কবীরের সব প্রেম

বারবার প্রেম। কামনাবাসনা। সমকাম। কিংবা অন্যের বিবাহিতা নারীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেওয়া।
কত কী-ই তো পেতে ইচ্ছে করে! স্বীকারোক্তি কবীর সুমন-এর। সামনে সুমন দে.

তুমি প্রায়ই বলো, তুমি হচ্ছ ‘বাঙালির সাক্ষাৎ বিচিত্রবীর্য’।
নব্বই দশকের গোড়া থেকে প্রচারমাধ্যমের তীব্র আলো তোমার ওপর। পর্দায় সুপারস্টাররা ইমেজ ধাক্কা খাবে এই ভয়ে অনেক কিছু লুকিয়ে যান। কবীর সুমন যখন তার মহিলাসঙ্গের কথা বলে, বলে আসে এখনও, তখন তার এই ভাবমূর্তি-ভঙ্গের আশঙ্কা হয় না?
দেখো, এটা একটা টাইপ। আমি মুক্তকামে বিশ্বাস করি। আমি কারও সম্পত্তি না, কেউ আমার সম্পত্তি না। বিবাহ একটা সামাজিক জায়গা। ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টের মতো— ইন ফ্যাক্ট বিয়ের কোনও কারণ দেখি না। আবার কারণ দেখি-ও। একটি মেয়ে, বিবাহিতা, তিনি যখন আমায় আজ্ঞা করছেন— ‘কাল সন্ধেবেলা তুমি আমায় সিঁদুর পরিয়ে দেবে’— এই চমৎকার উচ্চারণটার সামনে চিরকাল আমার মাথা নিচু হয়ে এসেছে। নতুন করে তখন আবার অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে হয়েছে। যেটা সব চেয়ে বড় বিষয়, সেটা আমার ইনকনসিসটেন্সি। আমি সঙ্গীত আর বন্ধুতা ছাড়া সর্ব বিষয়ে ভয়ানক ইনকনসিসটেন্ট। কোথায় একটা যেন বেশিক্ষণ ভাল লাগে না, বেশি দিন ভাল লাগে না। একমাত্র রেওয়াজ ছাড়া কোনও কিছুই ভাল লাগে না। রেওয়াজের সময়ই আমি একমাত্র নিজের জগতে, নিজের মুখোমুখি। কিন্তু নারীসঙ্গের একটা সীমা আছে। আমার ভাল লাগে না, কিন্তু আবার ভাল লাগেও। আমার নতুনত্ব ভাল লাগে। নতুন করে প্রেমে পড়তেও ভাল লাগে। এই পঁয়ষট্টি বছর বয়সে, এই বুড়ো বয়সেও কেউ যদি আমায় আদর করে ডাকে— আমার ভাল লাগে। কেউ যদি এখনও আমার দিকে একটা বিশেষ দৃষ্টিতে তাকান, আমার বুকের মধ্যে সেতারের ঝালা বেজে ওঠে। এটা হয়, এবং এটা হয়ে চলেছে।

এখনও?
এখনও। আমারও তো এখন রুক্ষ সময়। যদি সেই ভাবে দেখো, শারীরিক ভাবে আমার দেহ তো আর শুক্রাণু তৈরি করে না। একটা ইরেকশনের জন্য আমায় সাধ্যসাধনা করতে হয়। তবু ‘মোর কাননে অকালে ফুল উঠুক তবে গুঞ্জরিয়া’— এই যে জায়গাটা, যেটা বাংলা গানে রবীন্দ্রনাথই একমাত্র ধরতে পেরেছিলেন বলে আমার মনে হয়, সেই জায়গাটা আমি নিজের মধ্যে দেখতে পাই।

যদি তুলনা করো, যৌবনের ভালবাসা আর এখনকার এই ‘অকালে’র ভালবাসায়?
এই এখন যে পৃথিবীকে দেখছি, এই পৃথিবীটা যেন আরও সুন্দর, এটা যেন আরও তীব্র। এখন যে প্রেমের অনুভূতি, সেটা আমার যৌবনের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। আমার মনে হয় না আমি আমার যৌবনে এত ভালবাসতে পেরেছি। এখন আমি জীবনকে, পৃথিবীকে, মানুষকে, আমার আমি-টাকে যে ভাবে ভালবাসি, কোনও দিন এমন ভাবে ভালবাসতে পারিনি। সে জন্য হয়তো অনেক গান লিখতে হয়েছে আমাকে। হয়তো সেই অক্ষমতা থেকেই আমার গান এসেছে। হয়তো যাদের জীবন অনেক ব্যালান্সড্, তারা এত গান লেখে না। আমার ধারণা, রবীন্দ্রনাথের জীবনেও ভয়ঙ্কর অভাব ছিল। আমার খুব সন্দেহ আছে, উনি আদৌ কাউকে ভালবাসতেন কিনা। ছুটে ছুটে বেরিয়েছেন এ-ফুল থেকে ও-ফুল যা হয়তো জানতে পারেনি কেউ।

সে তো তুমি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে ভাষণ দিতে গিয়েও বলেছ লুকিয়ে প্রেমের কথা। তফাত করেছ বৌয়ের কাছে মিথ্যে আর রাজনীতির মিথ্যের মধ্যে।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে ভাষণ দিচ্ছি। সাধারণ মানুষেরা বসে আছেন। সামনে ঘোমটা দেওয়া গ্রামের মেয়েরা। লাখখানেক লোক। গাঁকগাঁক করে লাউড স্পিকারে বেরোচ্ছে, আমি বলছি— ‘মাননীয় বন্ধুরা জানেন, আমি না সবিতার সঙ্গে প্রেম করছি, করতে করতে নমিতাকে চুমু খেয়ে ফেলতেই পারি। মেয়েরা ঘোমটা সরিয়ে খিলখিল করে হাসছে। বলছি— ‘আপনাদের মধ্যে পুরুষেরা বুকে হাত দিয়ে বলুন, ইচ্ছে করে না? সব সময় বৌদের ভাল লাগে?’ কী হাসি সকলের। বললাম— ‘দেখুন, এটা যদি না হয়, তা হলে সভ্যতাই হবে না। কীসের রাধা-কৃষ্ণ তা হলে? আমায় আমার স্ত্রী সাবিনা যদি বলেন— তুমি নাকি নমিতার সঙ্গে প্রেম করছিলে? আমি সঙ্গে সঙ্গে বলব ধুর, মোটেই না, আমি তো মদনের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছিলাম— মিথ্যে কথা বলব।’ সবাই হাততালি দিয়ে হাসছে, হেসে লুটিয়ে পড়ছে, ‘এই মিথ্যেটা তো আমি বলবই বলব। যদি না বলি, তা হলে আমি কীসের মানুষ হলাম, কীসের পুরুষ হলাম?

কবীরদা, এক দিকে নারীসঙ্গ তোমাকে নতুন সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করেছে, আবার পাশাপাশি তোমার এই নতুনত্বমুখী প্রেম তো নিশ্চয়ই তোমার সৃষ্টির সময়ও অনেকটা কেড়ে নিচ্ছে। কারণ বারবার তোমার জীবনে নতুন প্রেম এসেছে। সময়ের চাহিদা আছে তার। প্রেম আর সময়ের টানাপোড়েনে পড়ো না?
উফ্, ভীষণ…ভীষণ…সাঙ্ঘাতিক! আরে ঠিক ধরেছ তুমি! আমি প্রেম করতে চাই, কিন্তু সময় নেই। আর আমার মতে কথা কম, কাজ বেশি। মানে, এসো আমরা প্রেম করি। কিন্তু কথা বলব না। কথা বলে আর সময় নষ্ট করে কী হবে, তার থেকে বাড়িতে তুমি-আমি দু’জনেই বই পড়ে নেব। তার মানে কী? শরীর।

বাঃ, শরীরের বাইরে কি প্রেম নেই বলতে চাও?
আছে, আমার একটা হিসেব আছে। আমি যা দেখলাম নিজেকে দিয়ে— যে রমণীর মুখটা আমার মনে পড়ে, তার গলার তলা থেকে কী আছে, সেটা আমি ভাবিই না। তাকে আমি ভালবাসি। আর যে রমণীর মুখটা মনে পড়ে না, শুধু দেহটা মনে পড়ে— তাকেও আমি সম্মান করি। কিন্তু প্রেমে কাবু নই। যাঁর সঙ্গে অসম্ভব শারীরিক সুখ পেয়েছি, এমন রমণীর কথা আমার মনে পড়েনি। তাঁর জন্য মন-কেমন করেনি কখনও। মোদ্দা কথাটা হচ্ছে যে আমি খুব দেহ-সর্বস্ব মানুষ। একটা স্পর্শও যা বলতে পারে, দশ হাজার পৃষ্ঠার বই তা বলতে পারে না। কথা! আরে সুমন, —তোমার আমার মতো লোক তো কথা বেচেই খেয়ে গেলাম গোটা জীবন। কিন্তু ভাবো, একটা স্পর্শ, সে কিন্তু সব বলে দেবে— সব বলে দেবে। আমি স্পর্শের মানুষ। ওই এসো একটু গল্প করি— না, না ভাই, আমার কথা নেই। দেখো, তুমি বা আমি— আমরা যারা প্রচুর কাজ করি, সারাদিন সেই কাজগুলোকে নিয়ে পাঁয়তাড়া কষতে হয়, বই পড়তে হয়— অনেক কিছু করতে হয়। তার মাঝখানে আমার কোনও মেয়েকে এসএমএস করতে ধরো ইচ্ছে করছে না। সে বলছে তা হলে তুমি আমায় ভালবাসো না। আমার উত্তর— না, বাসি না, মুখে এসে পড়ে— ভালবাসি না, মরো! সৃজনশীল মহিলাদেরও এই একই দশা নিশ্চয়ই। এ এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। এটা সত্যিই অনেক সময় নিয়ে নেয়। ঠিকই বলেছ। শাঁখের করাত— যেতে কাটবে, আসতে কাটবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কী করে বলি যে চাই না তোমাকে। কিচ্ছু ভাল্লাগে না— একমাত্র তোমার কাছে থাকতে ইচ্ছে করে— এটাও সত্য, আবার খানিকক্ষণ তোমার কাছে থাকার পর মনে হয়— হে ভগবান, তানপুরাটা যদি এখন একটু চালানো যে—সেটাও সত্য।

কবীরদা, খানিকক্ষণ আগে তুমি বলছিলে, উত্তরোত্তর প্রেমের তীব্রতা, প্রেমের প্লাবনটা কমতে থাকে। যেটা বাড়ে, সেটা হল বোধের জায়গাটা। এই বোধের জায়গাটা কি বয়সজনিত কারণে শরীরিক সক্ষমতার অভাবকে কমপেনসেট করে দেয়?
না-না-না! মানবেন্দ্র যে গান— ‘কেন আরও ভালবেসে যেতে পারে না হৃদয়’— আমি বলব পারে না শরীর। আমার ইচ্ছে করে যত রকম ভাবে পারা যায় আমার প্রেমিকাকে ভোগ করতে এবং তিনিও যেন আমায় ভোগ করতে পারেন। আই ওয়ান্ট টু সার্ভ মাই উওম্যান অ্যাজ আ ম্যান। আমার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে আই ওয়ান্ট টু সার্ভ হার অ্যাজ আ লাভার। সেই ক্ষমতা যখন দেখি চলে যায় সুমন, তখন খারাপ লাগে।

তুমি মুক্তকাম-এ বিশ্বাস করো? তা হলে বারবার বিয়ের মতো প্রতিষ্ঠানকে তোমায় মানতে হয়েছে কেন? একবার নয়, পাঁচ-পাঁচ বার তোমায় বিয়ে করতে হয়েছে কেন?
আমি তোমায় খোলাখুলি বলছি, বিয়ে না করলেও চলত। কিন্তু আমার প্রথম দু’টি বিয়ের পর থেকে যে বিয়েগুলো আমি করেছি, সেগুলো বিশ্বাস করো, কোনও না কোনও বাস্তব কারণে করতে হয়েছে। করতে ইচ্ছে করেছে। একসঙ্গে থাকতেও ইচ্ছে করেছে। কিন্তু ভিসা পাওয়ার মতো বাস্তব কারণ ছিল। একবার যুদ্ধ ঘোষণা হয়ে গেল। ছোট্ট একটা মেয়ে, আমি তাকে ছাড়ছি না। তার মা আমার বান্ধবী, তাঁকে বললাম— তুমি যেতে চাও চলে যাও, আমি কিন্তু মেয়েকে ছাড়ব না। ও মেয়ে কিন্তু আমার ঔরসজাত নয়। সে ‘বাবা’ বলে ডাকেও না। সে ‘সুমন’ বলে ডাকে। ছোট্ট মেয়ে। এই রকম। লর্ড সিনহা রোডে পুলিশের কাছে গিয়েছি তিন জনে। মারিয়া-ভার্জিনিয়ার জর্ডন এয়ারলাইন্সের টিকিট কাটা, সাদ্দাম হুসেন হতচ্ছাড়া যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। বলছে প্যাসেঞ্জার এয়ারলাইন্সের ওপরও গুলি চালাবে। আমি ওঁদের যেতে দিতে পারছি না! কী হয়েছিল পুলিশ অফিসারের সামনে সেদিন জানো?

পুলিশকর্তা: সুমনবাবু, আপনি বিবাহিত?
সুমন চট্টোপাধ্যায়: আমি ডিভোর্সি।

পুলিশকর্তা: ও, আর এই বাচ্চা মেয়েটি?
সুমন চট্টোপাধ্যায়: মেয়েটি ওঁর মেয়ে। সব ছেলেমেয়েই তো আমাদের সক্কলের। আপনারও।

পুলিশকর্তা: হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটি আপনাকে প্রচণ্ড ভালবাসে না?
সুমন চট্টোপাধ্যায়: তা অবশ্যি।

পুলিশকর্তা: আপনিও?
সুমন চট্টোপাধ্যায়: হ্যাঁ, দেখছেন না, এই জন্য আমি মেয়েটাকে ছাড়তে পারছি না। যদি কিছু একটা ঘটে, আমি পারব না মশাই। আত্মহত্যা করব।

পুলিশকর্তা: ম্যাডাম, আপনি বিবাহিত?
মারিয়া: আমি ডিভোর্সি।

পুলিশকর্তা: আপনারা কি পরস্পরকে ভালবাসেন?
সুমন চট্টোপাধ্যায়: হ্যাঁ।

পুলিশকর্তা: কিছু মনে করবেন না, একটা কথা বলি— বিয়ে করতে পারবেন? বাচ্চাটি তো সুমনবাবুর সঙ্গে সুখে আছে— বিয়ে করুন না দু’জনে। যদি বিয়েটা সেরে ফেলতে পারেন— ভিসা ফুরোতে আর চার দিন মাত্র বাকি। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি আপনাদের সব ব্যবস্থা করে দেব। ম্যাডাম এখানে থাকুন। বিবাহিত হওয়ার পনেরো দিনের মাথা থেকে উনি এখানে কাজও করতে পারবেন, যদি চান।
জানো সুমন, আমি কোনও দিন ভাবিনি এটা। মারিয়া বেড়াতে এসেছেন পনেরো দিনের জন্য।
আমি সেই মুহূর্তে ওদের ছাড়তে পারতাম না সুমন— অসম্ভব! আমি মরে যেতাম। মারিয়া একটু সময় চাইলেন। বন্ধ ঘরে বসে ভাবলেন। এক ঘণ্টা পর বেরিয়ে এসে বললেন ‘আমি তৈরি।’ আমরা বিয়ে করলাম। করেই সেই বিয়ের সার্টিফিকেট নিয়ে ফের ছুটলাম লর্ড সিনহা রোডে। সেই পুলিশ অফিসার আমায় জড়িয়ে ধরলেন। এই ভাবে বিয়ে!

কবীরদা, তার আগেও তো এই রকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। শুনেছি তোমার তৃতীয় স্ত্রীকে বাবার নির্দেশে কিছুটা নাগরিকত্বের জন্যই বিয়ে করেছিলে?
উনি আমার থেকে চার-পাঁচ বছরের বড়। বাংলাদেশের নাগরিক। ওঁর আগের বৈবাহিক ঝামেলা এমন রাজনৈতিক রূপ নিয়েছিল যে উনি বাংলাদেশে ঢুকতে পারছিলেন না— ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ওঁর সঙ্গে আমার আমেরিকায় একটা সম্পর্ক হয়েছিল, সে সম্পর্কে ছেদও পড়ে গিয়েছিল। আমি এখানে ফিরে এসেছিলাম বাংলা গান নিয়ে বাঁচব বলে— সেখানে ওঁর কোনও স্থান ছিল না, জীবনেও না। বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু আমি ফ্রি, উনিও ফ্রি। আমার বাবা-মা যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে গিয়েছিলেন, তখন মেয়েটি খুব আদর কাড়াতেন। বাবা-মা’ও খুব স্নেহ করতেন ওঁকে। আমি তখন হ্যাপিলি ডিভোর্সড ফ্রম মাই সেকেন্ড ওয়াইফ অ্যান্ড আই থিঙ্ক শি টু। ইভেন মোর হ্যাপিলি ডিভোর্সড ফ্রম মি। একদিন আমাকে বাবা ডেকে পাঠালেন, এই ঘরে। যেখানে এই মুহূর্তে আমরা বসে। মায়ের সামনে। সিরিয়াস কথা যখন বলতেন, ‘তুমি’ করে বলতেন—
-বসো। এই মেয়েটি তোমার বন্ধু তো?
-হ্যাঁ।

-ভালবাস?
-ভালবাস বলতে কী?

-উফ্, তোমাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক ছিল?
-ছিল।

-মেয়েটি আজ বিপদে পড়েছে। ইংল্যান্ডে বসে আছে। আমায় ফোন করেছিল। আমার ভাল্লাগছে না। তুই পুরুষ হিসেবে একটা স্টেপ নিতে পারবি না?
-কী?
-বিয়ে কর মেয়েটাকে। গিভ হার প্রোটেকশন। ইউ স্লেপ্ট উইথ হার ওয়ান্স। টেল হার ইফ শি উড ম্যারি ইউ। আই ওয়ান্ট ইউ টু বি আ ম্যান। বি আ রিয়েল ম্যান। প্রোটেক্ট হার। শি ইজ অ্যালোন। সুমন, দিজ ইজ হাউ…দিজ ইজ হাউ। দিজ ওয়াজ মাই থার্ড ম্যারেজ। চতুর্থ বিয়ের কথা তো আগেই বলেছি। আর পঞ্চম…

সাবিনা, সাবিনা ইয়াসমিন?
তখন এমন ভালবাসছি যে একদিন অন্তর ভিসার জন্য আবেদন করতে হচ্ছে। আমার মনে হয় না সাবিনা বিয়েতে আদৌ বিশ্বাস করে। উনি মুক্তমনা একজন মানুষ। চমৎকার মানুষ। আমি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হতাম অথবা উনি ভারতের, তা হলে কোনও দিন আমরা বিয়ে করতাম না। আমরা কিছু দিন হলেও একসঙ্গে থাকতাম। আমি ‘বিয়ে’ প্রতিষ্ঠানটিকে একটুও ছোট না করেই বলছি, ইট ইজ আ বিউটিফুল ইনস্টিটিউশন। ইট ক্যান বি আ গ্রেট ইনস্টিটিউশন। ওনলি থিং ইজ দ্যাট দু’টি মানুষকেই তার যোগ্য হতে হবে। আমি তার যোগ্য নই।
কিন্তু বিয়েটা আমাকে প্রোটেকশন দিচ্ছে। আমার স্ত্রী ছ’মাসের ভিসা পাচ্ছেন। আমি কিন্তু আমার আর সাবিনার ইনটেনশনটাকে ছোট করছি না। আমরা ভীষণ আনন্দে আছি, গান-গান-গান, জীবনে প্রথমবার সব কিছু শেয়ার করতে পারছি, দু’জনে দু’জনকে ভীষণ ভালবাসছি। কিন্তু ওই কিছু দিনের জন্য। এখানেও আমার সেই ইনকনসিসটেন্সি। আই ফল ইন লাভ। হয়তো উনিও। বুদ্ধিমান লোকেরা এটা বলেন না। আমি নির্বোধ, আমি বলি। আর যদি কাউকে দোষ দিতেই হয়, তো আমায় দাও। তাতে ঝামেলাটা কাটে।

তুমি যাঁদের বিয়ে করেছ, তাঁদের তোমার ইনকনসিসটেন্সির বিষয়ে সতর্ক করে দাওনি?
শোনো, আমার তৃতীয় স্ত্রী থেকেই কিন্তু প্রত্যেককে হাত জোড় করে বলেছি— ‘প্লিজ মনে রেখো, আমাদের মধ্যে কিন্তু অন্য মহিলা বা অন্য পুরুষ আসতেই পারেন। এটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই হবে বোধহয়, কারণ আমরা খুব এক্সপোজড্। তখন আমরা যেন সভ্য ভাবে, শিষ্টতা বজায় রেখে জিনিসটার ফয়সালা করতে পারি। অথবা সরে যেতে পারি।’ প্রত্যেককে বলেছি। কিন্তু আমি দেখেছি, কেউ এটা মানে না।

তার মানে এই নিয়ে অশান্তি অবধারিত?
অবধারিত। আমাদের মতো লোকের ক্ষেত্রে একেবারে অবধারিত। আমি বলব, তাঁদের ক্ষেত্রেও অবধারিত হওয়ার কথা, কারণ তাঁরা অন্য পুরুষের সঙ্গে ইনভলভড্ হয়েছেন। শুধু তাঁরা বলছেন না— আমিও জিজ্ঞেস করি না। কিন্তু আমায় যখন আমার কোনও স্ত্রী জিজ্ঞেস করেছেন, এবং তখন যদি আমার কোনও সম্পর্ক হয়ে থাকে, আমি সত্যভাষণ করেছি।

আর তাতেই সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছে?
যেমন আমার তৃতীয় স্ত্রী, বাংলাদেশের সেই নাগরিক, দেড় বছর একসঙ্গে থাকার পর বাংলাদেশে তাঁর আগের বৈবাহিক ঝামেলাটি মিটে গেল। কারণ ভদ্রলোক হার্ট-অ্যাটাকে মারা গেলেন। তিনি বাংলাদেশে বেড়াতে গেলেন, বেরিয়ে ফিরে এলেন জার্মানিতে। আমাদের অনেক দিন পর দেখা হল। খুব আদর করলাম আমরা দু’জনকে। দু’জনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বসে কফি খাচ্ছি মহানন্দে। অল্প বয়স দু’জনের। হঠাৎ তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘তুমি আর কারও প্রেমে পড়তে পারবে?’ আমি বললাম— ‘কাম অন। দেখো আমাদের যথেষ্ট বয়স হয়ে গিয়েছে। এই প্রসঙ্গ আনার কোনও মানে হয় না। তোমার এটা তৃতীয় বিবাহ। আমারও তাই।’ উনি বললেন— ‘না, আমি এক্ষুনি এটা শুনতে চাই।’ আমি বললাম— ‘তুমি সত্যি শুনতে চাও, ফিলোজফিক্যাল ট্রুথ, না মিথ্যে?’ বললাম— ‘আমি অবশ্য প্রেমে পড়তে পারি। পসিবিলিটি ইজ দেয়ার। প্রোবাবিলিটি ইজ লেস।’ অ্যাট ওয়ান্স শি সেড— ‘বাই, আই কান্ট লিভ উইথ ইউ।’

বলো কী!
আমি সত্যি বলছি। আই ট্রায়েড টু কনভিন্স হার। কারণ আমার বাবা-মা জড়িত, সকলে জড়িত।
কিন্তু না, ইট এন্ডেড দেয়ার! আমি একদম তোমায় জীবনের কথা বলছি সুমন। লুকোনোর কিছু নেই তো আর।

বলো কী! তোমার জীবন নিয়ে তো একাধিক ফিল্ম করা যায়। এক-একটা ফেজ নিয়েই তো তিন ঘণ্টার ছবি।
বানাও না আমার জীবন নিয়ে একটা বায়োস্কোপ। কিন্তু তোমায় আবার বলছি সুমন, ছ’মাস-আট মাস-এক বছর। তার পর একই মহিলার সঙ্গে সমানে শয়ন করা— নিয়মিত, করতেই পারি, করতে হয়ও, করিও…কিন্তু ইচ্ছে করে না…(প্রবল হাসি, দুষ্টুমির হাসি)…ইচ্ছে করে না একটুও…

কিন্তু এই হাসিটা যে দুষ্টু সুমনের— তার তো বয়স বাড়ে না…
বাড়ে না, আবার বাড়েও। প্রথম যৌবনে যে দেবাশিস বলে ছেলেটির প্রেমে পড়েছিলাম, উফ্, সে যে কী তীব্র! ওই তীব্রতাটা কিন্তু উত্তরোত্তর কমতে থাকে।

পরেও কমেছে? আরও?
যাঁর প্রেমে পাগল হয়ে আমি বাংলা টাইপরাইটারে ‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই’ লিখেছিলাম ঝড়ের বেগে, সেই সাঁইত্রিশ বছরের ‘আমি’-টা যে প্রেম অনুভব করেছিল, প্রেমের যে প্লাবন— তা কিন্তু দ্রুত কমে। বাড়ে কোথায়? বোধের জায়গাটা।

সূত্র: সুমনে সুমনে অন্তরঙ্গ কথোপকথন, সপ্তর্ষি প্রকাশন/ আনন্দবাজার পত্রিকা

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress