আপস

আমার গান কারো সঙ্গে আপস করে না

আবার দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন কবীর সুমন। লালগড়ের পুলিশবিরোধী জনসাধারণের নেতা ছত্রধর মাহাতোকে নিয়ে ছত্রধরের গান নামের একটি অ্যালবামে সাতটি গান গেয়েছেন সুমন। অ্যালবামের গানগুলোতে তিনি লালগড়ের মাওবাদী আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে ছত্রধরের মুক্তি দাবি করেন। এতে কবীর সুমনের বিপক্ষে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন তৃণমূল নেতারা। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার মাওবাদীদের বিরুদ্ধে জোর অবস্থান নেওয়ায় জোটের শরিক হিসেবে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অবস্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। এমন সময় তাঁর দলের সাংসদের কণ্ঠে এমন গান নিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে তৃণমূল। তবে এবারই প্রথম নয়, এর আগে তো গত বছরের ১৫ নভেম্বর একেবারে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে দলের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে বলেছিলেন, তৃণমূল এবং সিপিএমের মধ্যে তিনি কোনো তফাৎ দেখছেন না। রাজ্যব্যাপী যখন তৃণমূলের জোয়ার চলছে, তখন সাংসদ হওয়ার আট মাসের মধ্যে এবার গান গেয়ে দলকে দ্বিতীয়বারের মতো বেকায়দায় ফেললেন এই প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী। বিদ্রোহ, মাওবাদী আন্দোলন এবং সমকালীন নানা প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন কবীর সুমন। রাজকূট পাঠকদের জন্য সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে এনেছেন শাকিল ফারুক

আপনার ‘ছত্রধরের গান’ অ্যালবামটি নিয়ে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্কের ঝড়। আপনার দল তৃণমূলও এতে আপনার ওপর নারাজ। এ সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত মতামত কী?
লালগড়ে মাওবাদীদের নিয়ে সরকারের মধ্যে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তাকে আড়াল করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আমাদের দেশের সব বিষয়ের সঙ্গে আমরা সবাই যুক্ত। এই ইস্যুতে মাওবাদীদের দাবি এবং আন্দোলন আমার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছে। তাই তাদের (মাওবাদীদের) প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। আমার গান সবসময় সত্যের কথা বলে। এই অ্যালবামের গানেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখানে আমি স্পষ্টভাবে মাওবাদীদের আন্দোলনের প্রতি আমার সমর্থনের কথা জানিয়েছি। একই সঙ্গে মাওবাদী আন্দোলনের নেতা ছত্রধর মাহাতোর মুক্তিও দাবি করেছি। সরকার এ নিয়ে সমালোচনা করতেই পারে।

এতে আপনার দল, সরকার এবং দলের নেতাদের বিরোধিতা করা হলো না?
আমি সত্য কথা বলি। সে কথা কার বিপক্ষে গেল বা কার সপক্ষে গেল, সেটা আমার বিবেচ্য নয়, আমি বাস্তবতাকে সবার আগে অগ্রাধিকার দেই। সংসদে আমি আমার কথাগুলো নিজের মতো বলতে পারি না। তাই গানে গানে আমি আমার সব কথা বলেছি। আমার গান কারো সঙ্গে আপস করে না। তাতে যা হওয়ার তাই হবে। তা নিয়ে আমি কখনো চিন্তা করি না। আমি সবসময় স্বাধীনতার কথাই বলে যাব।
ইতিমধ্যেই শোনা গেছে, আপনি তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। আসলেই কি তাই?
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আসেনি।
তাহলে কেন নিজের দলের বিরোধিতা করছেন?
আমার কণ্ঠস্বর সবসময় আমারই প্রতিনিধিত্ব করবে। আর আমি করব সত্যের প্রতিনিধিত্ব। সংসদে তা করতে পারি না। সেখানে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে আমি সেখানে বসে বসে দেখেছি, সরকার কিভাবে পরিচালিত হয়। নির্বাচনে জেতার জন্য নেতারা মানুষকে কিছু মিথ্যা আশার বাণী শোনায়। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে গেলে সব ভুলে যায়। আমি এসব কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। তাই লালগড় ইস্যুতে আমি সরকারকে কিছুতেই সমর্থন করতে পারি না।
গত বছরের নভেম্বর মাসে নিজেই দল থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দলেই রয়ে গেছেন। কেন?
আমি শেষবারের মতো একটা চেষ্টা করে দেখতে চেয়েছিলাম।
আপনি একবার অভিযোগ করেছিলেন, আপনার দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত। আপনার এই অভিযোগের ভিত্তি কী ছিল? এখনো কি আপনি সেই অভিযোগে অটল?
আমি এখন এই প্রশ্নের জবাব দিতে চাচ্ছি না। তাছাড়া ওই নেতাদের বিষয়ে কথা বলার কোনো আগ্রহও এখন আমার নেই।
তাহলে কি আপনি আপনার অভিযোগ থেকে সরে যেতে চাইছেন?
আমি এসব বিষয়কে কখনোই পাত্তা দেই না।
আপনার দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই অভিযোগ সম্পর্কে কী বলেছেন?
তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি চান আমি শুধু বসে বসে গান গেয়ে যাই।
মমতা তো চান আপনি যেন কোনো সমালোচিত প্রসঙ্গে না জড়িয়ে দলের প্রতি আস্থাশীল থাকেন। সমাজকর্মী ও লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীকে দিয়ে আপনাকে সেই কথা বোঝানোর একটা চেষ্টাও নাকি তিনি করেছিলেন। সে প্রক্রিয়া কি সফল হয়েছে?
এর উত্তর খুঁজে বের করা আপনার দায়িত্ব।
আপনি দাবি করেছিলেন, যে কারো চেয়ে মার্কসবাদে আপনার বিশ্বাস সবচেয়ে অটুট এবং এও বলেছিলেন, আপনি কখনো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করার কথা চিন্তাও করেননি। তাহলে শেষ পর্যন্ত তার দলে যোগ দিলেন কেন?
এখনো সেই দাবি করি। মাওবাদ এবং মাকর্সবাদে আমার বিশ্বাস এখনো অটুট। তবে আমি এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন দেখতে চেয়েছি। আমি চেয়েছি, এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় অত্যাচারিত ও বঞ্চিত মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নেবে। আমার মনে হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এমন একটা পরিবর্তন দেখতে চান।
শুধু এই কারণেই কি আপনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করতে এসেছিলেন?
এই প্রশ্নের জবাবটাও আমি এখন দিতে চাচ্ছি না।
আপনি যদি পদত্যাগ করেন, তাহলে বামপন্থীরা তৃণমূলকে নিয়ে পরিহাস করার সুযোগ পাবে_তা কি আপনি কখনো ভেবে দেখেছেন?
ক্ষমতার লোভে যেসব রাজনৈতিক সংঘাত, তা নিয়ে আমি কখনো মাথা ঘামাই না।
কবীর সুমন একজন সফল গায়ক। কিন্তু একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি কতটা সফল। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই বা কী?
রাজনীতি আমার চায়ের কাপ নয় যে হাতে নিয়ে সব বলে দেব। আমি রাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী মাত্র।
আপনি কী সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন করেন?
সশস্ত্র সংগ্রাম জন্ম নেয় ক্ষুধা থেকে। বছরের পর বছর বঞ্চিত হতে হতে যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখনই সশস্ত্র সংগ্রাম জন্ম নেয়। জঙ্গলমহলের লোকজন সেই ১৯৪৭ সাল থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তারা যদি সংগ্রাম না করে, তাহলে কে করবে?

২৯ জানুয়ারী, ২০১০ (কালের কণ্ঠ)

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress