এখনও যাঁরা আমায় ও আমার সৃষ্টিগুলিকে সম্মান করেন, ভালবাসেন, তাঁদের জন্যে লেখা…

এখনও যাঁরা আমায় ও আমার সৃষ্টিগুলিকে সম্মান করেন, ভালবাসেন, তাঁদের জন্যে লেখা। কিছু ‘জাস্টিফাই’ করার জন্যেও না, অন্য কারুর জন্যেও না। কারুর কাছে কিছু ব্যাখ্যা করার নেই। আমি সুমন, কবীর সুমন। আমার সৃষ্টি যে-কোনও জাতির গর্ব হওয়ার কথা। বাঙালির ক্ষেত্রে তা হয়নি। তাতে আমার অন্তত কিছু যায় আসে না। যা জানার আমি জানি। দূর থেকে চেঁচানো বা গায়ে এসে পড়া মিডিয়ার জন্য আমার লেখা নয়। আমার বন্ধুদের জন্য। –
জীবনে কখনও এতো ভাল থাকিনি। ২০১১ সালে এমন ভয়ানক নিউমোনিয়া হয়েছিল যে সেই থেকে শরীরটা ভেতরে বাইরে গেছে। যাক্ গে। বয়স যা হলো, জীবন যেভাবে কাটল এতোদিন, আর বেশী ভাল থাকার দরকার কী? শরীর যেমনই থাক মনের দিক দিয়ে ভাল আছি। কোনওদিন এতো ভাল থাকিনি।

আমার কাজগুলোকে আর আমায় যাঁরা ভালবাসেন এবং সম্মান করেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই বা কেউ কেউ হয়তো চিন্তা করেন – এই যে লোকটাকে এতো রকমভাবে আক্রমণ করা হয়, অপমান করা হয়, হয়ে থাকে – এতে লোকটা নিশ্চই ভেঙে পড়ে, ভেতরে ভেতরে ছটফট করে, কষ্ট পায়, ফলে শরীরের ওপর চাপ পড়ে, কাজে ব্যাঘাত ঘটে, মনের শান্তি নষ্ট হয়, সঙ্গীতে মন দিতে পারে না…
না। এসবের কিছুই হয় না।

বাইরের অনেককিছু থেকে সরে এসে আমি আমার মায়ের ঘরে ঢুকে পড়েছি। এই ঘরেই আমি রেওয়াজ করি, দিনে অন্তত ৬/৭ ঘন্টা বা তারও বেশি। গানের ক্লাস নিই এই ঘরেই। মা চলে গেছেন কবে। কিন্তু আমার ছোট্ট পরিবার (যে পরিবার “রক্তের সম্পর্কের” ভিত্তিতে নয়, “সামাজিক-সম্মতির” ভিত্তিতে নয়, মুক্ত ভালবাসা ও সম্মানের ভিত্তিতে) ও আমি এই ঘরটাকে মায়ের ঘরই বলি।

আগে, কতো ব্যাপারেই না জড়িত ছিলাম, জড়িয়ে পড়তাম। শ্রমিক আন্দোলন, ছাত্র-আন্দোলন, বিক্ষোভ, পরিবেশ-আন্দোলন…তার আর শেষ ছিল না। থেকেথেকেই বাইরের লোক আসত বাড়িতে। কথার পর কথা। সময় নষ্ট হতো। সে এক পর্ব গিয়েছে জীবনের। জীবন বিচিত্র। নানান পথ ধরে চলতে পারে। নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। আজ আর সেই আগের জীবন নেই। রাজনীতির সঙ্গে আর যোগ নেই। সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে আজও আছি ও থাকব মনে মনে। তেমন দরকার হলে নিশ্চই তাঁদের সভায় যাবো। এ ছাড়া আর কিছুতে নেই। কারণ, অনেক তো করলাম। কতো আন্দোলন, কতো কী। একটা পর্ব জীবনের। এবারে আমার ছেলেবেলা থেকে শেখা, রপ্ত করা ‘ডিসিপ্লিন’-এ বাকি জীবন থাকা। হিন্দুস্তানি রাগসঙ্গীত। রিয়াজ। খেয়াল আঙ্গিকটা। যা দেখলাম – বাঙ্গালি মধ্যবিত্তর সঙ্গে খেয়ালের আর কোনও সম্পর্ক নেই। না থাক। আমি আছি এতে। থাকব। এ আমার একার সফর, যাত্রা। আমার জীবনের শেষ পর্ব।

বাইরের কোনও ভাবনা আমার মাথায় বিশেষ স্থান পায় না। সুর। তাল। ছন্দ। সুরে থাকা। না – “গান” নয়। গান আমায় আর বিশেষ কিছু বলে না। “গান”-এ কোনও পরিক্রমা নেই। সফর নেই। সন্ধান নেই। খুঁজে বেড়ানো নেই। গান বড্ডো বেশি predictable, fixed, made to order. “কথা” ধ্বংস করে সুরের, সুরের পথে সুরকে, নিজেকে খুঁজে বেড়ানোর essay-টাকে, মেজাজটাকে।

তাহলে এতো কথা লিখছি কেন? – আজও আমায় যাঁরা ভালবাসেন, আমায় কেউ অপমান করলে যাঁরা কষ্ট পান তাঁদের জন্য। নীল ডায়মণ্ডের একটা গানে (আমার প্রয়াত বড় ভাই অনেক কালে আগে আমায় শুনিয়েছিলেন) ছিল – ‘তোমার আর আমার মধ্যে যে ফাঁক, সেটা ভরিয়ে দিচ্ছে গান’ বা এইরকম কিছু। আমার এই কথাগুলো সেইরকম। এগুলোকেও গান বলা যেতে পারে, কিন্তু সঙ্গীত নয়। গান সঙ্গীত নয়। “Words disrupt. Music unites.”

আমি বিশুদ্ধ সঙ্গীত নিয়ে আছি ও থাকব। আমার ভাল থাকাকে ধাক্কা দেওয়া, নষ্ট করার ক্ষমতা ঐ হুক্কা-হুয়া করতে থাকা ফেসবুক-বাহাদুর ও মিডিয়ার নেই। আমার মেধা যেখানে কাজ করে, ওরা তার ধারেকাছেও থাকতে পারে না।

এক সময়ে বাংলা আধুনিক গান তৈরি করার কথা ভেবে ভেবে পাশ্চাত্যের আরামদায়ক জীবন ছেড়ে এখানে চলে এসে ৪০ বছর বয়সে শূণ্য থেকে শুরু করেছিলাম। সংগীতের কাজের জন্য এখানে ওখানে ঘুরেছিলাম। তরুণ মজুমদারের দরজায় কড়া নেড়েছিলাম। তাঁর একটি ছবিতে একটি গানের কাজ আদায় করেছিলাম। ছবিটি বেরোয়নি। আসলে আমিই অপয়া। উনিও আমায় তার পর আর ডাকেননি কোনও কাজে। কিন্তু একটি কাজ তাঁর সঙ্গে করার সুযোগ পাওয়ার পথেই বুঝেছিলাম কী নিপাট ভদ্র মানুষ তিনি। কী সুন্দর তাঁর আচরণ।

রবি ঘোষ আমায় একটি চিঠি দিয়ে তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন। রবি ঘোষ। অমন মানুষ জীবনে খুব কম দেখেছি। বাংলা গান বেঁধে গেয়ে বাজিয়ে বাঁচব – এই সঙ্কল্প নিয়ে এখানে ফিরে আসার পর বন্ধু জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে ডাক্তার বারিন রায়ের সঙ্গে আলাপ হয়। কী-উৎসাহই না দিয়েছিলেন তিনি আমায়। তাঁর মাধ্যমে আলাপ হয়েছিল রবি ঘোষের সঙ্গে। কী মানুষ! কী স্নেহই না করতেন আমায় তিনি। তেমনি – কী-সম্মানই না দিতেন। রবিদার জন্য এখনও মন কাঁদে। অকালে চলে গেলেন। আমার এক অভিভাবক। আমার আজ আর কেউ নেই যাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করে দু’দণ্ড বসতে পারি, নির্ভেজাল আনন্দ করতে পারি। শিখতে পারি।
একদিন তাঁকে বললাম, রবিদা, ছবিতে সঙ্গীত করার সুযোগ কে দেবে? কার কাছে গেলে আমায় তিনি দূরদূর করে তাড়িয়ে দেবেন না? – রবিদা আমায় বলেছিলেন “তনুবাবুর” কথা। তরুণ মজুমদার। একটা চিঠি লিখে দিলেন তাঁকে। আমায় বললেন, যাও, এটা নিয়ে ওনার সঙ্গে দখা করো; একমাত্র ওনার কথাই মনে হচ্ছে আমার।

সেই চিঠি নিয়ে নিউ থিয়েটার্সে তরুণবাবুর আপিসে গিয়েছিলাম। কথা বলেছিলাম। একটা কাজ দিয়েছিলেন তিনি আমায়।
কিভাবে যে জীবন কাটিয়েছিলাম। কতো লোকের অপমান, ঔদ্ধত্য (বিশেষ করে মিডিয়া ও সি পি আই এম) যে সহ্য করেছিলাম, কখনও বা মারের জবাবে মার দিয়েছিলাম – হা হা, কোথায় মিলিয়ে গিয়েছে সব। সেদিনগুলোয় যারা আমার বিরুদ্ধে লিখত বলত, আজ তারা কোথায়? ইতিহাসে একটি আঁচড়ও কি কাটতে পেরেছে তারা? সেই আজকাল – আহা, “শহীদ হয়েছে কোনকালে”। সেই আনন্দবাজার – ওঃহো, আমার সুমনামিও ছাপে, অসংখ্য লোক যা পড়ে, আবার আমার পেছনের খারাপ কথায় কাঠিও করে। আর করে যায় মুসলিমবিরোধিতা – সুযোগ পেলেই। কী আকাট দেখুন। কোথায় “দিলাম ঠুইক্যা এক দলা চ্যবনপ্রাশ” বলে একখানা “আনন্দ পুরস্কার” দিয়ে (শুনেছি ৫ লাখ দেয় নাকি) আমায় “ধন্য” করবে, যুগন্ধর কবিদের যেমন করেছে, তা না সেই আমার পেছনের খারাপ কথার দিকে নজর। এরা আর বড় হলো না। ফ্রয়েডিয় “anal phase”-এই থেকে গেল। আহা।

কিন্তু কোথায় গেল সব – সেদিনের কলমচিরা? সেদিনের রাজনৈতিক প্রভুরা। বনগাঁর পর তো সি পি আই এমের “হরি দিন তো গেল” গানটি ভুল সুরে বা বেসুরে গাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই। এককালে কতো কুকথাই না বলেছে। অনুন্নত স্নায়ুতন্ত্র। কারা যে পেছন থেকে সামনে থেকে কামড়ে কামড়ে গোটা শরীরটাই খেয়ে ফেলল, বেচারিরা টেরও পায়নি। Evolution-ই হয়নি। আহা।
তা বলি, সেদিনের সুমনবিরোধীরা আজ কোথায়? সুমন তো সেই শালা থেকেই যাচ্ছে। গানগুলোকে মানুষের মন থেকে মুছে দিবি কী করে? – ওরে পাগল, সুমন কি তোদের একার?
সেদিনের বিরোধীরা হাওয়া। কেউ কেউ ভাবছে তারা এখনও আছে। আহা রে। নেই। কেউ থাকবে না। কিন্তু বাঙলা ভাষা যতদিন থাকবে আমার দু’একটা গানের রেশ থেকে যাবেই।

বোকা শক্তিশালী বাজার পত্রিকার রাগের একটা প্রধান কারণ – আমার ক্ষেত্রে ওরা দাবি করতে পারেনি, পারে না – সুমনকে তো আমরাই বানালাম। আমরাই তুললাম। আমরাই খাওয়ালাম, পরালাম, আনন্দ পুরস্কার দিলাম, আস্কারা দিলাম, জায়গা দিলাম। – পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির বাবা কে? – আনন্দবাজার আবার কে? – ইশ্। আমার বেলা হয়নি।

সি পি আই এমেরও একই দশা। কিছুতেই বলতে পারল না – সুমনকে আমরা বানিয়েছি। আমরাই জন্ম দিয়েছি। ৩৬৫ দিনে ৩৬৭টা অনুষ্ঠান পাইয়ে দিয়ে খেতে পরতে দিয়েছি (অন্য অনেক শিল্পী সম্পর্কে ওঁরা যা সঙ্গত কারণেই বলতে পারেন)।
সি পি আই এম করা এক শিক্ষিত লোক, অনেক দিন আগে আমাদের মৃন্ময়ীকে (মৃন্ তখন সবে কলকাতায় পড়তে এসেছে, কতো ছোট) বলেছিলেন কানেকানে – ‘সুমনের গানগুলো ওর বাবার লেখা’।

তবু ভালো, তাঁর নিজের বাবার নাম করেননি বা পিসেমশাই। – তা সেই কাইয়ুম সাহেব ও তাঁর পার্টিই বা আজ কোথায়, আমার বেচারি বাবা-ই বা আজ কোথায়, সেদিনের, সে-যুগের পঃ বঃ মিডিয়াই বা আজ কোথায়, সেদিনের সেই আমিটাই বা আজ কোথায়?
দুনিয়া পরিবর্তনশীল। সব পাল্টে যায়। কিছু জিনিস থেকে যায়। আরও কারুর কারুর সৃষ্টির মতো আমার কিছু সৃষ্টিও থেকে গেছে, থেকে যাবে। কেউ ঠেকাতে পারবে না। সুরকে আটকানো যায় না। সুরের মৃত্যু নেই।

আমার বড় ভাই তাঁর জীবনের শেষদিকে বলতেন, “They have finished you off.” – না। ওরা আমার “বাজার” ধ্বংস করতে পেরেছে। আমার পেশাজীবন ধ্বংস করেছে। আমায় শেষ করতে পারেনি। এই যে হুক্কা-হুয়া-সুমনবিদ্বেষী-মুসলিম-বিদ্বেষী নপুংসকরা এমনকি মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে লেগে পড়েছে (আর-এক নপুংসক) এতে আমার মনের, দেহের, ‘ডিসিপ্লিনের’, সৃষ্টির, কাজের, আমার ছোট্ট পরিবারের কোনও ক্ষতিই হয়নি। হবেও না। ঐ ফেসবুককৃমি বা পত্রিকাকৃমিরা মলমূত্র ছাড়া আর বাচ্চাকাচ্চা ছাড়া আর কিছুই তৈরি করতে পারে না।

ক্ষতি হতে পারত যদি আমার মনে কোনও উচ্চাশা থাকত। আমার না আছে আশা, না আছে হতাশা। ভেতরের শান্তি ছাড়া আমি আর কিছু চাই না। এবং ভেতরের শান্তির নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে, অন্য কারুর হাতে নেই।

বাইরে আর বেরোইই না বিশেষ। ইচ্ছেও করে না। আমার ছোট্ট পরিবারের সঙ্গে হয়তো কোথাও যাই। এক শিল্পীদম্পতি আমায় নিয়ে যান মাঝেমাঝে কোনও প্রদর্শনীতে। আমাদের কাছে আসেন তাঁরা। তাঁদের কাজ দেখান। আমি দেখি, শিখি, নতুন ভাবনার স্পর্শ পাই। শিখি। তাঁরা আমায় ছবি আঁকতে বলেন। ভাবছি আঁকব। এমন কাউকে আমি আমার চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকতে দিই না যার কাছ থেকে আমি শেখার মতো কিছু পাবো না। ভোম্বলের মতো ভ্যাজ-ভ্যাজ শুনে যাওয়া বা কথা বলা – সে-যুগ শেষ করে দিয়েছি।

কাজেই, খুব ভাল আছি। আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই, রেওয়াজ করা, শুধু রেওয়াজ করে যাওয়া আর কিছু পড়াশুনো করা ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই।

একবার তারা চ্যানেলের লাইভ দশটায় অবিস্মরণীয় মনোহর আইচের সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। সেই চিরযুবক নব্বোই-পেরনো মানুষটি আমায় বলেছিলেন, “ডন দিতে দিতে শ্মশানে যাব”।
আমার এক শিক্ষক তিনি।

আমিও রেয়াজ (রিয়াজ) করতে করতে, সুর লাগাতে লাগাতে কবরে যাব। ইন্শাল্লাহ্!
এরই মধ্যে সেদিন আনন্দবাজার পত্রিকার এক মহিলা (নাম ভুলে গেছি) আমায় এস এম এস করে জানান আমার সঙ্গে কথা বলতে চান তিনি। আমি তাঁকে কল করেছিলাম। তিনবার কথা হলো তাঁর সঙ্গে।

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress