আমার বাংলাদেশ

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন যখন হয়, আমার বয়স তখন তিন বছর। থাকতাম আমরা ভারতের ওড়িশা রাজ্যের কটক শহরে—যেখানে আমার জন্ম। পাঁচ বছর বয়সে আমি কলকাতায় চলে আসি বাবা-মায়ের সঙ্গে।

আমার মা উমা চট্টোপাধ্যায় আর বাবা সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, দুজনই এককালে কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। সে ব্রিটিশ আমলের কথা, ১৯৪০-এর দশক সবে শুরু। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের তরুণশিল্পী সুধীন্দ্রনাথ তখন আকাশবাণী ভবনে ঘুরঘুর করতেন কাজী নজরুল ইসলামের অনুষ্ঠানে ঠাঁই পাওয়ার আশায়। পেতেনও মাঝেমধ্যে। গ্রামোফোন রেকর্ডের শিল্পী হিসেবেও সুধীন্দ্রনাথ তত দিনে কিছুটা নাম করেছেন—রবীন্দ্রনাথের গান ও আধুনিক গানে। কাজী নজরুল ইসলাম একদিন সুধীন্দ্রনাথকে ডেকে বললেন, ‘বাঙালি ভদ্রলোকের ছেলে, বিএ পাস করেছ। এখানে-ওখানে গান গেয়ে বেড়িয়ে খুব লায়েক হয়েছ দেখতে পাচ্ছি। অনেক হয়েছে, এবার চাকরিতে ঢোকো, নয়তো কিছুদিনের মধ্যেই বারোটা বেজে যাবে।’
আকাশবাণী কলকাতার সাহেব পরিচালকের কাছে চিঠি দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম সুধীন্দ্রনাথের চাকরির বন্দোবস্ত করে দিলেন। আকাশবাণীর চাকরিতে ঢুকে সেকালের মোটামুটি নামকরা তরুণ গায়কটি পেশাদার সংগীত-জীবন ছেড়ে দিলেন—এমনকি আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে গান গাওয়াও। তাঁর আশঙ্কা ছিল লোকে বলবে—দ্যাখো, লোকটা আকাশবাণীতে চাকরি করার সুযোগ নিচ্ছে।
এহেন সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ১৯৫৭-৫৮ সালে একবার চট্টগ্রামের একটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে গেলেন। কলকাতায় তখন আর তিনি অনুষ্ঠানে গান করেন না। চট্টগ্রামে পুরোনো দিনের শিল্পীদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেখানেই গেলেন তিনি। সেই সূত্রে চট্টগ্রাম, ঢাকা—এই নামগুলো তাঁর স্ত্রী, অর্থাৎ আমার মায়ের মুখে আবার শুনলাম। এও শুনলাম যে দেশভাগের আগে বাবা কলকাতা থেকে বদলি হয়ে কিছুকাল ঢাকা বেতার কেন্দ্রে বহাল ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে মাও গিয়েছিলেন ঢাকায়। রমনার আশপাশে কোথাও একটা ছিল তাঁদের সংসার। ঢাকার সেই জীবনের গল্প শুনতে শুনতে আমার নবীন মনে কেমন একটা মায়াময় ছবি তৈরি হয়েছিল।

এর অনেক বছর পরে নিজে ঢাকায় গিয়ে রমনা পার্কের কাছে দাঁড়িয়ে ভেবেছি—কাছাকাছি কোথাও আমার বাবা-মা থাকতেন। ভেবেছি, কোথায় থাকতেন মঙ্গল মিঞা! ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি চট্টগ্রামের অনুষ্ঠানে গান গেয়ে আসার পর বাবা আমাকে বলেছিলেন মঙ্গল মিঞার কথা।

দেশভাগের অল্প আগে বাবা যখন আবার কলকাতায় বদলি হলেন, তখন তাঁর ফেরার পথে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের এক ‘চাপরাশি’ মঙ্গল মিঞা, তাঁকে প্রায় কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন। আমার মা আর আমার বড় ভাই—যিনি তখন নেহাতই শিশু—তার আগেই চলে এসেছিলেন। বাবা আসতে পারলেন ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে ছাড়পত্র পেয়ে। দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা তখন ভালো নয়। সাম্প্রদায়িক হানাহানি শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা বেতার কেন্দ্রের এক সাধারণ কর্মী মঙ্গল মিঞা, নাছোড়বান্দা। বাবাকে তিনি কিছুতেই একা ছাড়বেন না। তাঁর একটাই কথা, ‘স্যার, দিনকাল খারাপ। কোথায় কে কী করে বসে তার ঠিক নেই। আপনাকে আমি কিছুতেই একা যেতে দেব না। আপনার ক্ষতি কেউ করতে গেলে তাকে আগে আমায় খুন করতে হবে।’ তাঁকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে হাঁফিয়ে গিয়ে শেষকালে বাবা তাঁর সেই সরকারি-সামাজিক হিসেবে ‘অধস্তন’ শুভানুধ্যায়ীর দাবি মেনে নিলেন।

চট্টগ্রাম থেকে ফিরে কিছুদিন বাবা কেমন হয়ে গিয়েছিলেন। মঙ্গল মিঞার গল্প তখনই বলেন তিনি আমাকে। আমার এখন ৬৫ বছর চলছে। কিছু কথা আজ আমি ‘আমার বাংলাদেশ’ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলব, যা আমি আগে বলিনি।

গানে গানে মানুষের কথা বলেন কবীর সুমনরমনায় সংসারের গল্পের সঙ্গে যুক্ত হলো মঙ্গল মিঞার কাহিনি। তার আগে থেকেই পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়ে বাবা আমাদের কাছে বলতেন তাঁর বন্ধু হুদা সাহেবের কথা। শামসুল হুদা চৌধুরী। বাবা শুধু ‘হুদা’ই বলতেন। পশ্চিমবঙ্গের ছেলে শামসুল হুদা চৌধুরী ব্রিটিশ আমলে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে চাকরিতে ঢোকেন এবং বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। একবার বাবা অফিসের একটি আলমারির চাবি ভুল করে প্যান্টের পকেটে নিয়ে বাড়ি চলে এসেছিলেন। তারপরের দিনটা ছুটি ছিল বাবার। আলমারিটায় এমন কিছু জিনিস ছিল, যেগুলো রোজই দরকার। বাবার যেদিন ছুটি ছিল, হুদা সাহেবের ডিউটি ছিল ঠিক সেই দিনেই। প্রয়োজনের মুহূর্তে চাবি খুঁজে না পেয়ে তিনি আন্দাজ করেন যে চাবিটি তাঁর বন্ধু সুধীন ভুলে বাড়ি নিয়ে গেছেন। তখনকার যুগে তো আর টেলিফোন ছিল না বাড়িতে বাড়িতে। এদিকে ভীষণ দরকার। হুদা সাহেব নিজের দায়িত্বে আলমারিটার তালা ভাঙেন। তালাটা বন্ধ থেকে গেলে জরুরি জিনিসটা বের করা যেত না এবং সেটা কর্তৃপক্ষকে জানাতে বাধ্য হতেন হুদা সাহেব। ফলে কর্তৃপক্ষ খোঁজখবর নিয়ে দোষী ব্যক্তিটিকে দায়িত্বহীনতার দায়ে চরম সাজাই দিত। বন্ধু সুধীন্দ্রনাথের চাকরিটা চলে যেতে পারত।
কতবার যে এই গল্পটা বাবা আমাদের কাছে করেছেন তার ঠিক নেই, ‘হুদা না থাকলে আমার চাকরি যেত। ভেবে দ্যাখ, কী ছেলে, সরকারি অফিসের আলমারি ভাঙার মতো কাণ্ড করে বসলেন শুধু আমাকে বাঁচানোর জন্য!’

দেশভাগের সময়ে শামসুল হুদা চৌধুরী ইচ্ছে করলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যেতে পারতেন, ঢাকা বেতার কেন্দ্রে বহাল হতেন। তিনি কিন্তু ভারতেই থেকে গেলেন। আমার সেই কোন ছেলেবেলায় বাবা আমায় এই গল্পটা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিলেন। কান্না চাপার চেষ্টা করতে করতে বলেছিলেন, ‘ফেয়ারওয়েল টি-পার্টিতে হুদা পাকিস্তানে চলে যেতে চাওয়া কলিগদের বললেন—দেখো, ওখানকার হিন্দুদের সঙ্গে তোমরা কেমন আচরণ করবে তার ওপর নির্ভর করবে আমার এই দেশে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা, করেকম্মে খাওয়া। আমার কথাগুলো মনে রেখো ভায়েরা।’

হুদা সাহেব কিন্তু থাকতে পারেননি ভারতে। বাবা আমায় বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলিমরা কী কী করলেন সেসব ব্যাপার অনেক দূরের কথা। ভারতে, খোদ কলকাতায় হুদার মতো ছেলে যে ধরনের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের মুখে পড়ল তা আর ওর সহ্য হলো না। কোনো মানুষেরই তা সহ্য হওয়ার কথা নয়। আমায় এসে হুদা বললেন—সুধীন ভাই, চলেই যাই। এখানে তো মনে হচ্ছে বিপদ ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। এত অপমান সহ্য করে বাকি জীবনটা কাটাতে চাই না।’ বাবা আমায় বলেছিলেন, ‘বুঝলি, সেদিন চোখের জল ফেলতে ফেলতে হুদাকে বিদায় দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমাদের দুজনের পরিবারের মধ্যে কী ঘনিষ্ঠতাই না ছিল! কী ভালো গান গাইতেন ওর স্ত্রী! আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটা, যিনি তাঁর কয়েক বছর আগে নিজে চাকরি খোয়ানোর ঝুঁকি নিয়ে আমার চাকরিটা বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন, চলে যাচ্ছেন, চিরকালের মতো, আমি কিছু করতে পারছি না, বরং চারদিকের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এখানে থাকলে হুদাকে অফিসে, বাইরের সমাজে অপমানিতই হতে হবে—শুধু ছেলেটা মুসলমান বলে—সে যে কী কষ্ট রে।’ নানা বাক্যবিন্যাসে এই গল্প বাবা আমার কাছে করেছেন বছরের পর বছর। কখনো মঙ্গল মিঞা, কখনো—এবং বিশেষ করে তাঁর যৌবনের প্রাণের বন্ধু—‘হুদা’র কথা বলতে বলতে আমি বাবাকে সত্তর বছর বয়স পেরোনোর পর বলতে শুনেছি, ‘বুঝলি টুটুল (আমার ডাকনাম), হুদার এ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণটা ভাবতে ভাবতে সেই কোন কাল থেকে মাঝেমধ্যেই ভেবেছি মুসলমান হয়ে যাব। আউট অফ ভেনজিয়েন্স—নয়তো আমি ধর্মের তোয়াক্কা করি না। হুদা মুসলমান বলে ওকে চলে যেতে হলো ওর দেশ ছেড়ে। এটা ওরও দেশ। বীরভূমের ছেলে ছিলেন হুদা। ওকে চলে যেতে হলো—কারণ, ও মুসলিম। আমিও তাহলে মুসলমান হয়ে যাব।’

বাংলাদেশে যখন স্বাধীনতাযুদ্ধ চলছে, আমার বড় ভাই আনন্দরূপ আর আমি যখন ঠিক করেছি আমরা বাংলাদেশে চলে যাব, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চাইব, শামসুল হুদা চৌধুরীর যৌবনের বন্ধু সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের তখন থেকেই চিন্তা, ‘কিন্তু হুদা? হুদা কেমন আছেন? ওরা সবাই ভালো আছেন তো?’

১৯৮০ সালে ভয়েস অব আমেরিকার চাকরি নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে সেখানকার কর্মী ইকবাল বাহার চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ হলো। মিষ্টভাষী, সদালাপী (এবং অসামান্য বেতার-সাংবাদিক ও বেতার-কথক) ইকবাল বাহার চৌধুরী প্রথম দিনেই আমায় একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘শামসুল হুদা চৌধুরী নামটা আপনাকে কিছু বলছে?’

‘বিলক্ষণ! আমার বাবার কাছে ওনার কথা এতবার শুনেছি। বাবার যৌবনের বন্ধু।’

‘অল্প কিছুদিন আগে উনি আমায় ঢাকা থেকে ফোন করে বললেন, শোনো বাহার, আমি খবর পেয়েছি আমার বন্ধু সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে সুমন তোমাদের ওখানে যাচ্ছে চাকরি নিয়ে। ওর যেন কোনো অসুবিধে না হয়।’

১৯৫৫ সালেরও আগে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের কর্মী শামসুল হুদা চৌধুরী বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর জন্মভূমি ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যেতে। সেখান থেকে ১৯৮০ সাল। মাঝে একটিবারও দেখা হয়নি দুই বন্ধুর। চিঠিতে যোগাযোগ ছিল বলেও সুধীন্দ্রনাথের কাছে শুনিনি কখনো। সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও শামসুল হুদা চৌধুরীর কেউই অপর বন্ধুকে ভোলেননি। ভুলতে চাননি। ভুলতে পারেননি।

১৯৯৬ সালে প্রথম গিয়েছিলাম বাংলাদেশে। ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তহবিলের জন্য গানের অনুষ্ঠান করতে। আমার বাবা তার দুই বছর আগে মারা গেছেন। মৃত্যুর আগেও অতীতের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন তাঁর ‘হুদা’র কথা। মাত্র কয়েকটি দিনের জন্য বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। ঝড়ের বেগে অনুষ্ঠান করছিলাম শুধু। আমন্ত্রণকারীদের কারোর সঙ্গেই আমার আগে থেকে তেমন পরিচয় ছিল না। তাও একজনকে বলেছিলাম হুদা সাহেবের কথা। তিনি এড়িয়ে গেলেন দেখে চুপ করে গিয়েছিলাম। অল্প কয়েক দিনের অতিথি। তা ছাড়া অত অল্প সময়েও টের পেয়েছিলাম যে ঢাকায় আওয়ামী লীগ আর বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে বেশ টানাপোড়েন আছে। শামসুল হুদা চৌধুরী নাকি বিএনপিতে ছিলেন বা আছেন—এ রকম কথাও একজন বলায় আমি বেগতিক দেখে তূষ্ণীভাব অবলম্বন করেছিলাম। কলকাতায় কেউ আমায় এমন কথা বললে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে শুনতে হতো: ‘তাতে আমার বাপের কী, অথবা আপনার শ্বশুর-মশায়ের?’ কিন্তু জায়গাটা বাংলাদেশ। আমি সেখানে বিদেশি অতিথি। আমায় যাঁরা নিয়ে গিয়েছেন, তাঁরা সম্ভবত আওয়ামী লীগের সমর্থক। দুই দিনের জন্য এসে কী দরকার রে বাবা, এই সব দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার।

১৯৯৮ সালে আবার বাংলাদেশ গেলাম জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আমন্ত্রণে। সেবার সাবিনা ইয়াসমীনের সঙ্গে আলাপ হলো। তার পরের বছর বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়ে সাবিনার সেজো আপার সাহায্যে অবশেষে যেতে পারলাম আমার বাবার বন্ধুর কাছে। এক সন্ধ্যাবেলা। প্রবীণ মানুষটি একা বসেছিলেন। তাঁকে প্রণাম করতে জড়িয়ে ধরলেন তিনি আমাকে। তাঁকে তাঁর বন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ দিতে হলো। কেঁদে ফেললেন তিনি। ভাঙা ভাঙা গলায় স্মৃতিচারণা করতে লাগলেন আমার বাবার বন্ধু, যাঁকে আমি তখন ‘হুদা-কাকা’ বলছি। আফসোস করে বলতে লাগলেন—সুধীনের সঙ্গে আর দেখা হলো না।

সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় জানতেও পারলেন না যে ব্রিটিশ আমলে তাঁর যে প্রাণের বন্ধুটি চরম ঝুঁকি নিয়ে তাঁর চাকরি বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন, দেশভাগের সময়ে যিনি বেছে নিয়েছিলেন তাঁর জন্মভূমি ভারতকে, তার কয়েক বছরের মধ্যে যিনি বাধ্য হয়েছিলেন সেই দেশ ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে যেতে, ছোট পুত্র সুমন আর কিছু না পারুক সেই মানুষটিকে একবার প্রণাম করে আসতে পেরেছে। কলকাতায় ফিরে এসে আমার মাকে সব জানানোয় তিনি কাঁদতে লাগলেন।

শামসুল হুদা চৌধুরীও নেই। তাঁর বন্ধু সুধীন্দ্রনাথ, বন্ধুপত্নী উমা—কেউই আর নেই। সেজো আপার কাছে আমি ঋণী থেকে গেলাম, যিনি কে আওয়ামী লীগ কে বিএনপি এসব প্রশ্নকে আমল না দিয়ে পঞ্চাশ-ছোঁয়া একটা লোককে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বাবার হারিয়ে যাওয়া সুজন ও স্বজনের কাছে।

আজ, জীবনসায়াহ্নে, রবীন্দ্রনাথের ‘আজি কোন সুরে বাঁধিব/ দিন অবসান বেলারে’ গানটি একা একা গুনগুন করতে করতে ‘আমার বাংলাদেশের’ কথা ভাবতে গিয়ে মনে আসছে শুধু ‘হুদা ও সুধীন’—এক স্বর্গীয় বন্ধুত্বের কথা। আর সেই সঙ্গে দেশভাগ আমলের ঢাকা বেতার কেন্দ্রে সুধীন্দ্রনাথের সাধারণ এক সহকর্মী মঙ্গল মিঞার কথাগুলো, ‘স্যার, দিনকাল খারাপ। কোথায় কে কী করে বসে তার ঠিক নেই। আপনাকে আমি কিছুতেই একা যেতে দেব না। আপনার ক্ষতি কেউ করতে গেলে তাকে আগে আমায় খুন করতে হবে।’ সেই আদর্শ মানুষ, আদর্শ বাঙালিকে এ জীবনে দেখা হলো না। তাঁর পা দুটি একবার ছুঁয়ে ডান হাতটা নিজের মাথায় ঠেকাতে পারলে আমি ধন্য হতাম—যেমন ধন্য হয়েছি সুফিয়া কামাল খালাম্মা ও ভাষা-মতিনের চরণ স্পর্শ করে, তাঁদের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে।


সৌজন্যেঃ-

প্রথম আলো (৩রা অক্টোবর, ২০১৩)

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress