রিজওয়ানুর ও অরিন্দম মান্না

খবর কাগজে দেখছি ছবি: আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী এবং বি জে পির এক নেতা রিজওয়ানুরের বাড়িতে গিয়ে তাঁর মার সঙ্গে কথা বলছেন। অরিন্দম মান্না নামে এক তরুণ পুলিশ অফিসার, যিনি রিজওয়ানুরের মৃত্যু-সংক্রান্ত তদন্তে জড়িত ছিলেন, তাঁর মৃতদেহও রিজওয়ানুরের মতই রেল লাইনের ধারে পাওয়া গিয়েছিল। এতো তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি…এতো ভুলে যাচ্ছি – বিশেষ করে নাম, স্থানকাল যে এই মুহূর্তে সন্দেহ হচ্ছে – সেই তরুণের নামটি ঠিক বলছি তো? সকলে আমার এই শারীরিক-মানসিক বৈকল্য ক্ষমা করে দেবেন। সেই তরুণ পুলিশ কর্মীর জন্য আমরা মোমবাতি নিয়ে নীরবে দাঁড়াইনি। তাঁর বাড়িতে কি কোনও নেতা গিয়েছিলেন? কারা? কিভাবে, কেন ঐ তরুণটি (পরে শুনেছি অপমৃত্যুর কিছুদিন আগেই তিনি বিয়ে করেছিলেন) খুন হলেন, কে বা কারা তাঁকে খুন করে রেল লাইনের ধারে ফেলে রেখে গেল – এই প্রশ্নগুলি কি করবেন না কেউ? তাঁর মা? তাঁর বাবা? তাঁর কোনও ভাইকে ভোটের প্রার্থী করা হয়েছে বলে তো শুনিনি। আমি নিজে? রিজওয়ানুরকে নিয়ে আমি এক গুচ্ছ গান বেঁধে, রেকর্ড করে আমার এক বান্ধবীর আর্থিক সহায়তায় সিডি হিসেবে প্রকাশ করেছিলাম। ‘রিজওয়ানুর বৃত্ত’। অরিন্দম মান্নাকে নিয়ে আমি একটি গানও বাঁধতে পারিনি। অনেক চেষ্টা করেও আমি তাঁর সম্পর্কে কোনও খবরই জোগাড় করতে পারিনি।

গণ-আন্দোলন তখন তুঙ্গে। সেই আন্দোলনের এক সক্রিয় কর্মী হিসেবে এতো ব্যস্ত থাকতে হতো যে আলাদা সময়ও বের করতে পারিনি। আমার নিজের গাড়িও ছিল না (এখনও নেই)। কোথায় ঘুরে বেড়াব? কিভাবে? কোন্‌ সূত্র ধরে এগোব? সি পি এম আমল। যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াব কী করে? অচেনা জায়গায় একা একা ঘোরাঘুরি করলে কতো কী ঘটতে পারে। দু’দুটো খুন যেখানে পরপর হয়ে যেতে পারে এবং কেউই ধরা পড়ে না, সেখানে আর-একটা খুন হওয়া খুব বিচিত্র কি? আমার মনে ভয় ছিল। বেঘোরে মরার ভয়। আমি বীরপুরুষ নই। তাও একদিন পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম লালবাজারে। কেউ আমায় পাত্তাই দেয়নি। কমিশনার আমার সঙ্গে দেখা করেননি। অফিসাররা পাথরের মতো মুখ করে আমায় বলেছিলেন, “সরি, কোনও খবর দিতে পারব না।” – কোথায় পাবো খবর? কোথায় পেতে পারতাম খবর? কিসের ভিত্তিতে ছাতার মাথা একটা গানই নাহয় বাঁধব? – কী করতে পারে একটা গান? ঘন্টা।

মাঝেমাঝে মনে হয় সবই আসলে সৌখিনতা। তাও নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আবার, অন্য দিক দিয়ে দেখলে – একটা করে যাচ্ছেতাই ঘটনা ঘটবে আর আমি একটা করে গান বেঁধে গাইব – এটাও তো কোথাও-একটা হাস্যকর। কোথায় যেন একটা লঘুত্ব এসে যায়। জোলো হয়ে যায়। বড় অসহায় আমরা। ঈদের দিনে নেতারা গেলেন এক বুক দরদ নিয়ে ‘রিজ’-এর বাড়ি। বেশ। আর সেই ছেলেটি? যিনি ‘রিজ’-সংক্রান্ত তদন্তে ছিলেন? যিনিও খুন হলেন? নাকি আমি খোয়াব দেখছি? নাকি, কিছুই আসলে ঘটেনি। ঈদের দিনে কি তাঁর বাড়িতেও যাওয়া যায় না? নাকি কার কোন্‌ ধর্ম সেই হিসেব মতো “শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা”? মাননীয় নেতারা, শ্রীচরণেষু, আপনাদের শ্রীচরণযুগলেষু, উপযুক্ত, ধর্মীয়-আচার-সম্মত, বিধিলিং-বিধিলং-জেম্‌স্‌লং-কালিম্পং-ভোটং-দলং-ভোটস্বার্থং-সংবিধানং-রীতিং-২০১৬ং, আসন্নং, সম্মুখবর্তীং ভোটং, শুদ্ধং, দিনে সেই খুন হওয়া পুলিশকর্মীটির বাড়িতে একবার যাবেন? একবার? এতো বছর কেটে যাবার পরেও একটিবার? একবার কি তদন্তের সূত্রপাত হবে? জানি বেশীদূর এগোবে না, তাও, তাও। অন্ততপক্ষে সূত্রপাত?

৩১-০৭-১৪

It's only fair to share...Share on FacebookTweet about this on TwitterGoogle+
Website designed and developed by Code Flavor

Facebook

Get the Facebook Likebox Slider Pro for WordPress