেখা আসে না (কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং ছাড়া), আঁকার প্রতিভাই নেই, কখনও কারুর কাছে শিখিনি, নানান ছবি দেখে দেখে কপি করার ‘রেয়াজ’ করিনি (গানের পর গান শুনে শুনে তুলতে চেষ্টা করার মতোই), কিছুই পারি না, অথচ আমি বড় বড় শিল্পীর অনুকরণে, ধাঁচে ছবি আঁকব এবং সবাইকে তা দেখতে ও তারিফ করতে হবে – কী মুশকিল বলুন তো?

কিন্তু ছবির ‘শো’ বাজার নেই, থাকলে আমরা দলে দলে অবন ঠাকুর গগন ঠাকুর গণেশ পাইন হতাম বুক ঠুকে। পিকাসসোর ‘গের্নিকা’? আমার ছেলেরটা দেখেছেন? আমার ছেলেরটা? উফ্‌ফ্‌। কী জিনিস, আমার ছেলেরটা। হুঁ হুঁ, বারো বছর বয়সেই যা! এই বয়সেই যা জিনিস। যা এঁকেছে তাতে পিকাসসোকে আবার জন্ম নিতে হবে।

কিন্তু painting, drawing, sketch, sculpture – এসবের ‘শো’ হয় না চ্যানেলে চ্যানেলে। খেলারও হয় না। সাঁতারেরও হয় না। খাতা বানানো, সেলাই করা, উল বোনা – কিছুরই হয় না। হয় গানের। গান গাওয়ার।

সঙ্গীত আর শেখার জিনিস না, দেখার জিনিস, ক্যামেরার সামনে করে দেখানোর জিনিস। তাই গানবাজনার শো-তে নাম দিতে অনেকেই আগ্রহী।

কী ধরণের গান গাইবে? কোন্‌ গান? চল্লিশ দশকের গান? পঞ্চাশ দশক? কিছু নিশ্চই। ভাবতে থাকুন – দেখবেন গাওয়ার মতো গানের সংখ্যা ক্রমশ কমবে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা, বেচারিরা, অনেক গান শোনেইনি, জানেই না। কোত্থেকে শুনবে? এবারে হঠাতই হয়তো কারুর মনে হয়েছে কোব্‌রে সুমনের দু’একটা গান গাওয়া যেতে পারে। বেশি লোক গায় না। সেভাবে বলতে গেলে কেউ গায়ই না – গাইলেও খুব কম। ‘গানওলা’ বা ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’ – কালোয়াতি নেই, সহজ সুর, ছন্দটা সহজ, ‘ফোক সং’এরই মতো, কথাগুলো আপত্তিকর নয়। গেয়ে দেওয়াই যায়।

শো পরিচালকদেরও – হেঁ হেঁ বুড়ো বোক্‌চোদ্‌ একটা জাতীয় পুরস্কার (courtsey – আমাদের সৃজিত – বেচারির দুই পায়ে যন্ত্রণা, আসুন সকলে মিলে কামনা করি ও তাড়াতাড়ি সেরে উঠুক), রাজ্য সরকারেরও খেতাব পেয়ে গিয়েছে, কাজেই সরকার বা চ্যানেলেরও তেমন আপত্তি হবে না বুড়োটার খানদুইতিন innocuous গান কেউ গেয়ে দিলে। অতএব – হোক্‌, হয়ে যাক্‌।

এরকম কিছুই হয়ে থাকবে।

গাওয়ায়, বাজানোয় এদিক ওদিক হবে। হবেই। এ নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়ে কী লাভ? সব পাল্টায়। কেউ ভালবেসে একটা গানই তো গাইছে। গানটা তো কুরুচিকর নয়। এইভাবেও দেখা যায়। আর, কবীর সুমনে তাঁর বা চ্যানেলের কোনও আপত্তি নেই।

ইদানিং খুব নাম করে যাওয়া এক মহাশিল্পী এক বিরাট পত্রিকায় তাঁর সুচিন্তিত মত ব্যক্ত করেছিলেন। নিজে পড়েছি। “সুমন চট্টোপাধ্যায়ের গান ভাল লাগত, কবীর সুমন নয়”।

চন্দ্রিলিয়ে ৫

কেউ যদি বলে ‘জল পড়ে পাতা নড়ে/ পাগলা হাতি মাথা নাড়ে’ কবিতা, অনেকেই হেসে ফেলবেন। সেই জল-পড়া-কবিতা-বাবু বা বিবি যদি বলেন – ওটা শুধু কবিতা তাই নয় জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের এক দিন’-এর চেয়ে ঢের ভালো, ধ্যুৎ ‘আট বছর আগের এক দিন’ কোনও কবিতাই নয় – যাঁরা হাসছিলেন তাঁরা সম্ভবত আর হাসবেন না। বক্তার মাথার অবস্থা নিয়ে চিন্তায় পড়বেন। আর কথা বাড়াবেন না।

সঙ্গীত, গানবাজনার বেলা আমরা কিন্তু এই ধরণের তুলনা যথেষ্টই করে থাকি, জোর গলায় জাহিরও করে থাকি। এই ব্যাপারটা আমি বাংলায় (বঙ্গভূমিতে) এতো দেখেছি, শুনেছি যে সন্দেহ হয় গানবাজনা শোনার কান নিয়ে দুনিয়ার এই অঞ্চলে খুব কম মানুষ, মানে বাঙ্গালি জন্মায়। জীবনের ১৩/১৪ বছর পাশ্চাত্যে কাটিয়েছি। সেখানে পাশ্চাত্যের মানুষের সঙ্গেই বেশি মিশেছি, এড়িয়ে গিয়েছি উপমহাদেশীয় ও বাঙালিদের ‘গেটো’। পাশ্চাত্যে কিন্তু গানবাজনার উৎকর্ষ বা অপকর্ষ নিয়ে অমন বিদ্ঘুটে কথা শুনিনি – বাংলায় যা শুনে আসছি জ্ঞান হওয়ার পর থেকে। এখনও শুনছি।

বাঙ্গালি নামটা যখনই ব্যবহার করব, ধরে নেবেন, বুঝে নেবেন আমি কিন্তু বাঙলার চাষী, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমোর, ছুতোর, মিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, মাঝি, গাড়োয়ান, ধোপা, নাপিত, ময়রা, কসাই, মুর্দোফরাস, ডোম – এঁদের কথা বলছি না। কায়িক শ্রম দিয়ে যে বাঙালিরা জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন, অথবা যাঁরা কোনও হাতের কাজ বা ইলেকট্রিকের কাজ শিখে খেটে খাচ্ছেন তাঁদের কথাও বলছি না। আমি বলছি আমার শ্রেণীভুক্ত ‘বাঙালিদের’ কথা। বাঙলার মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষদের কথা। মধ্যবিত্ত শ্রেণীটাই এতো বড় হয়ে উঠেছে যে এই শ্রেণীটাই একটা জাতি। এই জাতির সঙ্গে বাঙলার অন্যান্য শ্রেণীর মানুষের সাংস্কৃতিক যোগ প্রায় নেই বলা চলে।

আমি, যেমন, বাঙলার চাষী বা জেলে বা মাঝিমাল্লাদের সঙ্গে মিশিনি। তাঁদের মন মানসিকতা সম্পর্কে কিছুই জানি না। তবে, বাঙলার নগরসভ্যতা ও নগরসংস্কৃতি এতোদূর ছড়িয়ে পড়েছে যে সেই ১৯৭৪ সালে (ওরে বাবা, চার দশকেরও আগে) দুই বন্ধুর সঙ্গে বীরভূমের, যতোদূর মনে আছে, সুরুলে বা তার কাছাকাছি কোথাও বাউলদের বড় একটা মেলায় গিয়ে শুনেছিলাম, অনেক দূর থেকে শুনেছিলাম মেলার মূল মণ্ডপের ‘অফিস’ থেকে চোঙা স্পীকারে গাঁক্‌গাঁক্‌ করে বাজানো হচ্ছে ‘বার্লিন মেলডি’। বিলিতি সুর বিলিতি ব্যাণ্ডের বাজানো।

আমার কৈশোরে, মানে গেল শতকের ছ’এর দশকে কয়েকটি বিলিতি বাজনার সুর কলকাতায় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। একটি ছিল ‘লিম্বোরক্‌’। আর-একটি ছিল ‘টেকিলা’। সেই সঙ্গে ‘কাম্‌ সেপ্টেম্বর’ ছবির থীম এবং (সেই ৭৮ আর পি এম গ্রামোফোন ডিস্কের অপর পিঠে) ‘বার্লিন মেলডি’।

সুরুলের বাউল মেলায় যাচ্ছি, তিনজনেরই বয়স ২৫/২৬। অফিস থেকে তিন দিন ছুটি নিয়েছিলাম। হাতঘড়িও পরে যাইনি আমি। মরুক্‌-গে শালা সময়। তার আগে কালকূটের কোথায় পাবো তারে পড়ে আমাদের কারুর কারুর মনে একটা বাউল বাউল ভাব এসে গিয়েছিল। আমার বাবা পর্যন্ত কেমন যেন হয়েগিয়েছিলেন। আমাদের বাড়িতে প্রথম বাচ্চা জন্মালো যখন, আমার বৌদির, বাবা সেই মেয়ের নাম রাখলেন ‘ঝিনি’ – ‘কোথায় পাবো তারে’র ‘ঝিনি’কে মনে রেখে। আমার ইচ্ছে ছিল ‘নয়নতারা’। বাবার এক ধমকে ইচ্ছেটা উড়ে গেল।

সবকিছুর সঙ্গেই কোথায় যেন ‘কোথায় পাবো তারে’, কালকূট আর বাউলের যোগ। এই সময়ে যাচ্ছি বাউল মেলায়। মনমেজাজ অন্যরকম। তারই মধ্যে আমার বোকাবোকা প্রথম বিয়েটা ভেঙে গিয়েছে, কাজেই মন ফুরফুরে। মুক্ত। … বোলপুরে নেমে সেখান থেকে বাসে কোথায় যেন…সেখান থেকে সাইকেল ভ্যানে চেপে মেলা। ভ্যানে পা ঝুলিয়ে বসে তিন বন্ধুতে যাচ্ছি আর দূর থেকে শুনছি লাউডস্পীকারে ‘বার্লিন মেলডি’। কোথায় পাবো তারেই বটে।

কলকেতা যা কীভাবে গ্রামের পেছনের বন্দোবস্ত করে দিয়েছে দেখছি সেই ১৯৭৪ সালেই। তবে, এটা হয়তো হতোই। ঠ্যাকানো যেত না। ঠ্যাকানোর কোনও মানেও হতো না হয়তো। বাউলদের প্রায় সব আখড়ায় টেপ রেকর্ডার নিয়ে বসে আছেন শহরের বাবুবিবি। সকলেই সুসজ্জিত, প্রাণপণে বঙ্গসংস্কৃতির অভিভাবক সাজার চেষ্টা করে চলেছেন এবং কোনও কোনও বাউল তাঁদের তোয়াজ করছেন (পেটের দায়)। প্রায় সব আখড়ায় মাইক। বাউলরা মাইক্রোফোন বুঝে গাইছেন চাপা গলায়। গলা খুলে গাইছেন কম বাউলই। এটাও হয়তো আধুনিক যুগে অমোঘ। খুঁজেখুঁজে শেষে একজন বাউলকে পেলাম যাঁর সাউণ্ড সিস্টেম নেই। তিনি গলা খুলেই গাইছেন আর ক্ষেদ করছেন – দেখছেন, একটা মাইকও জোটাতে পারলাম না।

ভাল লাগল না বলে ঠিক করলাম কোথাও একটা দিশি মদের দোকান খুঁজে ক’পাত্র খেয়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়ব। অনেক বাউল হয়েছে, এবারে কোনোরকমে বোলপুর স্টেশনে গিয়ে সেখান থেকে কলকাতা। কুঁড়ে ঘরে দিশির দোকান। খেয়েদেয়ে দাম দিতে যাচ্ছি, দোকানি বললেন, “দাদারা চলে যাচ্ছেন নাকি? থেকে যান, কাল সন্ধেবেলা মেলায় ‘ববি’ দেখাবে”। – ববি – হিন্দি ছবি।

নগরসভ্যতা আমাদের গ্রামের অনেকটাই খেয়ে ফেলেছে। কী আর করা যাবে। কিন্তু গ্রামের বাঙালিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বিশেষ হয়নি। ভোট করতে গিয়ে গ্রামের মানুষদের সঙ্গে পরিচয়, মায় এক ধরণের পলিটিকাল বন্ধুতাও হয়েছিল। ঐ পর্যন্ত। গানবাজনা নিয়ে আলোচনার প্রশ্নই ওঠেনি, যদিও ভোটের প্রচারে আমায় বারবার গান গাইতে হয়েছে, মানুষ মন দিয়ে শুনেছে। সলিল চৌধুরির ‘ধান কাটার গান’ শুনে মেতে উঠতে দেখেছি ভাঙড়ের কৃষকদের। কিন্তু আলাপ আলোচনা হয়নি।

নাগরিক মধ্যবিত্তদের গানবাজনা-মতামত শুনে আসছি গত ৬০ বছর ধরে – কটক থেকে কলকাতায় আসার পর থেকে।

কতকটা ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান বা সত্যজিৎ ঋত্বিকের মতো। সাপোর্টার মনবৃত্তি। পাঁচের দশকে এক দল বাঙালিকে দেখতাম যাঁদের মত ছিল – ‘রেখে দে তোদের হেমন্ত-সতীনাথ; অখিলবন্ধু ঘোষের ধারেকাছে দাঁড়াতে পারবে? হেগে দেবে রে ঐরকম গলার কাজ করতে গিয়ে’।

অখিলবন্ধু ঘোষ নামটা করতেই আমার নিজের গানের কেরিয়ারের কথা মনে পড়ে গেল। ‘বয়স আমার মুখের রেখায়’ গানটিতে আমি লিখে ফেলেছিলাম – ‘তারই ফাঁকে কোথায় যেন অখিলবন্ধু ঘোষের গলা’। ব্যাস, আর যায় কোথায়। এলবামটা releaseই করেছিল গোল্ড ডিস্ক দিয়ে – প্রাক্‌প্রকাশ আগাম বিক্রীর জোরে, অনেকেই শুনছিল। ব্যাস। কলকেতার দুই নবীন শিল্পী (‘আজকাল’এ বেরিয়েছিল) চলে গেলেন সটান অখিলবন্ধু ঘোষের স্ত্রীর কাছে। কাগজের রিপোর্টার ও ফোটগ্রাফারকে সঙ্গে নিতে ভুললেন না। তার আগে প্রায় বছর তিরিশেক অখিলবন্ধুর নামও বাজারে তেমন শোনা যায়নি। যাঁরা হঠাৎ ‘বয়স আমার মুখের রেখায়’-এর ঠ্যালায় অখিলবন্ধু ঘোষের বাড়িতে ছুটলেন তাঁরা অখিলবন্ধু বলতে জানতেন হয়তো বড়জোর খান দুই-তিন গানের কথা। তাঁদের বয়সই অতো ছিল না যে তাঁরা আরও বিশদ জানবেন। আজ তাঁদের বয়স বেড়েছে। কিন্তু আজও যদি তাঁদের বলা হয় মন থেকে, ধরা যাক, ‘শিপ্রা নদীর তীরে’ বা ‘আজি চাঁদিনি রাত গো’ গানটি গাইতে, ধরুন প্রথম অন্তরা অবধিই সই, তাঁরা পারবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু ঐ যে, শালা সুমনের গানে এসে গিয়েছে, কাজেই কর্‌ শালা একটা কিছু। নয়তো হারামিটা একা একা দই মারবে, সেইসঙ্গে আমাদের ইয়েটা – শালা মনে হবে ঐ বিদেশফেরত, টেকো, ভুঁড়িঅলা, মেমচোদা, পায়জামা-পাঞ্জাবির বদলে ডেনিম-মারানো, হারমোনিয়ম নয় গিটার-হাতে পোঁদ-নাচানো, কোনও পার্টিকে নেতাকে পাত্তা না-দেওয়া, নিজের মেজাজে-থাকা, নবীনদের এক অংশের ওপর প্রভাব-ছড়ানো হারামিটাই একমাত্র মনে রেখেছে অখিলবন্ধু ঘোষকে। জানি এক্ষুনি রব উঠবে নানারকম, তাতে আমার বালও ছেঁড়া যায় না, আমার জীবন বাঁচা হয়ে গিয়েছে, কারুর কাছে আমার কিছু চাওয়ারও নেই পাওয়ারও নেই।

তা, অখিলবন্ধুপন্থীরা আসর গরম করেছিলেন প্রধানত পাঁচের দশকে। সে ছিল পন্থীদের সময়। হেমন্তপন্থী, সতীনাথপন্থী, ধনঞ্জয়পন্থী, অখিলবন্ধুপন্থী। কিন্তু মাপকাঠিটা কোথায়? কেমন?

গলার কাজ? একটু কালোয়াতি-করা গান? কিন্তু অখিলবন্ধুর গানে কালোয়াতির দেখনদারি তো ছিল না। বরং ছোট কাজগুলো তিনি সহজভাবে করে দিতেন – যা অতি কঠিন। আর কারুকাজই যদি মাপকাঠি হয়, সতীনাথের কথাই বা বলব না কেন আমরা? তিনি তো দস্তুরমতো রাগপ্রধান গানের রেকর্ডও করেছিলেন। অখিলবন্ধুর মতো সতীনাথও আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রর ‘রাগপ্রধান গান’-এরও শিল্পী ছিলেন। মিয়াঁ মল্লার রাগে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘ময়ুরী নাচে আজি, ডাকে দেয়া গগনে’ (সুরটা মিয়াঁ মল্লারের বিখ্যাত তিনতাল-মধ্যলয়-দ্রুত বন্দিশ ‘বোল্‌ রে পাপিয়ারা’র মতো) পুরোদস্তুর দ্রুত খেয়ালের বন্দিশ বলা যায়। আজকালকার কেউ চেষ্টা করে দেখলে পারেন। আমার তো হয়ই না।

তেমনি, ‘কোথা তুমি ঘনশাম’ – কৌশি কানাড়া রাগে সতীনাথের রেকর্ড, বা ভৈরবীতে ‘রাধিকা বিহনে কাঁদে রাধিকারমণ’। তাহলে? তাহলে অখিলবন্ধু আলাদা করে মহান কেন? এর কোনও সদুত্তর কেউ দিতে পারতেন না, শুধু রেগে যেতেন সতীনাথের কথা তুললে। আহা, আমি তো অখিলবন্ধুর বিরোধিতা করছি না। কিন্তু শোনে কে।

তেমনি হেমন্তপন্থীরা একটা আলাদা মার্গের দাবিদার ছিলেন। অন্য কারুর নাম সহ্য করতে পারতেন না। তার ওপর উত্তমকুমারের ‘লিপে’ হেমন্তর একের পর এক গান বড় বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল অন্যান্য-গায়ক-পন্থীদের। কিন্তু গানবাজনার আলোচনায় উত্তমকুমারের ঠোঁট কেন? তাঁর সুন্দর মুখটাই বা কেন?

পাঁচের দশকে শ্যামল মিত্রর নানান গান রেডিয়োয়, পুজোর প্যাণ্ডেলে যথেষ্ট শোনা গেলেও তাঁর গলার চিকন আওয়াজের জন্যেই বোধহয় বাঙ্গালি (প্লীজ মনে রাখবেন বাঙ্গালি বলতে আমি কাদের বোঝাচ্ছি) তাঁকে বিশেষ সিরিয়াসলি নিত না। জলসায় কিন্তু শ্যামল বসলে তার পর আসর জমানো মুশকিল ছিল। তাঁর গলার মাধুর্য আর মুক্ত গায়কি যেন পাখি বানিয়ে ছাড়ত গানগুলোকে, চোখের সামনে দেখতাম পাখিগুলো উড়ে যাচ্ছে ডানা মেলে।

বাঙ্গালি ভাল করে খেয়ালই করেনি শ্যামল মিত্র কতোটা ক্ষমতা রাখতেন। সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে মধুমন্তী রাগে তাঁর গাওয়া ‘দোলনচাঁপা দোলে’ স্রেফ মধ্যলয় খেয়ালের বন্দিশ। গ্রামোফোন রেকর্ড ছিল। মর্জি হলে শ্যামল যৎ তালে ঠুংরি গাইতে পারতেন। যাঁরা শুনেছেন তাঁরা জানেন। অনেক নামজাদা গায়কের ভাত মেরে দিতে পারতেন তিনি। কিন্তু তিনি ঠুংরির পথে থাকেননি। আধুনিক বাংলা গান ছিল তাঁর রাজ্য। আমার নামে কুকুরই পুষুন আর খিস্তিই করুন – আধুনিক বাংলা গান রাজ্যের প্রথম ও শেষ স্বাধীন নবাবের নাম শ্যামল মিত্র।

কিন্তু শ্যামলপন্থীরা হেমন্তপন্থী ও সতীনাথপন্থীদের চেয়ে দুর্বল ছিলেন। কেন? শ্যামলের গলার চিকন আওয়াজ? তাহলে শচীন দেব বর্মনের কী হবে? তাঁর আওয়াজ তো পঙ্কজ কুমার মল্লিক, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো গম্ভীর নয়?

একদিকে বাঙ্গালি একজনকে ভালো বলতে গিয়ে আর একজনকে অবহেলা করবেই। যেমন, ঋত্বিক ভাল, মানে সত্যজিৎ খারাপ। অন্যদিকে গানবাজনার আলোচনায় মাপকাঠিটা কী হওয়া দরকার, কোন্‌ কোন্‌ দিক বিচার করা দরকার তা নিয়ে বাঙালির মনে স্পষ্ট কোনও ধারণাই তৈরি হয়নি কোনওদিন । গানবাজনা নিয়ে যাঁরা পত্রপত্রিকায় লিখে এসেছেন, বিশেষ করে যাঁরা পাঁচ, ছয় ও সাতের দশকে যাঁরা লিখতেন তাঁদের সুররসিক বলতে রাজি নই আমি। আদৌ রসিকই বলতে পারব না তাঁদের। প্রায় সকলেই ছিলেন ‘আধুনিক বাংলা গানের’ বিরোধী। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্রশতবর্ষযজ্ঞের পর তো – ওরে বাবা।

একজন (নামটা ভুলে গিয়েছি), তিনি আবার পুরস্কারপ্রাপ্ত, অতীতের বাঙ্গালি গায়কদের (যেমন অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়, লালচাঁদ বড়াল, জ্ঞান গোঁসাই, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়…) প্রশংসা করতে গিয়ে পাঁচ ও ছয়ের দশকের বাঙ্গালি গায়কদের (হেমন্ত, সতীনাথ, শ্যামল, মানবেন্দ্র, সন্ধ্যা…) সঙ্গে পুঁটিমাছের তুলনা করেছিলেন।

সেই একাডেমি না কী একটা পুরস্কার পাওয়া বেরসিকটার পাছায় লাথি মারার সুযোগ পেলাম না – এটার চেয়েও যা গুরুতর – গানবাজনা নিয়ে আলোচনা করার ভাষা ও methodology আগেও তৈরি হয়নি, আজও হলো না। আর কোনওদিন হবে এমন ভাবাও মুশকিল, কারণ গানবাজনার কান ও মন তৈরি হওয়ার objective conditions আর নেই আমাদের সমাজে। সবকিছু বেবাক পাল্টে গিয়েছে। এখন মিডিয়া ঠিক করে দিচ্ছে কে ভাল, কে কে ঠিক পথে চলেছে তার /তাদের গান বা ছবি বা নাটক নিয়ে, আর কে কে অতীতের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপযোগ্য, যেমন আমি।

আর চেপে রেখে কী হবে। প্রেমে বা পছন্দসই মেয়েদের কাছে মিছে কথা বলে বলে সিদ্ধজিভ এই আমি এই একটি ব্যাপারে অন্তত সত্যি বলি না হয়।

আমেরিকাপ্রবাসী এক বাঙালি (আমার অচেনা) কয়েক বছর আগে আমায় তাদের সংস্থার খরচে আমেরিকা নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কেন জানেন? গান-“টান”-এর জন্য নয়। সেখানে গিয়ে একটা অনুষ্ঠানে শ্রী অনুপম রায়ের মাথায় হাত রেখে আমায় বলতে হবে – আমার পর ইনিই বাংলা গানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। ইনিই এখন পথ দেখাচ্ছেন ও দেখাবেন। বেচারা অনুপম রায়। কী গুরু-দায়িত্বই না দিচ্ছিলেন সেই এন আর আই-সংস্থা তাঁকে। সেই এন আর আই এমনকি আমায় টাকাও দিতে চেয়েছিল সে-জন্য। লোকটার দোষ নেই, কারণ না-পড়লে পিছিয়ে-পড়ে দড়াম করে আছাড় খেতে হয় যে মহান পত্রিকাটি, তাঁদের একটি খবরে আমি নিজেই পড়েছিলাম – ‘তোমাকে চাই’-এর পর, সেই যুগের অবসানে নতুন এক অভ্যুদয়। হুবহু এমনটা নয় অবশ্যই। ওটা কি সমর সেনের কবিতা যে হুবহু মনে রাখব? প্যারাফ্রেজ করলাম।

‘জাতিস্মর’ ছবিটির ‘সঙ্গীত’ নিয়ে লেখালিখি করতে গিয়ে একজনও সৃজিতের বেছে দেওয়া অতগুলি কবিগানের কথায় আমার দেওয়া সুর, সেই সঙ্গে আমাদের তৈরি যন্ত্রাণুষঙ্গ এবং গায়কগায়িকাদের গাওয়া, তাঁদের গায়কি নিয়ে বিশেষ কিছু বলেছিলেন কি? বলেননি, কারণ ঐ ‘গান’গুলি নিয়ে, সুরগুলি নিয়ে আলোচনা করার শিক্ষাদীক্ষা, যোগ্যতাও ছিল না কারুর, – মানে যাঁদের লেখাগুলো পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম সেই সময়ে।

পাশ্চাত্যে সঙ্গীত নিয়ে আলোচনার জমি অনেক যুগ থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে, তাও এ-বিষয়ে নানান মতও আছে। আমেরিকান কম্পোজার, সঙ্গীত-ভাবুক-ও-লেখক Aron Copland সেই কবে সখেদে বলে গেছেন – সঙ্গীত non-verbal medium, আলোচনা করা মুশকিল। তেমনি আবার কোনও কোনও ভাবুক Information Theory প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন সঙ্গীত বিশ্লেষণে। খুবই ইন্টারেস্টিং। কিন্তু মুশকিল হলো – স্বরলিপি না জানলে সেখানেও কারুর দাঁত ফোটানোর উপায় নেই, তবু এই দিকে চেষ্টা করা যেতে পারে – যদি ভারতীয় সঙ্গীত ও বাঙলার সঙ্গীত এবং সেই সঙ্গে পাশ্চাত্য সংগীতের বনিয়াদী দিকটা সম্পর্কে সম্যক ধারণা কারুর থাকে। শুধু গানবাজনার ‘কালেকটর’ হলে চলবে না। ১০০ টেরাবাইট জমিয়েছি – হুঁহুঁ-বাওয়া – মাইরি, এটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নয়। তেমনি, উফ্‌ পঞ্চম আর গুলজার, গীতম আর মিতম, ডিলান আর কোহেন শুনেছি, গিটারে কর্ড ধরে গাই, ঐন্দ্রিলা শোনে, চ্যানেলেও গেছি – Sorry, সংগীতের সিরিয়াস, যুক্তিগ্রাহ্য আলোচনায় এগুলো যথেষ্ট নয়।

আমি নিজেও রাস্তা খুঁজে চলেছি। একটা methodology তৈরি করতে পারব কি কোনওদিন? মনে তো হয় না। আর কটা কাজ করব রে বাবা।

সংযোজনেঃ তীর্থংকর গোস্বামি

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress