ইসরাইলী গণহত্যা

ফিলিস্তিনে ইসরাইলী গণহত্যা এবং মানবিক বিপর্যয়

stop

রেডিও তেহরান : আচ্ছা জনাব সুমন , ফিলিস্তিনে ২ সপ্তারও বেশি সময় ধরে ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই ইসরাইলকে এই গণহত্যার ব্যাপারে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ বা পশ্চিমা দেশগুলো আসলে ইসরাইলকে থামানোর জন্য কার্যকর কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না । তো এই বাস্তবতাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

কবীর সুমন : দেখুন, ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে কতগুলো বিষয় কিন্তু খুব পরিষ্কার । একজন সেক্যুলার মানুষ হিসেবে আমি কোন ধর্মের উপর কটাক্ষ করতে চাই না বা কোন মানব গোষ্ঠী সম্পর্কে আমার কিচ্ছু বলার নেই । তবে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমি প্রথমেই বলবো, ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের সময় কতগুলো গোলমেলে বিষয় ঘটে গিয়েছিল। ফিলিস্তিনের যারা আদত বাসিন্দা অর্থাৎ আজ যেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে সেখানকার বাসিন্দাদের প্রতি কোন বিশেষ দৃষ্টিপাত না করে বিদেশ বা অন্যান্য দেশ থেকে ইহুদীরা এসে সেখানে বসতি গাড়েন । ফলে সেখানকার আদিবাসীরা তাদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে । আর এ বিষয়টি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এবং তা আমাদের বুঝতে হবে। আমি কিন্তু ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছি না । তবে ইসরাইল নামক রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার প্রথম থেকে এই দেশটি প্রতিবেশীদের প্রতি বা আরবদের প্রতি যে আচরণ ছিল তা ছিল প্রচন্ডরকম বৈরী । তবে এ প্রসঙ্গে বলে রাখছি সেখানে কেবল মুসলমান বা ইহুদীরা বাস করে না সেখানে খৃষ্টানরাও বাস করে । তো ইসরাইলের প্রতিবেশী দেশ গুলোর উপর যে বৈরী মনোভব ছিল তার পেছনে মার্কিন সরকারের যথেষ্ট সমর্থন ছিল । এখানে আমি একটা ঐতিহাসিক সমস্যার কথা তুলে ধরবো । নাৎসী জার্মানী ইহুদীদের উপর অবিচার করার ফলে এবং ব্যাপক ইহুদী নিধন হওয়ার ফলে তাদের সম্পর্কে কিছু কথা বলতে গেলেই মানুষ কয়েকবার ভাবত যে তারা এন্টি সেমাইট কিছু করে ফেলছে কি না । আর আমার কেন যানি মনে হয় ইসরাইল রাষ্ট্রের যারা কর্ণধার ছিলেন তারা কেউ কেউ এই সুযোগটি গ্রহণ করেছেন । তাছাড়া মার্কিনীদের এবং একাধিক পশ্চিমা দেশের অকুন্ঠ সমর্থনের কারণে ইসরাইল প্রতিবেশীদের প্রতি তাদের বৈরী আচরণ আপন মনে চালিয়ে যেতে পেরেছেন । তখন মানুষ এক ধরনের বিবেক দংশনে ভুগছিলেন । কেননা সবাই তখন মনে মনে ভাবত নাৎসী জার্মানী কয়েক লক্ষ ইহুদী নিধন করেছে । তবে তখন নাৎসী জার্মানী শুধু মাত্র ইহুদীদের বধ করেনি তখন বহু জিপসীদেরকেও সমুলে নিধন করেছিল । কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন – সেই জিপসীদের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা কিন্তু একবারও কেউ বলে না; তারা কেবল ইহুদীদের কথা বলে ফলাও করে । আর নীরব থাকে জিপসী নিধন সম্পর্কে । আসলে কথাটা এরকম যে , পশ্চিমা দেশগুলো ইহুদীদের বিষয়ে কেবল সরব একই প্রসঙ্গে অন্যদের ব্যাপারে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই । যাইহোক, এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সমর্থনে ইহুদী রাষ্ট্র গঠিত হলো । এবং তখন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ডায়ানের প্রকাশ্য আরব বিদ্বেষী মনোভাব প্রত্যক্ষ করেছে সকলে । ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয় এটি কোন গালগল্প নয় ।

এবার একটা মুশকিল হলো কি জানেন – ১৯৪৮ সালের মে মাসের যে দিনটিতে তাদের ম্যান্ডেটের মেয়াদ শেষ হলো সে দিনটিতে হঠাৎ মিশর আক্রমণ করে বসলো । আর এটি কিন্তু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । এবং মিশর সেখানে তার সামরিক উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘকাল অবস্থান করেছে । কিন্তু কেন জানি এই জায়গাটা অনুল্লেখিত থাকে । ঠিক বিষয়টা আমার কাছে স্পষ্ট নয় । আর সে সময় মিশর কোন মানুষকে তার দেশের নাগরিকত্ব দেয়নি বা অবরুদ্ধ এলাকার কোন মানুষকে অন্য কোন আরব দেশে পর্যন্ত যেতে দেয়নি । অর্থাৎ পররবর্তীতে ইসরাইল যে অন্যায় করেছে মিশরও কিন্তু সেই একই অন্যায় করেছে ।

তবে ইতিহাসের আলোকে আমি যে বিষয়টি বলছি – আমাকে মার্জনা করবেন এই জন্যে যে আমি এসব কথা কিন্তু কোন সাম্প্রদায়িক জায়গা থেকে বলছি না । তবে যদি সাম্প্রদায়িক শোনায় তাতে আমার কিছু বলার নেই । দেখুন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ প্রচার মাধ্যমের মালিক হলেন ইহুদীরা । ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদীদের যে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আছে সেটির তারা পূর্ণ সদ্বব্যবহার করে থাকেন । আর বর্তমানে যে ঘটনা ঘটছে এটি তো নতুন কিছু নয় । এটি বারে বারে ইতিহাসে ঘটেছে। গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনীরা যেন বানের জলে ভেসে আসা কিছু গবাদি পশুর মতো । আসলে গবাদি পশুর মতো বলছি কেন বর্তমানে গাজা উপত্যকার মানুষের সকরুণ অবস্থা গবাদি পশুর চেয়েও খারাপ । আর এ মর্মান্তিক বিষয় নিয়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পলিটিক্স করে তখন তাদের সম্পর্কে আর কি বলবো ! আজকের এই নৃশংস ও অমানবিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমি বা আমরা শুধু কামনা করতে পারি তাদের যেন শুভ বুদ্ধির উদয় হয় । আজ এত বছর ধরে প্রতিদিন প্রতিমুহুর্তে সেখানে নারকীয় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে সচেতন ও শুভ বুদ্ধির মানুষদের কিছু করতে গেলেই তাদেরকে এন্টিসেমাইট এন্টিসেমাইট- এ কথাটা শুনতে হবে; পাশাপাশি এও শুনতে হবে এরা টেরোরিস্ট । যদি এরা এন্টিসেমাইট ও টেরোরিস্ট হয়ে থাকে তাহলে ইসরাইল কি ? ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রতো বড় সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র । তারা যাকে ইচ্ছে যখন খুশি বিমান পাঠিয়ে খুন করছে, বোমা হামলা চালাচ্ছে, পটকা ফোটাচ্ছে ,সৈন্য পাঠাচ্ছে, দাদাগিরি করছে ; এটা করছে সেটা করছে । আর সেই দৃষ্টিতে তারা কত বড় ধরনের সন্ত্রাসবাদী কিন্তু এই কথাটি তারা মানতে চান না । আরো একটি মজার ব্যাপার হলো কি জানেন – আজকের পৃথিবীতে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকী পৃথিবীর দেশগুলো কিন্তু ফিলিস্তিনের বিষয়ে বা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অমানবিক কর্মকান্ডের ব্যাপারে নিরব । কারণ তারা আমেরিকার পুঁজির কাছে মাথা বিক্রি করে বসে আছেন ।

রেডিও তেহরান : পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকারের কথা বলে , অথচ গত দুই সপ্তার ইসরাইলী আগ্রাসনে প্রায় ৯০০ নিরিহ মানুষ নিহত হলো, নিহতদের মধ্যে প্রায় ৩০০ শিশু রয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে আমরা, এই বর্বরতা ও নৃশংসতার দৃশ্য প্রতিদিনই দেখছি । এরপরও কি বলা যাবে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের মনে মানবাধিকার বা মানুষের জীবনের প্রতি নুন্যতম শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে?

কবীর সুমন : দেখনু, মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার অধিকার তাদের নেই । অন্তত আর কারও থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তো মানবাধিকার প্রসঙ্গে কোন কথা বলারই অধিকার নেই । একটা বিষয় দেখুন, ইরানকে মারার জন্যে সাদ্দামকে তৈরী করা হলো । আমি একথা বলার সাথে সাথে কিছু লোক মাত মাত করে বলবে সুমন কি ইরানের টাকা খেয়েছে ? কিন্তু তাতো না । এটা ইতিহাস । আমি সে সময় পাশ্চাত্যে ডয়েচেভেলেতে সাংবাদিকতা করতাম । এবং আমাদের নাকের ডগা দিয়ে ইরাককে তৈরী করা হলো । কারণ হচ্ছে ইরানে যে শাহতন্ত্র ছিল তারা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পা চাটা এজেন্ট । এবারে ইরানের সাধারণ নির্যাতিত মানুষ ঘৃন্য গোয়েন্দা বাহিনী সাভাকের বিরুদ্ধে যখন রুখে দাঁড়ালেন তখনই মার্কিনীরাসহ পশ্চিমারা বলতে শুরু করলেন ইসলামী মৌলবাদ । তা হলে প্রশ্ন হলো, এতদিন কোন মৌলবাদ ছিল ? ইরানের সাধারণ মানুষের যে গণজাগরণ তাকে সহ্য করতে পারলো না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । আর তখনই ইরানকে শাসন করার অভিসন্ধি করলো । আর সেই অভিসন্ধি বা ষড়যন্ত্র পূরণ করতে হলে কাকে দিয়ে করা যায় ! একথা ভেবেই আত্মীয় নিধনের মধ্যে দিয়ে যে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় এসেছেন তাকে ঠিক করলেন ইরানকে মারার জন্যে। যে সাদ্দাম হোসেন অগণতান্ত্রিকভাবে অসংখ্য নিকটাত্মীয় খুন করে ক্ষমতায় এসেছেন; সেই সাদ্দামকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুহাত ভরে অস্ত্র ও টাকা দিলেন । তাদের শর্ত হচ্ছে ইরানের উপর আগ্রাসন চালাতে হবে । আর সে সময় বিশ্ববাসীর নাকের ডগা দিয়ে ইরাক ইরানে হামলা চালালো যুদ্ধ করলো এবং সেই যুদ্ধে গো হারা হেরে গেল তাতেও ইরাকের বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লজ্জা নেই । আর তখন মানবাধিকার কোথায় ছিল । শাহের আমলে ইরানের সাধারণ মানুষের উপর যে নির্বিাচার অত্যাচার হয়েছিল তখন মানবাধিকার কোথায় ছিল ? ইরানের গণ জাগরণের সময় তখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ইরান সম্পর্কে নানা উল্টো পাল্টা বা আজে বাজে কথা বলেছে আসল বিষয়টিকে লুকিয়ে । সেখানে চূড়ান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছিল । তখন তাদের মুখে মানবাধিকারের কথা শোনা যায়নি , উল্টো শোনা গেছে নির্যাতিতরা মৌলবাদী , তারা সন্ত্রাসী। আসলে হয়েছে কি জানেন – আমাদের কোন ফোরাম নেই । আমি ইতিহাসের একজন পাঠক ও সাংবাদিক হিসেবে এ কথা বলছি । তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো আগা গোড়াই মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে । কিউবাতে যা করেছে, বাংলাদেশে যা করছে, ভারতে যা করছে, আফগানিস্তানে যা করছে তার সবই মানবাধিকারের লঙ্ঘন । কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ মানবাধিকারের কথা বলছে এটি হাস্যকর। দেখুন , গাজা স্ট্রিপে চিরকাল শিশু ও নারী নিধন হয়েছে । সাবরা শাতিলার ত্রাণ শিবিরে ইসারইলীদের বর্বরোচিত হামলায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনী নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল। সেই ত্রাণ শিবিরে কারা ছিলেন ।নারী শিশু ও বৃদ্ধারা ছিলেন । তাদের উপর কি চমৎকার পরিকল্পনা মাফিক হামলা চালানো হলো । আমি সে সময় মার্কিন সরকারের চাকুরে ছিলাম । আমি তখন ভয়েস অব আমেরিকার বেতন ভোগী সাংবাদিক ছিলাম । তখন তাদের পক্ষে কথা বলেছি। তবে আজ আমি আমার বিবেকের জায়গা থেকে এ কথাগুলো বলছি । তখন সাবরা শাতিলা সম্পর্কে যেসব তরজমা করেছি তা যে কি চূড়ান্ত মিথ্যা ছিল তা আমি খুব স্পষ্ট করে বলতে পারি । সুদানের একটি ফ্যাক্টরিতে ওষুধ তৈরী হয় সেখানে বোমা ফেলা হলো । তাদের অভিযোগ সেখানে মৌলবাদীরা বোমা তৈরী করছিল । এভাবে মিথ্যা অজুহাতে এবং অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র বহু জায়গায় হামলা ও অত্যাচার চালিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আক্রমণ চালিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে । এটাই আমেরিকা মুখে মানবাধিকারের কথা -হাস্যকর । ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অন্যান্য দেশগুলা এভাবে যখন মায়াকান্না করে মানবাধিকারের কথা বলে তখন সত্যিই বিস্ময় জাগে ,হাসি পায় ।

রেডিও তেহরান : ফিলিস্তিনে গত ৩ দশক ধরে এ ভাবে গণহত্যা , জুলুম ও অত্যাচার করেও যায়ানবাদীরা এ অঞ্চলের মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি , আপনার কি মনে হয় গাজায় এভাবে মানুষ খুন করে যায়ানবাদীরা কি তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে ?

কবীর সুমন : কখনও না , জীবনে্ও না ; ইসরাইল এভাবে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না । দেখুন, আমি এখানে কেবল একটি পক্ষই নিতে পারি । আর সেটি হচ্ছে অসহায় ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষ। ইসরাইল যখন গাজায় যুদ্ধ করছে তখন সেখানে নিরীহ শিশু, নারীসহ মানুষ তো মরছেই তবে শুধু কি মানুষ মরছে ! যখন কোথাও যুদ্ধ হয় সেখানে কি শুধু মানুষ মরে ; যে দেশে প্রাণ মরে সে দেশের টিকটিকিটাও মরে ; সেদেশের গরু ভেড়া ছাগলও মরে , গাছ মরে – এটা আামরা ভেবে দেখি না । মুর্খ অপরিণামদর্শী ইসরাইল ইতিহাস বিস্মৃত । ইসরাইল যদি মনে করে থাকে তার অধিকাংশ ইহুদী নাগরিককে নাৎসী জার্মানী নিধন করেছিল বলে বাকী পৃথিবীকে জিম্মি করে পণ বন্দী করে রেখে দেবে ; তাহলে তারা ভুল করেছে। তবে আমি প্রাণপনে আশা করব এর অবসান হোক । কেননা একবার আমেরিকায় এক ইসরায়েলী তরুনের সাথে আমার আলাপ হয়েছিল। তিনি আমাকে ইসরাইলের নতুন চেতনার কথা বলেছিলেন । ইসরাইলের সাধারণ মানুষ ইসরাইলি সরকারের ঐ বুড়ো গুন্ডাগুলোর পক্ষে নন সেকথা ঐ তরুনের মুখ থেকে শুনেছিলাম । আজ সেখানে জাগ্রত তরুনদের আন্দোলন শুরু হয়েছে । আমি প্রাণপনে বিধাতার কাছে দোয়া চাইবো যেন ফিলিস্তিনীদের স্বাধিকার রক্ষা হয় । আমি আবারও স্পষ্ট করে এ কথা বলতে চাই যে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে একটি সংগত মিমাংশা না করে কোনো দিন বিশ্ব শান্তি আসতে পারবে না ।

রেডিও তেহরান : আমি আবার ফিরে আসছি জাতিসংঘের দিকে । ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ যে দূর্বল ও একপেশে ভূমিকা পালন করেছে এবং বর্তমানে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে এ সংস্থাটির যে অসহায় অবস্থা ফূটে ওঠেছে , তাতে কি মনে হয় না , জাতিসঙ্ঘ পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে?

কবীর সুমন : আমি আপনার কথার সাথে একশবার একমত হয়ে বলবো যে, অবশ্যই জাতিসংঘ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে। দেখুন , সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা যেটি বিশ্বে ঘটেছে – সেটি হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন । সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের নিজস্ব অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে ভেঙে গেছে। এটি কিন্তু একটি শোচনীয় ব্যাপার । তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রাক্তন সোভিয়েত নাগরিকদের জন্য কতোটা মন্দ ছিল তা হয়তো আমি বলতে পারবো না । তবে যাকে বলে ব্যালেন্স অব পাওয়ারের ক্ষেত্রে একটা ভয়ঙ্কর টাল মাতাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে । দেখুন, আজ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো পাওয়ার কার আছে ? কিন্তু তখন আমেরিকা কোনো দৌরাত্ম করলে, বা বাদরামো করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিত । আর সোভিয়েত ইউনিয় ভেটো দিলে তার যারা মিত্র তারা যেমন ভারত ; তারা কিন্তু সমর্থন জানাতো । তেমনি আরো অনেক দেশ তাদেরকে সমর্থন জানাতো । আজকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই । আজ কি ভেটো দেয়া হয়? দেখুন এখানে আমি একটা কথা বলে রাখি সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই বলে কিন্তু আমি দু:খ করছি না । আমি যেটা বলছি সেটি হচ্ছে, একটি একপেশে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

রেডিও তেহরান : ইরানের প্রেসিডেন্ট ড: আহমাদিনেজাদ জাতিসংঘকে পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার ক্লাব বলে আখ্যায়িত করেছেন । তিনি জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামো এবং স্থান পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। তো এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন ?

কবীর সুমন : ইরানের প্রেসিডেন্টের এ দাবির সাথে আমি সম্পূর্ণভাবে একমত । ইরানের মাননীয় প্রেসিডেন্ট ড: মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে আমি কখনও দেখিনি এবং এ জীবনে হয়তো কোন দিন তার সাক্ষাৎও পাবো না । তবে মাননীয় ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য বা দাবী সম্পর্কে আমি আবারও একাত্মতা ঘোষণা করছি। ভারতের একজন স্বাধীন আয়কর দাতা নাগরিক হিসেবে জাতিসংঘের ব্যাপারে আপনার করা প্রশ্নের সাথে আমি একমত । আমি আরও বলতে পারি শুধু আমি নই পৃথিবীর বহু মানুষ আহমাদিনেজাদের বক্তব্যের সাথে একমত ।
দেখুন আমি এ প্রসঙ্গে একটি উদারহণ টানতে চাই । ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্রি কান্ড ঘটিয়েছে এবং তার সাথে ভারত সরকারকে শামিল করার জন্যে প্রাণপন চেষ্টা করেছে । যে শামিল হওয়ার পথে সেই গাধার নাকে মুলো ঝুলানোর মতো বিভিন্ন অনুদান ও ভর্তুকীসহ কোটি কোটি টাকার লেনদেনের প্রসঙ্গ এসেছে । তবে ইরান তার নিজস্ব অধিকারের প্রশ্নে বারে বারে কিন্তু একটি স্বতন্ত্র অবস্থান সৃষ্টি করেছে । আর সেটি যদি কারও ভালো না লাগে তাতে তো কারও কিছু করার নেই । ফলে ইরানের প্রেসিডেন্ট যা বলেছেন তা সবদিক থেকে সত্য । আর এখানে যদি বিকল্প কাঠামো তৈরী করা না যায় । তাহলে মানবজাতির কপালে একটা গভীর দু:খ ছাড়া আর কিছুই লেখা নেই ।

রেডিও তেহরান : তো জনাব কবীর সুমন আপনি একজন নামকরা কন্ঠশিল্পি হিসেবে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে ভারতের জনগণ বিশেষ করে বাংলা ভাষা-ভাষীদের উদ্দেশ্যে কি কিছু বলবেন ?

কবীর সুমন : দেখুন এ ব্যাপারে আমি অত্যন্ত গর্বিত এই জন্যে যে, পশ্চিমবঙ্গে কোলকাতার বুকে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী সুচিন্তিত আবেগমথিত একটি জনসমাবেশের আয়োজন করেছিলেন । এবং সেই জনসমাবেশে আমি উপস্থিত হতে পেরেছিলাম আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল । আমি যতটুকু জানি একমাত্র শ্রীমতি মমতা বন্দোপাধ্যায় গাজায় ইসরাইলী হামলার বিরুদ্ধে , হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে, মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনকে ধিক্কার জানানোর জন্যে ঐ সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন । আমি সেই সমাবেশে দেখেছি মানুষের মধ্যে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া গেছে , মানুষ ইসরাইল ও মার্কিনীদের ধিক্কার জানাচ্ছে । কিন্তু তারপরও মানুষ দমে যাচ্ছে । তার কারণ কি ? কারণটা আর কিছুই না । ধরুন ভারতের মতো এতো বড় একটা দেশ সেখানে প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী পিএলওর দপ্তর খুলেছিল । আর তাকে সেই দপ্তর খোলার জন্যে মানুষের কাছে অনেক ধিক্কার পোহাতে হয়েছিল। তারপরও তিনি এ কাজটি করেছিলেন । ভারতের একটি নিজস্ব অবস্থান ছিল। তবে আজকের একজন সচেতন ও ভারতপ্রেমী মানুষ হিসেবে আমার কিন্তু আক্ষেপ হবে যদি ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারত কোন দোনামেোনা করেন । আমি সব ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নই কিন্তু এটি অন্তত আমি বলতে পারি কোলকাতার সেই সভায় উপস্থিত থেকে এদেশের মানুষের গাজাবাসীদের প্রতি সহমর্মিতার যে চিত্র দেখেছি , ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে ধিক্কার দেখেছি তাতে ভারত সরকারের উচিত হবে ভারতের মানুষের সাথে একাত্মতা পোষণ করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো । আমি আরো বলবো মহাত্না গান্ধীর মুর্তির পাদদেশের সেই সভায় আগত সাধারণ মানুষ যেভাবে গাজা প্রশ্নে সাড়া দিয়েছেন ভারতের অন্যান্য জায়গায় যদি এ ধরনের সভার আয়োজন করা হয় তাহলে সেখানেও একই রকম সাড়া পাওয়া যাবে ।

রেডিও তেহরান : ফিলিস্তিনে বর্ণবাদী ইহুদীদের আগ্রাসনের সাথে যোগ হয়েছে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন । ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অশান্তির আগুনে জ্বলছে। অনেকেই বলছেন , এ থেকেই সারা বিশ্বে এক ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে ।

তো আমি জানতে চাচ্ছি, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে, কি পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

কবীর সুমন : মাননীয় সাংবাদিক বন্ধু , এ বিষয়ে প্রথম প্রয়োজন ফিলিস্তিনীদের আত্ম নির্ধারণ অধিকার দিতে হবে । ফিলিস্তিন প্রশ্নের সংগত মিমাংশা না হলে আপনি যেটাকে মধ্যপ্রাচ্য বলছেন আমরা সেটাকে পশ্চিম এশীয়া বলি তো সেই পশ্চিম এশীয়ার সমস্যার সমাধান কোনো দিন সম্ভব হবে না । Palestanian question must be moderately and fully setteled ততক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিম এশীয় সমস্যার সমাধান হতে পারে না । শুনুন, আমি সোজা একটা কথা বলি – আজকে যদি আমি বা আপনি গাজা উপত্যকায় জন্মাতাম । আমরা যদি আমাদের বাল্যকাল এবং কৈশর ঐরকম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কাটাতাম তাহলে আমি আপনাকে বলছি , আমি বসে বসে দুধ ভাত খেতাম না ; আমি শান্তির বাণী বা ভালো ভালো কথা আওড়াতাম না । আমি আততায়ী যে আক্রমণকারী তাকে বধ করার কথা ভাবতাম । ধরুন আমার দেশে আমি যদি একটা লোককে আত্রুমণ করি বা কেউ যদি আমাকে আক্রমণ করে তাহলে আমরা আত্মরক্ষার জন্যে তো আমরা পরস্পরকে হত্যা করতে পারি । আর সেই হত্যার বিষয়টি ম্যানস স্লাটার হবে তবে তার জন্যে শাস্তি হবে লঘু । বড় কোনো শাস্তি হবে না । কাজেই যারা গাজা স্ট্রিপের মানুষ , যে শিশুরা সেখানে জন্ম নিয়েছে তাদের কে কিন্তু জিজ্ঞাসা করা হয়নি ওহে শিশু তোমরা গাজা উপত্যকায় জন্মাতে চাও নাকি তেল আবিবে জন্মাতে চাও ? সেই সব শিশু তো গাজায় জন্মেছে তাদের বাল্যকাল কাটছে সেখানে । তারা দিনের পর দিন দেখেছে কি নিষ্ঠুরভাবে তার চোখের সামনে মা , ভাই বোন বাবা বা আত্মীয় স্বজন বন্ধু বা প্রতিবেশীরা মারা যাচ্ছে । এবার সেই শিশুটি যখন যুবক হবে সে তখন কি করবে ? সেই যুবকটি কি তখন গীত গাইবে ! না , সে চুপ করে বসে থাকবে না বা গান গাইবে না ; সে অস্ত্র হাতে তুলে নেবে । আর এইটুকু মানবতা এখনও আছে , আর মানবতা আছে বলেই গাজা উপত্যকার স্বজনহারা প্রতিটি মানুষ লড়াই করছে। মানবতা আছে বলেই ইসরাইল ও মার্কিনীদের মোকাবেলায় গাজার স্থানীয় মানুষ লড়াই করছে বীরের মতো । আর আমার এই কথাগুলোকে কেউ যদি মনে করেন আবেগতাড়িত । তাহলে আমার কিছু বলার নেই । হ্যাঁ আমি আমার আবেগ ব্যক্ত করছি সত্যের পক্ষে। আমি একটা ষাট বছর বয়সী আধবুড়ো নই আমি বৃদ্ধ ; আমি দেখে শুনে ক্ষেপে গেছি আর তাই যা মুখে আসে তাই বলছি একথা সত্য নয় ; যা ঐতিহাসিক সত্য আমি তাই স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করছি। গাজার সাধারণ মানুষ ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না । আর সেটা ইসরাইল খুব ভালো করে জানে । আর তাই তারা গাজায় আত্রুমণ করছে । তবে আমি প্রান্তিকে এসে স্পষ্ট করে বলবো ইসরাইল কোনোদিন পারবে না; পারবে না !


সৌজন্যেঃ-

রেডিও তেহরান (১৮ই জানুয়ারী, ২০০৯)

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress